শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬ ১৪:১০ পিএম
প্রতিবছর ১৭ মে বিশ্বব্যাপী ‘বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস’ পালিত হয়। উচ্চ রক্তচাপ বা ‘নীরব ঘাতক’ (Silent Killer) সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ এবং নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ওয়ার্ল্ড হাইপারটেনশন লীগ (WHL) ২০০৫ সাল থেকে এই দিনটি পালন করে আসছে। এবার বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবসের (World Hypertension Day) প্রতিপাদ্য : Controlling Hypertension Together! যা ওয়ার্ল্ড হাইপারটেনশন লীগ (WHL) কর্তৃক তৈরি, যার মূলভাব হলো একসাথে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং এতে ট্যাগলাইন হিসেবে রয়েছে নিয়মিত আপনার রক্তচাপ পরীক্ষা করুন, নীরব ঘাতককে পরাজিত করুন। বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। এ রোগে শুধু একজন ব্যক্তির নয়, তার পুরো পরিবারের জন্য বিপর্যয় বয়ে আনে। এ রোগ শুধু শারীরিক নয়, মানসিক এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও ঘটায়। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে উচ্চ রক্তচাপ আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। দেশে গড়ে এক-চতুর্থাংশ মানুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ রোগটি রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে এ রোগটির সুচিকিৎসার কথাটি প্রথমেই চলে আসে। এ রোগ প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই। সচেতনতা উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেসার নীরব ঘাতক ব্যাধি হিসেবে অভিহিত।
সাধারণত অন্যান্য রোগের মতো এই রোগের কোনো উপসর্গ থাকে না এবং তেমন কোনো কষ্ট অনুভূত না হওয়ায় অধিকাংশ মানুষ রোগটির চিকিৎসা গ্রহণে উদ্যোগী হয় না কিংবা চিকিৎসা নিলেও চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ না করে নিয়মিত ওষুধ সেবন বন্ধ করে দেয়। রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রায় না থাকলে আমাদের অজান্তেই হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক, কিডনি, চোখ ও রক্তনালিগুলোর নানা রকম ক্ষতি হতে থাকে। ফলে আমরা আকস্মিক হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও কিডনি রোগের মতো গুরুতর রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকি। এমনকি এই রোগের জটিলতায় পরিণামে বরণ করে নিতে হতে পারে পঙ্গুত্ব অথবা অকাল মৃত্যু। স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ রোগটিকে যেমন প্রতিরোধ করা সম্ভব তেমনি যথাযথ চিকিৎসা নিয়ে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে এই ঝুঁকিগুলোও অনেকাংশে কমানো সম্ভব। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এদেশে এই রোগের চিকিৎসা দেওয়ার মতো সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বড়ই অভাব। বাংলা একাডেমির ফেলো, বিশিষ্ট লেখক, রংপুর মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ, বর্তমানে টিএমএসএস মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ, মেডিসিনের দিকপাল চিকিৎসক ও সমাজসেবক অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেন এই মারাত্মক ব্যাধির সমস্যায় সর্ব প্রথম এগিয়ে এসেছেন। তিনি ২০০৮ সালের ১৪ নভেম্বর উচ্চ রক্তচাপ রোগী ও জনগণকে সচেতনতা করতে রংপুরে হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান এবং তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছেন। অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন এবং তার এই প্রতিষ্ঠানের অকৃত্তিম সেবাধর্মী কাজের জন্য বাংলাদেশের চিকিৎসকদের আইকন হয়েছেন। উচ্চ রক্তচাপ রোগের চিকিৎসায় এদেশে তার অবদান অলোকসামান্য।
আমরা মনে করছি, অধ্যাপক ডা. জাকিরের জীবনে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা এক বিরাট মহত্তম কাজ। তিনি এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক। অধ্যাপক ডা. জাকির দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে অদ্যাবধি বিনামূল্যে এই প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করে আসছেন।
জানা যায়, এ প্রতিষ্ঠানে ২৯.০৪.২০২৬ তারিখ পর্যন্ত ৬০,৬০১ জন নিবন্ধনকৃত রোগী নিয়মিত চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন। তন্মধ্যে ৪৫,৭৯৭ জন উচ্চ রক্তচাপের রোগী রয়েছে। ডা. জাকিরের একটি বিশেষ গুণ হলো কেউ অসুস্থ হলে তিনি জানতে পেলে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেন। তার চিকিৎসাসেবার এই প্রয়াস গণমানুষের জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গত ২৯.০৪.২০২৬ তারিখ পর্যন্ত তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রায় দেড় লাখ রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। তিনি বগুড়ায় বাস করলেও দেশজুড়ে ডক্টর কমিউনিটিজ ও হাসপাতাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।
প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলায় হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের নিয়মিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিনামূল্যে ব্লাড প্রেসার, ডায়াবেটিস ও বিএমআই নির্ণয় করে হাজার হাজার মানুষকে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস শনাক্ত এবং শনাক্তকৃত রোগীদের রোগ সম্পর্কে কাউন্সেলিং করা হচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানে আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে কমিউনিটি লেভেলে বিনামূল্যে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা প্রদান কার্যক্রম সুনিপুণভাবে সম্পাদন করা হয়। উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে, ডেটা সংরক্ষণ, রিসার্চ মেথডোলজিসহ কয়েকটি একাডেমিক প্রশিক্ষণ কোর্স ও গবেষণায় এটিই বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান থেকে একটি হাইপারটেনশন পত্রিকা প্রকাশিত হয়। প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। কিংবদন্তি চিকিৎসক অধ্যাপক জাকির ও তার প্রতিষ্ঠান দেশে উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি ও রোগ নিয়ন্ত্রণে স্মরণীয় ভূমিকা রেখে চলেছেন।
অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন তার ব্যক্তিগত জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় ও উপার্জিত অর্থের অনেকটাই ব্যয় করেন সমাজসেবায়। তিনি মানুষের কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারসহ তার প্রতিষ্ঠিত আরও ৭টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি নানা কল্যাণমুখী সামাজিক কাজকর্ম ছড়িয়ে দিচ্ছেন। শিক্ষানুরাগী অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেনের পিতা ডা. ওয়াছিম উদ্দিন আহমেদ (১৯১৫-১৯৯৪) নিজ এলাকায় বগুড়ার ধুনটের গোঁসাইবাড়ীতে নারী শিক্ষার প্রসারে বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে জমি ও নগদ অর্থ দান করেন। এই অর্থে গোঁসাইবাড়ীতে করিম বকস ওয়াছিম উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে।
শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান
লেখক ও গবেষক