সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬ ১৩:৫৬ পিএম
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রযন্ত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও তদন্ত পরিচালনা করা এবং জনগণের আস্থা রক্ষা করা এ সংস্থার মূল দায়িত্ব। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার পদত্যাগ করেন। ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে আড়াই মাস, এখনও নতুন কমিশন গঠন হয়নি। ফলে সংস্থাটিতে প্রতিদিন জমা পড়া শত শত অভিযোগ শুধু ফাইলবন্দি হয়ে আছে। আইনি জটিলতার কারণে এসব অভিযোগ অনুসন্ধানে বৈধ কর্তৃত্ব নেই কারও হাতে। ফলে কার্যত অভিভাবকহীন দুদকে থমকে আছে অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম। এটি শুধু প্রশাসনিক সংকট নয়, বরং দুর্নীতিবিরোধী রাষ্ট্রীয় অবস্থানের দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে।
গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত
এক প্রতিবেদনে জানা যায়, বিগত কমিশনের সময়ে যেসব অনুসন্ধান অনুমোদন পেয়েছিল এখন
সেগুলো সীমিত আকারে চলমান। নতুন করে জমা পড়া অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত
নেওয়া যাচ্ছে না। চেয়ারম্যান না থাকায় অভিযোগ শুধু জমা হচ্ছে, কিন্তু পরবর্তী ধাপে
যেতে পারছে না। উল্লেখ্য, পূর্ণাঙ্গ কমিশন থাকার সময় প্রতিদিন গড়ে তিন শতাধিক
অভিযোগ জমা পড়ত। এসব অভিযোগ প্রথমে চেয়ারম্যানের দপ্তরে যেত, পরে কমিশনের সভায়
সিদ্ধান্ত নিয়ে যাচাই-বাছাই সেলে পাঠানো হতো। যাচাই শেষে যেগুলো তফসিলভুক্ত অপরাধ
হিসেবে বিবেচিত হতো, সেগুলো অনুসন্ধানের অনুমোদন পেত। কিন্তু গত আড়াই মাসে সেই
পুরো প্রক্রিয়াই থেমে আছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এই সময়ে কমপক্ষে ২০ হাজার নতুন
অভিযোগ জমা পড়েছে। কিন্তু কোনটি অনুসন্ধানযোগ্য, কোনটি নয়Ñ সে বিষয়ে কোনো
সিদ্ধান্ত হয়নি। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর
থেকে দুদকে একাধিকবার নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়েছে। সর্বশেষ ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের
নেতৃত্বাধীন কমিশন গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করে।
জানা গেছে, বর্তমান আইনে সব ক্ষমতা
কমিশনের হাতে কেন্দ্রীভূত। তাই সংকট নিরসনে ‘দুদক আইন’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে
বর্তমান সরকার। সংশোধনী খসড়ায় প্রস্তাব করা হয়েছে, কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার
না থাকলেও জরুরি প্রয়োজনে দুদকের সচিব মহাপরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যক্রম
চালাতে পারবেন। সংশোধনী খসড়ায় কমিশনের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে চার বছর করার
প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে মানি লন্ডারিং, বিদেশে অর্থ পাচার, কর ও শুল্ক-সংক্রান্ত
অপরাধ, পুঁজিবাজার জালিয়াতি, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ ও জালিয়াতিকেও দুদকের
এখতিয়ারভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রস্তাব এসেছে বিতর্কিত ৩২(ক) ধারা
বাতিলেরও। আশা করা যায়, প্রস্তাবটি আইনি ভিত্তি পেলে আগামীতে এই ধরনের সংকট
নিরসনের সুযোগ থাকবে। বলা বাহুল্য, প্রতিষ্ঠার ২১ বছরের ইতিহাসে এর আগে কখনও এমন
অচলাবস্থার মুখে পড়েনি সংস্থাটি।
অতীতে অনেক রাঘববোয়ালের মামলাসহ বর্তমানে দেশের
নানা খাতে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ
বাড়ছে। অথচ এসব অভিযোগ তদন্তে যে প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে সক্রিয় থাকার কথা, সেই দুদকই
এখন নিষ্ক্রিয় থাকে, গুরুত্বপূর্ণ ফাইল আটকে থাকে, অনুসন্ধান বন্ধ থাকে, পুরনো মামলার
অগ্রগতি মন্থর হয়ে পড়ে; তাহলে দুর্নীতিবাজদের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি তৈরি হয়। অন্যদিকে
সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ে শঙ্কা ও হতাশা।
দুদকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় নেতৃত্বশূন্যতা কোনোভাবেই
গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রে প্রশাসনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সরকারের
দায়িত্ব। এটি এমন একটি সংস্থা, যার কার্যক্রম দেশের অর্থনীতি, সুশাসন ও
আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। নেতৃত্ব না থাকায় যদি দুদকের
কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে, তবে তা দুর্নীতিবিরোধী লড়াইকে দুর্বল করে দেবে।
দুদকের কার্যকর ভূমিকা শুধু দুর্নীতিবাজদের বিচারের আওতায় আনার জন্যই
নয়, বরং সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যও অপরিহার্য। অতীতে বহুবার অভিযোগ উঠেছেÑ
রাজনৈতিক চাপ, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ কিংবা প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে দুদক
স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। এখনকার এই দীর্ঘ নেতৃত্বশূন্যতা সেই আশঙ্কাকে আরও
জোরালো করছে। ফলে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে দ্রুত কমিশন পুনর্গঠন করা।
সরকারের উচিত অবিলম্বে যোগ্য, নিরপেক্ষ ও সাহসী ব্যক্তিদের দিয়ে দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দেওয়া। শুধু পদ পূরণ করলেই হবে না, নিশ্চিত করতে হবে যেন তারা রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত থেকে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। একই সঙ্গে দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, তদন্তের গতি বাড়ানো এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি। আমরা মনে করি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কখনও থেমে থাকতে পারে না। কারণ দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই করে না, এটি রাষ্ট্রের ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়। তাই দুদকের বর্তমান স্থবিরতা দ্রুত কাটিয়ে সংস্থাটিকে কার্যকর ও গতিশীল করা জরুরি। দেশবাসী একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও কার্যকর দুদক দেখতে চায়। সরকারকে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।