ইমেইল থেকে
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬ ১৩:৫৬ পিএম
আপডেট : ১৬ মে ২০২৬ ১৫:২৩ পিএম
বর্ষায় হাওরে তলিয়ে যাওয়া ফসল। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
প্রকৃতি যেখানে অবারিত ঐশ্বর্য ঢেলে দিয়েছে, সেই হাওরাঞ্চল আজ বিষাদের কালো ছায়ায় আচ্ছন্ন। কবি জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’র সেই স্নিগ্ধ সজল প্রকৃতি যেন আজ তার সন্তানদের চোখের জলে একাকার। যা হাওর-বাঁওড়ের বিস্তৃতি এক সজল মানচিত্র।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এক বিশাল জলমগ্ন জনপদ হলো সিলেট বিভাগ। এখানে মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও হবিগঞ্জ জেলায় ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ছোট-বড় হাওর। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই বিভাগে প্রায় ১৫৫টি হাওর ও অসংখ্য বাঁওড় রয়েছে, যার মোট আয়তন বিশাল। বিশেষ করে, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর বা হাকালুকি হাওরের নাম তো বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জলাভূমি কেবল মাছের ভান্ডার নয়, বরং বোরো ধানের এক বিশাল চারণভূমি।
আরও পড়ুন: হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ৩ মাস খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে: ত্রাণমন্ত্রী |
সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের
এক নিষ্ঠুর থাবা পড়েছে সিলেট বিভাগে। ২০২২ ও ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি মুছতে
না মুছতেই ২০২৬ সালের এই আগাম বন্যায় সুনামগঞ্জ ও সিলেটের কৃষকের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে
গেছে। পাকা ধান কাটতে না কাটতেই পাহাড়ি ঢল এসে কেড়ে নিয়েছে সব। চারদিকে আজ শুধু হাহাকার
আর ‘হাওরের কান্না’। ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত কিশোরগঞ্জ জেলাকে বলা হয় ‘হাওরের রাজধানী’।
এই বিভাগের কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা ও মুন্সীগঞ্জের কিছু অংশে জালের মতো ছড়িয়ে আছে বাঁওড়
ও জলাভূমি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বিভাগে হাওরের সংখ্যা ৫২টি এবং বাঁওড় রয়েছে অগণিত।
এই জলাশয়গুলো বর্ষায় সাগরের মতো রূপ ধারণ করে, আবার শুকনো মৌসুমে হয়ে ওঠে সোনারঙা ধানের
ক্ষেত।
ময়মনসিংহ বিভাগে নেত্রকোণার খালিয়াজুড়ি
বা কলমাকান্দার মতো এলাকাগুলো পুরোপুরি হাওর-নির্ভর। এ বিভাগে প্রায় ৩০টির মতো বড় হাওর
রয়েছে। এখানকার ভূ-প্রকৃতি এমন যে, সামান্য বৃষ্টিতেই ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢল মুহূর্তের
মধ্যে ফসলের মাঠ গ্রাস করে নেয়। পরিসংখ্যান বলছে, এই অঞ্চলের কৃষি মূলত এই হাওরগুলোর
জোয়ার-ভাটার ওপরই নির্ভরশীল। চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর ও সরাইল
উপজেলা হাওরাঞ্চলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নাসিরনগরের রামপুর গ্রামের সেই বুকফাটা আর্তনাদ
প্রমাণ করে, এ বিভাগে প্রায় ১০টি বড় হাওর কৃষকদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে। মেঘনা ও তিতাস
নদীর অববাহিকায় অবস্থিত এই বাঁওড়গুলো একসময় মাছ ও ফসলে উপচে পড়ত, যা আজ জলবায়ু পরিবর্তনের
শিকার। নাসিরনগরের সেই করুণ দৃশ্যটি চট্টগ্রাম বিভাগের প্রকৃত অবস্থাকেই তুলে ধরে।
রংপুর বিভাগে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের
আগ্রাসনে কৃষকের ফসল-বিনাশী দৃশ্য এখন নিত্যনৈমিত্তিক। চরাঞ্চলগুলোতে চাষ করা চীনাবাদাম,
ভুট্টা ও ধান হঠাৎ বন্যায় পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উত্তরের এই মানুষগুলো সারা বছর কায়িক
শ্রম দিয়ে যা ফলায়, তা এক নিমিষেই প্রকৃতির করাল গ্রাসে হারিয়ে যায়। এখানকার প্রায়
১৮টি বড় বিল এবং চরাঞ্চল হাওরের মতোই আচরণ করে। এই বিস্তীর্ণ বালুচর ও জলমগ্ন এলাকাগুলোতে
রবিশস্য এবং ধানের চাষ হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রাজশাহী বিভাগ মূলত বরেন্দ্র অঞ্চলের
জন্য পরিচিত হলেও চলনবিলের এক বিশাল অংশ এই বিভাগে পড়েছে। পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ
জেলাজুড়ে বিস্তৃত এই চলনবিল বাংলাদেশের বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ জলাভূমি। এখানকার বাঁওড়
ও বিলগুলোতে মাছ চাষের পাশাপাশি প্রচুর ধান উৎপাদন হয়, যার মোট আয়তন প্রায় ৮০০ বর্গকিলোমিটারেরও
বেশি। চলনবিলে এখন জলাবদ্ধতা এক বড় সমস্যা। অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও বাঁধের কারণে পানি
নামতে পারছে না। ফলে ধান পাকার আগেই ডুবে যাচ্ছে। চলনবিলের হাজার হাজার কৃষক এখন নিঃস্ব।
খুলনা ও বরিশাল বিভাগে ‘বাঁওড়’ বা
অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের আধিক্য সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে ঝিনাইদহ, যশোর ও কুষ্টিয়া
জেলায় বড় বড় ৫৪টি বাঁওড় রয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের এই জলাভূমিগুলো লবণাক্ততার চ্যালেঞ্জ
মোকাবিলা করেও স্থানীয় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখে। তবে সাম্প্রতিক জলোচ্ছ্বাস ও
জোয়ারের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি এই হাসি কেড়ে নিচ্ছে। বরিশাল ও পটুয়াখালীর কথা না বললেই
নয়। এ অঞ্চলের নদীগুলোর মোহনায় গড়ে ওঠা ছোট-বড় অসংখ্য ‘দোন’ বা জলাভূমি হাওরের মতো
বৈশিষ্ট্য বহন করে। এখানকার প্রায় ৪০টি বড় বিলে কৃষকরা ফসল ফলায়।
হাওরের কান্না বন্ধ করতে হলে প্রথমেই
সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি ‘মাস্টারপ্ল্যান’ গ্রহণ করতে হবে। নেদারল্যান্ডসের আদলে আমাদের
ডেল্টা প্ল্যানের যথাযথ বাস্তবায়ন এবং হাওরের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে টেকসই
বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। কোনোভাবেই যেন অপরিকল্পিত ডুবো সড়ক বা বাঁধের কারণে পানির স্বাভাবিক
প্রবাহ বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে এগিয়ে
আসতে হবে স্বল্পমেয়াদি ও জীবনকাল কম এমন জাতের ধান নিয়ে। ধান পাকার সময় যদি ১০-১৫ দিন
এগিয়ে আনা যায়, তবে আগাম বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষা করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া হার্ভেস্টর
মেশিনের সরবরাহ বাড়িয়ে দ্রুত ফসল কাটার ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষকদের সমবায় ভিত্তিতে
‘শস্য বীমা’র আওতায় আনতে হবে।
হাওরাঞ্চলে ড্রেজিং বা নদী খনন কার্যক্রম
জোরালো করতে হবে। দীর্ঘদিনের পলি জমে নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে, ফলে পানি ধারণক্ষমতা
কমে গেছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে বছরব্যাপী ড্রেজিং কার্যক্রম চালু রাখতে হবে, যাতে
বর্ষার পানি দ্রুত সরে যেতে পারে। হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে সচেতন
করতে হবে। মাছের অভয়াশ্রম রক্ষা এবং প্রাকৃতিকভাবে পানি শোষণের জন্য হিজল-করচ বাগান
পুনরায় গড়ে তুলতে হবে। বন বিভাগকে এ বিষয়ে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে, যা একদিকে
পরিবেশ রক্ষা করবে এবং অন্যদিকে ঢেউয়ের ঝাপটা থেকে বাঁধকে রক্ষা করবে।
ড. মো.
আনোয়ার হোসেন
প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল