× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ব্লু-ইকোনমির হাতছানি এবং আমাদের বৈশ্বিক উত্তরণ

শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬ ১৪:১৬ পিএম

ব্লু-ইকোনমির হাতছানি এবং আমাদের বৈশ্বিক উত্তরণ

একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতি এখন আর কেবল স্থলভাগের সীমানা নির্ধারণে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এখন প্রবাহিত হচ্ছে লোনা জলের বিশাল জলরাশিতে। গত ২১ এপ্রিল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত কলামে উল্লেখ করেছিলাম কীভাবে মালাক্কা প্রণালী থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত এক বিশাল স্নায়ুযুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। আজ আমরা দেখব, এই উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপর সওয়ার হয়ে বাংলাদেশ কীভাবে তার অর্থনৈতিক ভাগ্যলিপি লিখছে এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর টানাপড়েনের মাঝে নিজের অবস্থানকে সুসংহত করছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভার্চুয়াল মহাদেশের সৃষ্টি

২০১৪ সালে মিয়ানমার এবং ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার অঞ্চলের সার্বভৌম অধিকার লাভ করেছে। এই সুবিশাল নীল জলরাশি কেবল জলরাশি নয়, এটি একটি ‘ভার্চুয়াল মহাদেশ’। বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের প্রায় সমপরিমাণ এই এলাকায় লুকিয়ে আছে খনিজ সম্পদ, মৎস্যভান্ডার এবং অফুরন্ত জ্বালানি সম্ভাবনা। ১৯৭৪ সালে ‘টেরিটোরিয়াল ওয়াটার্স অ্যান্ড মেরিটাইম জোনস অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করা হয়- যা ছিল তৎকালীন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি দূরদর্শী। সেই আইনি কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই আজকের সমুদ্র বিজয় সম্ভব হয়েছে। এই বিজয় বাংলাদেশকে একটি ‘ল্যান্ডলকড’ মানসিকতা থেকে বের করে ‘মহাসাগরীয় রাষ্ট্রে’ পরিণত করেছে।

নীল অর্থনীতির তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক স্তম্ভ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ‘ব্লু-ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতি এখন আর কোনো তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং এটি টেকসই উন্নয়নের অন্যতম মূল স্তম্ভ। বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের মতে, নীল অর্থনীতি হলো সমুদ্রের বাস্তুসংস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবহার করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানে বিশ্ববাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই পরিচালিত হয় সমুদ্রপথে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, মোংলা এবং নবনির্মিত পায়রাবন্দর এখন কেবল দেশীয় পণ্য খালাসের কেন্দ্র নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার ট্রানজিট হাব হওয়ার পথে।

বাংলাদেশ সরকারের ‘প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১’ (Perspective Plan 2041) এবং ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ (Delta Plan 2100)-এ নীল অর্থনীতিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ, সমুদ্রতলের খনিজ সম্পদ, জাহাজ নির্মাণ শিল্প, সামুদ্রিক পর্যটন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিÑ এই পাঁচটি ক্ষেত্রকে নীল অর্থনীতির মূল স্তম্ভ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কৌশলগত অবকাঠামো

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বে-টার্মিনাল নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশ যে বার্তা দিয়েছে তা স্পষ্টÑ আমরা কেবল নিজেদের চাহিদা পূরণ নয়, বরং আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হতে চাই। জাপানের অর্থায়নে নির্মিতব্য মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরটি এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে একটি গেম-চেইঞ্জার। এটি মালাক্কা প্রণালীর ওপর চাপ কমিয়ে সরাসরি দক্ষিণ এশিয়ার সাথে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর সংযোগ স্থাপন করবে।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো (সেভেন সিস্টার্স) এবং নেপাল-ভুটানের জন্য এই বন্দর আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি মাদার ভেসেল বা বড় জাহাজ যখন সরাসরি মাতারবাড়ীতে ভিড়তে পারবে, তখন ফিডার ভেসেলের খরচ কমে যাবে প্রায় ২০-৩০ শতাংশ। এটি বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে বিশ্ববাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে। তবে এই উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালে রয়েছে বিশাল ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ।

ইন্দো-প্যাসিফিক বনাম বেল্ট অ্যান্ড রোড

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ (আইপিএস)-এর মাধ্যমে চায় এই অঞ্চলে ভারতের প্রভাব বাড়ুক এবং চীনের আধিপত্য খর্ব হোক। তাদের লক্ষ্য হলো একটি ‘মুক্ত ও অবাধ’ নৌপথ নিশ্চিত করা, যার মূল উদ্দেশ্য দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের একাধিপত্য কমানো। অন্যদিকে চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর আওতায় বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে দেখে। চীন চায় তাদের ইউনান প্রদেশ থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত একটি বিকল্প পথ তৈরি করতে, যাতে মালাক্কা প্রণালী কোনো কারণে অবরুদ্ধ হলে তাদের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত না হয়।

বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ হলোÑ এই দুই মেরুর কোনো একটির দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে না পড়ে নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ আদায় করা। বাংলাদেশ সম্প্রতি তার নিজস্ব ‘ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক’ প্রকাশ করেছে, যেখানে উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, সামরিক জোটে নয়। এটি একটি অত্যন্ত বিজ্ঞোচিত কূটনৈতিক পদক্ষেপ।

সমুদ্রতলের সম্পদ ও জ্বালানি নিরাপত্তা

বঙ্গোপসাগরের তলদেশে রয়েছে বিপুল পরিমাণ গ্যাস হাইড্রেট (জমাট বরফের মতো মিথেন গ্যাস) এবং খনিজ সম্পদের আকর। নেদারল্যান্ডসের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশের সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, বাংলাদেশের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে (EEZ) প্রায় ০.১১ থেকে ০.৬৩ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাস হাইড্রেট থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো জানে যে, আগামীর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি। বাংলাদেশ যদি সঠিকভাবে গভীর সমুদ্র থেকে সম্পদ আহরণ করতে পারে, তবে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজতর হবে। তবে গভীর সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও বিশাল বিনিয়োগ বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সমুদ্রের ব্লকগুলোতে অনুসন্ধানের জন্য মার্কিন কোম্পানি এক্সন মবিল থেকে শুরু করে চীনা রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলো আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাটা বাংলাদেশের জন্য কেবল অর্থনৈতিক নয় বরং একটি উচ্চমানের কূটনৈতিক পরীক্ষা। কারণ, এক পক্ষকে কাজ দেওয়া মানে অন্য পক্ষকে অসন্তুষ্ট করা। বাংলাদেশ এখানে ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’Ñ এই মূলনীতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।

ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের কেন্দ্রবিন্দু বঙ্গোপসাগর

বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতির উত্থান বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর নজর এড়ায়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বারবার বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও মানবাধিকারের দোহাই দিলেও নেপথ্যে তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো বঙ্গোপসাগরে নিজেদের কৌশলগত আধিপত্য বজায় রাখা। কোয়াড (QUAD) জোটের মাধ্যমে তারা ভারতকে সাথে নিয়ে এই অঞ্চলে একটি প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করতে চায়। বঙ্গোপসাগরের সেন্টমার্টিন দ্বীপ বা অন্য কোনো কৌশলগত স্থানে তাদের নজর রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করেন।

অন্যদিকে, চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে নিজেদের প্রভাব সংহত করতে চাইছে। কর্ণফুলী টানেল বা পায়রাবন্দরের মতো মেগা প্রজেক্টগুলোতে চীনের অংশগ্রহণ তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। তারা জানে যে, মালাক্কা প্রণালী যদি কখনও অবরুদ্ধ হয়, তবে চট্টগ্রাম বা পায়রাবন্দর তাদের জন্য বিকল্প পথ হিসেবে কাজ করতে পারে। এই দুই শক্তির প্রতিযোগিতার মাঝে বাংলাদেশ যদি কোনো ভুল পদক্ষেপ নেয়, তবে তা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

মৎস্যসম্পদ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য

ব্লু-ইকোনমির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ। বর্তমানে বাংলাদেশের মৎস্য উৎপাদনের একটি বিশাল অংশ আসে ইলিশ আহরণ থেকে। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১৫ শতাংশ আসে সমুদ্র থেকে। কিন্তু আমাদের সামুদ্রিক মাছ ধরার সীমা মূলত উপকূলেই সীমাবদ্ধ। গভীর সমুদ্রে টুনা বা অন্যান্য দামি মাছ ধরার সক্ষমতা আমাদের এখনও কম। সরকার বর্তমানে ব্লু-গ্রোথ কৌশলের আওতায় গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার জন্য লাইসেন্স প্রদান শুরু করেছে। আধুনিক প্রযুক্তি এবং গভীর সমুদ্রের জাহাজ (Long Liner) ব্যবহারের মাধ্যমে এই খাত থেকে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব। 

পর্যটন ও পরিবেশগত ভারসাম্য

পাশাপাশি পর্যটন খাতেও রয়েছে অপার সম্ভাবনা। কক্সবাজার থেকে শুরু করে সেন্টমার্টিন এবং সুন্দরবনের উপকূলীয় অঞ্চল ঘিরে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন কঠোর নিরাপত্তা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা। কারণ, বাণিজ্যিক ব্যবহারের চাপে যদি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে তা হবে আত্মঘাতী।

বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-এ উপকূলে জেগে ওঠা নতুন চরগুলোকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। যদি ক্রস-ড্যাম বা টেকসই বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে নতুন জমি পুনরুদ্ধার করা যায়, তবে তা কৃষি ও পর্যটনের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের উপকূলের জন্য বড় ঝুঁকি। নীল অর্থনীতি বাস্তবায়নের সময় এই ‘ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স’ বা জলবায়ু সহনশীলতার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা

বাংলাদেশের জন্য বর্তমান সময়টি একটি ‘কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার’ সময়। একদিকে আমাদের প্রয়োজন চীনের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি, অন্যদিকে প্রয়োজন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ও ভারতের সাথে স্থিতিশীল সীমান্ত ও নিরাপত্তা। এই জটিল সমীকরণে বাংলাদেশের কৌশল হওয়া উচিত ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বজায় রাখা। অর্থাৎ, কোনো জোটে সরাসরি যোগ না দিয়ে নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

এই সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য আমাদের নৌবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আওতায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী এখন একটি ত্রিমাত্রিক বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে। সাবমেরিন সংযোজন থেকে শুরু করে নিজেদের ডকইয়ার্ডে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণÑ এই সক্ষমতাগুলো আমাদের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল (EEZ) সুরক্ষিত রাখতে অপরিহার্য। কারণ, সম্পদ থাকলেও যদি তা পাহারা দেওয়ার ক্ষমতা না থাকে, তবে তা অন্যের দখলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

মানবসম্পদ ও কারিগরি দক্ষতা

নীল অর্থনীতি থেকে সুবিধা আদায় করতে হলে আমাদের দক্ষ মানবসম্পদ প্রয়োজন। বাংলাদেশে বর্তমানে সমুদ্রবিজ্ঞান চর্চার জন্য ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি’ এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ওশেনোগ্রাফি বিভাগ চালু করা হয়েছে। তবে শুধু তাত্ত্বিক শিক্ষা নয়, আমাদের প্রয়োজন দক্ষ নাবিক, সামুদ্রিক প্রকৌশলী এবং মৎস্য বিজ্ঞানী। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনে (UNCLOS) দক্ষ এমন বিশেষজ্ঞের অভাব আমাদের এখনও রয়েছে। বিদেশি পরামর্শকদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব বিশেষজ্ঞ প্যানেল তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ

নীল অর্থনীতির পথে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে : ১. তথ্য ও গবেষণার অভাব : সমুদ্রতলে ঠিক কী পরিমাণ সম্পদ আছে তার সঠিক ডেটাবেস এখনও তৈরি হয়নি। ২. বিনিয়োগের অভাব : গভীর সমুদ্রে বিনিয়োগ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। ৩. নিরাপত্তা ঝুঁকি : জলদস্যুতা এবং মানব পাচার সমুদ্রের অর্থনৈতিক পরিবেশকে বিঘ্নিত করে। ৪. সমন্বয়হীনতা : সমুদ্র সংশ্লিষ্ট কাজগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের (মৎস্য, জ্বালানি, নৌ-পরিবহন, পররাষ্ট্র) মধ্যে বিভক্ত। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ‘ব্লু-ইকোনমি কাউন্সিল’ বা একটি স্বতন্ত্র ‘নীল অর্থনীতি মন্ত্রণালয়’ গঠন করা যেতে পারে। যা এককভাবে সমুদ্রে সম্পদ আহরণ ও গবেষণার তদারকি করবে।

মালাক্কা থেকে বঙ্গোপসাগরÑ এই বিশাল জলপথ এখন বিশ্বরাজনীতির নাভিকেন্দ্র। বাংলাদেশ এই কেন্দ্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আমাদের নীল অর্থনীতি কেবল আমাদের দারিদ্র্যবিমোচনের হাতিয়ার নয়, এটি বিশ্বমঞ্চে আমাদের মর্যাদা ও প্রভাব বৃদ্ধির চাবিকাঠি। যদি আমরা সঠিক দূরদর্শী কূটনীতি এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারি, তবে বঙ্গোপসাগরই হবে বাংলাদেশের সমৃদ্ধির মহাসড়ক।

স্মরণ করা প্রয়োজন, রোমান বা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে আধুনিক আমেরিকাÑ সব পরাশক্তিই সমুদ্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে বিশ্ব শাসন করেছে। ‘He who rules the sea, rules the world’Ñ স্যার ওয়াল্টার র‍্যালির এই উক্তি আজও সমান সত্য। বাংলাদেশ এখন সেই ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। আমরা যদি আমাদের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমাকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারি, তবে বাংলাদেশ আর কেবল ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ নয়, বরং উদীয়মান এক ‘নীল বাঘ’ (Blue Tiger) হিসেবে বিশ্ব অর্থনীতিতে আবির্ভূত হবে। নীল দিগন্তের এই হাতছানিই বাংলাদেশের আগামীর রূপান্তর।


শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

কলাম লেখক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা