× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পদ্মা ব্যারাজ হতে পারে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬ ১৪:১৩ পিএম

পদ্মা ব্যারাজ হতে পারে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

বাংলার সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদীকে ঘিরে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনাÑ এই নদীগুলো শুধু জলধারা নয়; এরা বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনচক্রের অংশ। কিন্তু সেই নদীমাতৃক দেশ আজ নদী হারানোর বেদনায় কাতর। কোথাও নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, কোথাও নাব্যতা কমছে, কোথাও লবণাক্ততা গ্রাস করছে জনপদ। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু মানুষ বছরের পর বছর ধরে দেখেছে কীভাবে একসময়কার প্রমত্ত নদীগুলো ধীরে ধীরে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। কৃষকের মাঠে পানি নেই, জেলেদের জালে মাছ নেই, নদীপাড়ের জনপদে নেই আগের প্রাণচাঞ্চল্য।

এই বাস্তবতায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প শুধু একটি অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়; এটি হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, কৃষি ও পরিবেশ রক্ষার এক ঐতিহাসিক মোড় ঘোরানো সিদ্ধান্ত। সম্প্রতি সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক বৈঠকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটির অনুমোদন দেশের মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। 

বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের কাছে এটি বহুদিনের স্বপ্নপূরণের বার্তা। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, ১৯৬০-এর দশক থেকেই ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল ও রাজশাহী অঞ্চলের নদী, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের দাবি ওঠে। পরে ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার পর পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহ কমে গেলে এই দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে যে দাবি কেবল সভা-সেমিনার ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা অবশেষে বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছেÑ এটাই আজকের সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে পানির সংকটে ভুগছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলোতে পানির প্রবাহ এতটাই কমে যায় যে, কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যও এর ফলে হুমকির মুখে পড়েছে। একসময় যেসব নদী দিয়ে বড় বড় নৌযান চলত, এখন সেখানে হাঁটুপানি। নদীর বুকে জেগে উঠছে চর, নদীপাড়ে বাড়ছে ভাঙন ও দারিদ্র্য।

পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে দেশের ২৪টি জেলার প্রায় সাত কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। এটি নিছক কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বাস্তবতাও তাই বলছে। কারণ একটি কার্যকর ব্যারাজ কেবল পানি ধরে রাখবে না, বরং শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলোতে প্রবাহ নিশ্চিত করবে, সেচ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাবে এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতিকে পুনর্জীবিত করবে।

বাংলাদেশের কৃষি এখনও অনেকাংশে প্রকৃতিনির্ভর। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা, অনাবৃষ্টি ও লবণাক্ততা দিন দিন বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে পানি ব্যবস্থাপনা ছাড়া টেকসই কৃষি কল্পনাও করা যায় না। পদ্মা ব্যারাজ সেই জায়গায় হতে পারে গেম চেঞ্জার। যদি পরিকল্পিতভাবে সেচব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তাহলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জমিতে সারা বছর চাষাবাদ সম্ভব হবে। ধান, পাট, গম, ভুট্টা, শাকসবজিÑ সব ক্ষেত্রেই উৎপাদন বাড়বে।

একসময় বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলকে বলা হতো দেশের খাদ্যভান্ডার। কিন্তু পানির সংকট ও নদীর মৃত্যু সেই সম্ভাবনাকে ক্ষয় করেছে। পদ্মা ব্যারাজ সেই হারানো সম্ভাবনাকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে। কৃষকের মুখে হাসি ফিরলে দেশের অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে। কারণ কৃষি বাঁচলে গ্রাম বাঁচবে, গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। তবে পদ্মা ব্যারাজের গুরুত্ব শুধু কৃষিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে অসংখ্য দেশীয় মাছ বিলুপ্তপ্রায়। জলজ প্রাণী ও পাখির আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। অনেক নদী কার্যত মৃত হয়ে পড়েছে। ব্যারাজের মাধ্যমে যদি নদীতে ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে।

বিশেষ করে সুন্দরবন রক্ষায় এই প্রকল্পের সম্ভাবনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন আজ লবণাক্ততার চাপে বিপর্যস্ত। নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বনাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে যাচ্ছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল ঝুঁকির মুখে। পদ্মা ব্যারাজ যদি দক্ষিণাঞ্চলে মিঠাপানির প্রবাহ বাড়াতে পারে, তাহলে সুন্দরবনের জন্য তা হবে আশীর্বাদ।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই প্রকল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। নদীর নাব্যতা ফিরলে অভ্যন্তরীণ নৌপথ আবারও সক্রিয় হবে। পরিবহন ব্যয় কমবে, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। নদীকেন্দ্রিক পর্যটন বাড়বে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পায়নও গতি পেতে পারে।

বিশ্বের বহু দেশ তাদের পানিসম্পদকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটিয়েছে। চীন, নেদারল্যান্ডস কিংবা মিসরের মতো দেশগুলো নদী ব্যবস্থাপনাকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রে রেখেছে। বাংলাদেশও যদি সঠিক পরিকল্পনা ও দক্ষ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প সম্পন্ন করতে পারে, তাহলে এটি হতে পারে দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও রয়েছে। বাংলাদেশে বড় বড় প্রকল্প নিয়ে মানুষের আশার পাশাপাশি শঙ্কাও কম নয়। কারণ অতীতে অনেক প্রকল্প দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘসূত্রতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যয় বেড়েছে, সময় পেরিয়েছে, কিন্তু জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুফল পায়নি। পদ্মা ব্যারাজের ক্ষেত্রেও সেই পুরনো চিত্র যেন ফিরে না আসে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের সমীক্ষা, দক্ষ প্রকৌশল পরিকল্পনা ও পরিবেশগত ভারসাম্যের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব। শুধু ব্যারাজ নির্মাণ করলেই হবে না; নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি ব্যবস্থাপনা, ড্রেজিং ও সেচ অবকাঠামোর সমন্বিত পরিকল্পনাও থাকতে হবে। অন্যথায় এটি আরেকটি ব্যয়বহুল কিন্তু অকার্যকর প্রকল্পে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

বাংলাদেশ এখন এক সংকটময় কিন্তু সম্ভাবনাময় সময় অতিক্রম করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, পানির সংকট ও পরিবেশ বিপর্যয়ের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। পদ্মা ব্যারাজ সেই ধরনের একটি সিদ্ধান্ত হতে পারেÑ যদি এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়।

আজ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষক যখন আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির অপেক্ষা করেন, যখন নদীপাড়ের জেলে খালি জাল নিয়ে ঘরে ফেরেন, যখন লবণাক্ত পানিতে ফসল নষ্ট হয়ে কৃষকের চোখে হতাশা জমে ওঠে তখন পদ্মা ব্যারাজ শুধু একটি প্রকল্প নয়; এটি হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার আশা।

বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, এই দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখতে জানে। একসময় পদ্মা সেতুকেও অনেকে অসম্ভব বলেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। পদ্মা ব্যারাজও যদি সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি কেবল একটি অবকাঠামো হবে না; এটি হবে বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি পুনর্জাগরণ ও পরিবেশ রক্ষার নতুন মহাকাব্য। যা খুলে দিতে পারে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত।


আহসান হাবিব বরুন

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা