× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কারিনার মৃত্যু ও এক কবির বিকৃত উল্লাস

মহিউদ্দিন খান মোহন

প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬ ১৩:১৫ পিএম

আপডেট : ১৮ মে ২০২৬ ১৩:১৭ পিএম

কারিনার মৃত্যু ও এক কবির বিকৃত উল্লাস

পবিত্র আল-কুরআনে বলা হয়েছেÑ ‘কুল্লু নাফসিন যায়েকাতুল মাউত’। তরজমা হলোÑ ‘সব প্রাণীকেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে’। ইংরেজি প্রবচন ‘ম্যান ইজ মরটাল’-এর ভাবার্থও একইÑ ‘মানুষ মরণশীল’। মানুষ মরবেই। তবে কে কখন কীভাবে মারা যাবে এটা কারও পক্ষে জানার কথা নয়। ইসলাম ধর্মের বিজ্ঞ আলেমগণ বলে থাকেন, আল্লাহ মানুষকে একেক উসিলায় মৃত্যু দেন, যাতে সে উসিলাকে মেনে নিয়ে মনকে সান্ত্বনা পেতে পারেন তার স্বজনরা। মানুষ দীর্ঘ রোগ ভোগের পরে মারা যায়, আবার হার্ট অ্যাটাক বা ব্রেন হেমারেজ হয়ে তাৎক্ষণিক মৃত্যুও বরণ করে। কেউ নদীতে ডুবে, কেউ সড়ক দুর্ঘটনায়ও প্রাণ হারায়। প্লেন ক্রাশেও মারা যায় অনেকে। কেউ ছিনতাইকারী-ডাকাতের হাতে জীবন হারায়। ঘটনা-দুর্ঘটনা যে কারণেই মানুষের মৃত্যু হোক, স্বজন-সুহৃদরা মনে করেন, ওই ঘটনাটি না ঘটলে হয়তো তার মৃত্যু হতো না। এটা সান্ত্বনার কথা। বরং নির্মম সত্যি হলো, মৃত্যু তার হতোই, সেটা যেভাবেই হোক। এখানেই আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত। আমরা যারা বিশ্বাসী, মানে ধর্মে বিশ্বাসী, তারা এমনটিই মনে করি। তবে যারা ধর্মে বিশ্বাস করেন না, মানে নাস্তিক্যবাদে দীক্ষা নেন, তারা মনে করেন, আল্লাহ নন, প্রকৃতিই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু তারা এটা তলিয়ে দেখেন না, প্রকৃতিকে সুনির্দিষ্ট নিয়মে পরিচালনা করেন কে?

যাক, ওসব তত্ত্বকথায় গিয়ে লাভ নেই। কথা শুরু করেছিলাম মৃত্যু নিয়ে, সে কথাতেই ফিরে আসি। আমাদের ইসলাম ধর্মে কারও মৃত্যু কামনা করা নিষেধ রয়েছে, এমনকি চরম শত্রু হলেও। কারও মৃত্যুতে উল্লাস করাও কঠোরভাবে নিষেধ করে গেছেন মহানবী (সা.)। কারণ প্রতিটি মৃত্যুই বেদনাদায়ক। একটি মৃত্যু মানে একটি জীবনের ইতি। একজন মানুষ বেঁচে থাকলে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যায়, প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা যায়, চাই কি শত্রুতাও করা যায়। কিন্তু সে মৃত্যুবরণ করলে সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে যায়। এজন্য কারও মৃত্যু কামনা বা মৃত্যুতে উল্লাস করা নয়, বরং একজন মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা মানুষ হিসেবে আমাদের কর্তব্য। সব ধর্মেই মানুষকে মানবিক আচরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি সব ধর্মে, সব বিশ্বাসে সর্বোচ্চে স্থান দেওয়া হয়েছে। শিল্পী ভূপেন হাজারিকার গাওয়া বিখ্যাত গানÑ ‘মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে/ একটু সহানুভূতি, মানুষ কি পেতে পারে না, ও বন্ধু’তে সে কথাই বিধৃত হয়েছে।

কিন্তু এখন সময় আগের মতো নেই। মানুষের মনে আগের মতো মায়া-দয়া-ভালোবাসা নেই। আগে দেখতাম গ্রামে একজন মানুষ মারা গেলে পুরো গ্রাম স্তব্ধ হয়ে যেত। সে গ্রামে কারও বাড়িতে বিয়ে বা আনন্দানুষ্ঠান থাকলে তাতে আর হৈহুল্লোড় হতো না। মৃত মানুষের স্বজনরা যাতে কষ্ট না পায়, সেজন্য সবাই কথায় আচরণে সংযত থাকত। কিন্তু এখন তেমনটি আর নেই। খন একজনের অসুস্থতা বা মৃত্যু কাউকে তেমন স্পর্শ করে না। অনেক সময় কাউকে কাউকে আনন্দ প্রকাশ করতেও দেখা যায়।

এত কথা বলার উপলক্ষ এক সময়ের খ্যাতিমান ফুটবলার কায়সার হামিদের মেয়ে কারিনা কায়সারের মৃত্যু। শনিবার সকালে যখন মেয়েটির মৃত্যুসংবাদ অবগত হলাম, বিষণ্ন মনে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম। বারবার শুধু শোকার্ত পিতা কায়সার হামিদের মুখটি মনে পড়ছিল। সন্তানের প্রাণহীন নিথর দেহ যখন একজন পিতা বা মায়ের সামনে আসে, তাদের বাইরের কান্নার শব্দ সবাই শুনতে পায়। কিন্তু তাদের হৃদয় ভাঙার শব্দ কেউ শুনতে পায় না। ব্যক্তিগতভাবে কায়সার হামিদের একজন বড় ভক্ত আমি। আশির দশকে ঢাকার মাঠ কাঁপানো এই প্রখ্যাত ফুটবলারের পিতা লে. কর্নেল এমএ হামিদও ছিলেন একজন বিখ্যাত মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে আটকা পড়েছিলেন। পালানোর চেষ্টা করেও পারেননি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনিশ্চিত জীবনের শঙ্কার মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে স্ত্রী-সন্তানসহ পালিয়ে এসেছিলেন দেশে। সেসব দুঃসহ স্মৃতির কথা তিনি তুলে ধরেছেন তার ‘একাত্তরের যুদ্ধে জয়-পরাজয়; মুক্তিযুদ্ধকালে পশ্চিম পাকিস্তানের দৃশ্যপট’ ও ‘পাকিস্তান থেকে পলায়ন’ গ্রন্থে। দেশে প্রত্যাবর্তনের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে কর্তব্যকাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের অস্থির সময়ে, বিশেষ করে ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের সে জটিল সময়ে একজন দায়িত্ববান সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি পালন করেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও লে. কর্নেল এমএ হামিদ ছিলেন কোর্সমেট। ব্যক্তিগত বন্ধুত্বও ছিল তাদের মধ্যে। পঁচাত্তরের নভেম্বরের সে ঘটনাবলির কথা কর্নেল হামিদ তার ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে গেছেন; যা ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। কায়সার হামিদের মা রানী হামিদ বাংলাদেশের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার দাবারু। কারিনা কায়সারের মৃত্যুর কথা লিখতে গিয়ে কেন এত কথা বললাম, তা নিয়ে পাঠকের প্রশ্ন জাগা অস্বাভাবিক নয়। এর কারণ হলো, কারিনা অসুস্থ হওয়ার পর ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তাকে নিয়ে এতসব আজেবাজে কমেন্ট দেখেছি, তাতে মেয়েটির পারিবারিক পরিচিতি জনসমক্ষে উপস্থাপনের প্রয়োজন বোধ করেছি।

কারিনা যখন লিভার জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে তখনই। পিতা কায়সার হামিদের জনপরিচিতি এর মূল কারণ। অবশ্য কারিনা নিজেও কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে ভার্চুয়াল জগতে বেশ ভালোই পরিচিত ছিল। ফলে তার হঠাৎ অসুস্থতা ও দ্রুত অবনতি জনমনে উদ্বেগের সৃষ্টি করে। শুরু হয় তাকে নিয়ে ফেসবুকসহ নানা মাধ্যমে লেখালেখি। উদ্বিগ্ন দেশবাসী কারিনার দ্রুত আরোগ্য কামনা করে পোস্ট দিয়েছেন। কিন্তু এরই মধ্যে কিছু লোককে দেখা গেল কারিনার অসুস্থতায় উল্লাস প্রকাশ করে ফেসবুকে পোস্ট দিতে। তাদের লেখার মর্মার্থÑ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের দিন গণভবনে গিয়ে কারিনা ‘মহাপাপ’ করে ফেলেছে, তাই তার এ পরিণতি। বুঝতে বাকি রইল না, এরা সবাই আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক। এরই মধ্যে একজনের পোস্ট দেখে বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেলাম। লোকটি আমার পূর্বপরিচিত এবং বেশ ঘনিষ্ঠতাও ছিল একসময়। বর্তমানে তিনি সপরিবারে কানাডায় বসবাস করেন। সমাজে তার পরিচিতি ‘কবি’ হিসেবে।

হ্যাঁ, আমি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল নামের কবি হিসেবে পরিচিত লোকটির কথাই বলছি। দুলালের কবি পরিচিতির সাথে এটাও সবাই জ্ঞাত ছিলেন যে, তিনি আওয়ামী লীগের একজন সমর্থক। তাতে দোষের কিছু নেই। যে কেউ যেকোনো রাজনৈতিক আদর্শের অনুরাগী-অনুসারী হতেই পারেন। আমি নিজেও এর বাইরে নয়। কোনো একটি বিশেষ দলের সমর্থক হলেই বিবেক বন্ধক দিয়ে ফোঁপর দালালি করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। তবে আজীবন দেখেছি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল তাই করেছেন। তার স্বদলীয়-স্বগোত্রীয় অপরাপর কবি-সাহিত্যক তার ধান্দাবাজ চরিত্রের কথা প্রকাশ্যেই বলে থাকেন। তো শেখ হাসিনার এই সভাকবি কারিনা কায়সার অসুস্থ হওয়ার খবরে উল্লসিত হয়ে ফেসবুকে যে পোস্ট দিয়েছেন, তা দেখে বিবেকবান মানুষেরা হতভম্ব হয়ে গেছেন। তার পোস্টের শিরোনাম ছিলÑ ‘পাপ বাপকেও ছাড়ে না।’ ভেতরে তিনি যা লিখেছেন, তাতে বোঝাতে চেয়েছেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার দিন গণভবনে (বর্তমানে জুলাই জাদুঘর) প্রবেশ করে বিজয়োল্লাস করে করিনা কায়সার যে মহাপাপ করেছে, এখন তার শাস্তি পাচ্ছে।

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের কবি পরিচিতি যাদের জানা তারা স্তম্ভিত হয়ে গেছেন। কেননা, সংবেদনশীল মনের অধিকারী না হলে কারও পক্ষে কবি হওয়া সম্ভব নয়, মানুষের ধারণা সেটাই। অপরের দুঃখে-কষ্টে কবিদের হৃদয় হু হু করে ওঠে, এটাই জানত সবাই। কিন্তু কবি পরিচয়ে পরিচিত কেউ যখন একটি মেয়ের অসুস্থতা নিয়ে নিকৃষ্ট মন্তব্য করে, তখন সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে, লোকটার বিবেক কি পচে-গলে নর্দমার ময়লার সঙ্গে মিশে গেছে?

শেখ হাসিনার ‘আদরের দুলাল’ স্বঘোষিত দেশপ্রেমিক সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল কয়েক দশক ধরে দেশ থেকে বহু দূরে কানাডার অটোয়ায় অবস্থান করছেন। আওয়ামী লীগের জমানায় ফেব্রুয়ারি মাসের বইমেলা উপলক্ষে দেশে আসতেন। হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরে আর এমুখো হননি। ২০২৩ সালে একবার এসেছিলেন বাংলা একাডেমি পদক হাতিয়ে নেওয়ার জন্য। তার সতীর্থদের কেউ কেউ এই পদক বাগানোর নেপথ্যের কারণ উল্লেখ করে তার নামের শেষাংশে ‘দ-এ উ-কার’-এর পরিবর্তে ‘আ-কার’ ব্যবহার করেন। এখন তিনি সম্ভবত মর্মযাতনায় ভুগছেন, লীগ জমানার অবসানে। তাই শেখ হাসিনা সরকারের পতন আন্দোলনের সৈনিক ‘জুলাই সংগ্রামীরা’ তার চোখের বালিতে পরিণত হয়েছেন। কারণ আওয়ামী লীগের তল্পিবহন আর কবিতাকে জিহ্বা বানিয়ে শেখ হাসিনার পদলেহন করে কাঙ্ক্ষিত বস্তু অর্জনের সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। দেশবাসীর প্রশ্ন করার অধিকার আছে, আওয়ামী লীগের পায়রোবি ছাড়া দেশ ও জাতির কল্যাণে দুলাল এ জীবনে কী অবদান রেখেছেন? মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করতে দেখেও যে ‘কবি’র বিবেক দংশিত হয় না, মনুষ্য পদবাচ্য তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

কারিনা কায়সার আজ নেই। সে ছিল লীগ-দুঃশাসনবিরোধী চূড়ান্ত আন্দোলনের একজন অগ্রগামী বীর সৈনিক। কারিনাদের মতো লাখ লাখ ছেলেমেয়ের সাহস ও দৃঢ়তার কারণেই বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদী শাসনের রাহুমুক্ত হয়েছে, ফিরে এসেছে গণতন্ত্র। তাদের জানবাজ আন্দোলনের ফলে ‘পালাব না’ বলে দম্ভোক্তি করা শেখ হাসিনা ও তার স্যাঙাতরা লোকচক্ষুর অন্তরালে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। আর সেজন্য কারিনাদের স্থান হবে ইতিহাসের গৌরবময় আসনে। অন্যদিকে পতিত হাসিনার পদ লেহনকারী দুলালরা নিক্ষিপ্ত হবে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে।

 

       (মতামত লেখকের নিজস্ব)


    মহিউদ্দিন খান মোহন

 সহকারী সম্পাদক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা