× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সন্ধিক্ষণে ড্রাগন-ঈগল

শি-ট্রাম্প বৈঠক: তাইওয়ান, ইরান ও নতুন বিশ্বরাজনীতির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

কাজী জিয়া উদ্দিন

প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬ ১৪:৪৩ পিএম

আপডেট : ১৭ মে ২০২৬ ১৪:৫৪ পিএম

কাজী জিয়া উদ্দিন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

কাজী জিয়া উদ্দিন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শি জিনপিং এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বৈঠক কেবল দুই রাষ্ট্রনেতার আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ নয়, এটি ছিল বর্তমান বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য, কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার এক গভীর প্রতিচ্ছবি। বেইজিংয়ের রাজকীয় আয়োজন, উষ্ণ করমর্দন এবং পরিমিত কূটনৈতিক ভাষার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক জটিল বাস্তবতা। ড্রাগন ও ঈগল আজ একই আকাশে উড়লেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এক নয়।

রাজনৈতিক রূপকে চীন হলো ড্রাগন। প্রাচীন সভ্যতা, ধৈর্য, নীরব কৌশল এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রতীক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতীক ঈগল শক্তি, স্বাধীনতা, আধিপত্য এবং বৈশ্বিক প্রভাবের রূপকার। ফলে এই বৈঠক যেন ছিল দুটি সভ্যতাভিত্তিক শক্তির ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে মুখোমুখি অবস্থান।

কূটনৈতিক সৌন্দর্যের আড়ালে শক্তির নীরব লড়াই

চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদপত্র পিপলস ডেইলি বৈঠকটিকে আখ্যায়িত করেছে “স্থিতিশীল সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার নতুন সূচনা” হিসেবে। পত্রিকাটি লিখেছে, “বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই শক্তির মধ্যে সংঘাত নয়, সহযোগিতাই মানবজাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে”।

চীনের আরেক প্রভাবশালী পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস আরও স্পষ্ট ভাষায় মন্তব্য করেছে, “চীন আর কারও অনুসারী নয়, চীন এখন সমমর্যাদার বৈশ্বিক শক্তি”।

এই বক্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বেইজিংয়ের বর্তমান মনস্তত্ত্ব। চীন এখন বিশ্বকে বোঝাতে চাইছে তারা আর কেবল উৎপাদননির্ভর অর্থনীতি নয় বরং প্রযুক্তি, কূটনীতি ও সামরিক সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ প্রতিদ্বন্দ্বী।

অন্যদিকে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, “এই বৈঠকের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল প্রতীকী বেইজিং এমন এক চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সমান উচ্চতায় অবস্থান করছে”।

অর্থাৎ বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্র ধীরে ধীরে এক মেরু বাস্তবতা থেকে বহুমেরু বাস্তবতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিশ্বকে এমন বার্তাই যেন দিয়েছে এই সম্মেলন।

তাইওয়ান: নীরব আগ্নেয়গিরি

বৈঠকের দৃশ্যপটে হাসি ও সৌজন্য থাকলেও, অদৃশ্যভাবে সবচেয়ে উত্তপ্ত বিষয় ছিল তাইওয়ান।

গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, “তাইওয়ানের বিষয় এখন চীনের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন, এখানে আপোশের সুযোগ নেই”।

তাইওয়ানের স্বাধীনতাপন্থী অবস্থানকে উৎসাহিত করা হলে তা বিপজ্জনক সংঘাত ডেকে আনতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন শি জিনপিং।

অন্যদিকে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, “ওয়াশিংটন আপাতত উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে বেশি আগ্রহী, সরাসরি সংঘাতে নয়”।

এই সংযমী অবস্থান প্রমাণ করে, উভয় পক্ষই জানে তাইওয়ান প্রসঙ্গ ভুল পথে মোড় নিলে তা শুধু এশিয়া নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

অর্থনীতি: সহযোগিতা নাকি কৌশলগত নির্ভরতার নতুন রূপ

বৈঠকে ট্রাম্প বোয়িং বিমান, কৃষিপণ্য, প্রযুক্তি ও শিল্প বিনিয়োগ নিয়ে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সমঝোতার কথা বলেছেন। মার্কিন করপোরেট প্রতিনিধিদের উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়।

চায়না ডেইলি লিখেছে, “চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সহযোগিতা শুধু দুই দেশের জন্য নয়, পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্ “।

কিন্তু দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মন্তব্য করেছে ভিন্ন সুরে। তারা বলছে, “বাণিজ্যিক ঘোষণা ছিল অনেক, কিন্তু বাস্তবসম্মত ও বাধ্যতামূলক চুক্তি ছিল সীমিত”।

ইরান প্রসঙ্গ: মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাপ ও বৈশ্বিক সমীকরণ

এই বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তুলনামূলক কম আলোচিত বিষয় ছিল ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি।

মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সমুদ্রপথে উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল চীন আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিক।

দ্য গার্ডিয়ান বলছে, “ওয়াশিংটন এখন বুঝতে পারছে, মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চীনকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা আর সম্ভব নয়”।

অন্যদিকে চীনা সংবাদমাধ্যম পিপলস ডেইলি লিখেছে, “সংঘাত নয়, রাজনৈতিক সংলাপই মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার একমাত্র পথ”।

চীন এখানে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তারা একদিকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি বিরোধেও যেতে চায় না।

এই অবস্থান চীনের বৃহত্তর কৌশলকে স্পষ্ট করে তারা বিশ্ব রাজনীতিতে এমন এক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যারা সংঘাতের পক্ষ নয় বরং প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী।

মানবাধিকার ও আদর্শিক বিভাজন

বৈঠকে মানবাধিকার প্রশ্নও উঠে আসে, বিশেষত হংকংয়ের গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব জিমি লাই প্রসঙ্গে।

দ্য গার্ডিয়ানের ভাষ্য, “মানবাধিকার প্রশ্নে দুই দেশের আদর্শিক দূরত্ব এখনও গভীর”।

যুক্তরাষ্ট্র ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রশ্নকে সামনে রাখছে, আর চীন অগ্রাধিকার দিচ্ছে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ। এই আদর্শিক বিভাজনই দুই পরাশক্তির সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।

উপসংহার: ভবিষ্যতের আকাশে ড্রাগন ও ঈগলের দীর্ঘ উড়ান

সবশেষে বলা যায়, শি–ট্রাম্প বৈঠক কোনো ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি নয়। আবার এটিকে নিছক কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতাও বলা যাবে না। এটি ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পরাশক্তির মধ্যে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ, প্রভাব বিস্তার এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা নির্ধারণের এক সূক্ষ্ম কৌশলগত অধ্যায়।

চীন বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছে তারা এখন আত্মবিশ্বাসী, সুসংগঠিত এবং সমমর্যাদার বৈশ্বিক শক্তি।

যুক্তরাষ্ট্র বুঝিয়ে দিয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যত গভীরই হোক, সংলাপের পথ বন্ধ করা যাবে না।

তাই আজ ড্রাগন ও ঈগল একই আকাশে উড়ছে। কখনও পাশাপাশি, কখনও প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে, কখনও সতর্ক দূরত্ব বজায় রেখে।

আর পুরো পৃথিবী গভীর উদ্বেগ ও কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে এই দুই মহাশক্তির সম্পর্ক কি বিশ্বকে সহযোগিতার নতুন দিগন্তে নিয়ে যাবে, নাকি মানবসভ্যতা প্রবেশ করবে নতুন এক দীর্ঘ শীতল প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগে।


কাজী জিয়া উদ্দিন
অবসরপ্রাপ্ত ডি আই জি

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা