ইমেইল থেকে
সংগ্রাম দত্ত
প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬ ১৩:৪১ পিএম
আপডেট : ১৬ মে ২০২৬ ১৫:৪৫ পিএম
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে অবস্থিত জলাধার। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সিলেট বিভাগের গভীর সবুজ পাহাড়ে বিস্তৃত সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। ২০০৫ সালের ১০ অক্টোবর সরকারিভাবে এটিকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। প্রায় ২৪৩ হেক্টর (প্রায় ৬০০ একর) এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বনভূমি মূলত রঘুনন্দন হিল রিজার্ভ ফরেস্টের অংশ।
রাজধানী ঢাকা থেকে
প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরত্বে হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার পাইকপাড়া ইউনিয়নে
অবস্থিত এই উদ্যান শুধু প্রকৃতিপ্রেমীদের নয়, বরং বন্যপ্রাণী গবেষক ও ওয়াইল্ডলাইফ
ফটোগ্রাফারদের কাছেও এক গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। উদ্যানের চারপাশে রয়েছে ৯টি চা-বাগানÑ
পশ্চিমে সাতছড়ি চা-বাগান, পূর্বে চাকলাপুঞ্জি চা-বাগান। ভেতরের টিপরা পাড়ায় বসবাস
করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ২৪টি পরিবার, যারা এই বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক
বৈচিত্র্যের অংশ হয়ে আছে।
ভারতীয় উপমহাদেশ ও
ইন্দো-চীন অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই ক্রান্তীয় মিশ্র চিরসবুজ বনাঞ্চলকে
জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য ভান্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে
২০০-রও বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য শাল, আগর, গর্জন,
চাপালিশ, মেহগনি, কৃষ্ণচূড়া, ডুমুর, জাম, বাঁশ ও বেতসহ নানা প্রজাতির গাছ।
ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণির মতো দ্রুতবর্ধনশীল প্রজাতিও এখানে দেখা যায়, যা বনাঞ্চলের
গঠন ও পরিবেশগত ভারসাম্যে প্রভাব ফেলেছে।
প্রাণবৈচিত্র্যের দিক
থেকে সাতছড়ি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানে অন্তত ১৯৭ প্রজাতির জীবজন্তুর উপস্থিতি পাওয়া
যায়। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ এবং
৬ প্রজাতির উভচর প্রাণী। পাখির সংখ্যা প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ প্রজাতির মধ্যে বিস্তৃত
বলে ধারণা করা হয়। এখানকার উল্লেখযোগ্য বন্যপ্রাণীর মধ্যে আছে লজ্জাবতী বানর,
উল্লুক, চশমাপরা হনুমান, মুখপোড়া হনুমান, মেছোবাঘ, চিতা বিড়াল, বন বিড়াল, মায়া
হরিণ, বুনো শূকর, এশীয় কালো ভল্লুকসহ আরও নানা প্রজাতি। পাখিদের মধ্যে দেখা যায়
কাও ধনেশ, লাল বনমোরগ, কাঠঠোকরা, ময়না, শালিক, টিয়া প্রভৃতি।
সম্প্রতি সামাজিক
যোগাযোগ মাধ্যমে ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার এস এস আল আমিন সুমনের একটি পোস্ট ঘিরে
সাতছড়ি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তার দাবি, উদ্যানের অভ্যন্তরে ‘বড় পুকুর’ নামে
পরিচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাধার সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে
মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই জলাধারটি প্রায় এক
দশক আগে বন বিভাগের উদ্যোগে খনন করা হয়েছিল, যাতে শুষ্ক মৌসুমে বন্যপ্রাণীরা পানির
অভাবে না পড়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বন্যপ্রাণী ও ফটোগ্রাফারদের জন্য একটি
গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। স্থানীয় বনকর্মীদের তত্ত্বাবধানে এটি সংরক্ষিত
থাকলেও সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে এর কাঠামো নষ্ট হয়ে গেছে বলে দাবি করা
হচ্ছে। ফটোগ্রাফার ও প্রকৃতি পর্যবেক্ষকদের মতে, এমন ছোট জলাধারগুলো বনের ভেতর
জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে
দীর্ঘ খরা মৌসুমে এটি অনেক প্রাণীর জন্য জীবনরেখা হয়ে ওঠে।
এই ঘটনার পর স্থানীয়
পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে পুনরুদ্ধার উদ্যোগ নিয়ে। কিছু পরিবেশকর্মী ও স্থানীয়
সূত্রের মতে, সমন্বিত উদ্যোগ নিলে জলাধারটি পুনর্গঠন করা সম্ভব। তবে বনভূমির ভেতরে
যেকোনো উন্নয়ন বা পুনর্গঠন কাজের জন্য বন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন
প্রয়োজন।
একই সঙ্গে
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য
অনেক সময় আবেগ-নির্ভর হয়, তবে বাস্তব পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত মূল্যায়নের দাবি রাখে।
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান
শুধু একটি বন নয়Ñ এটি একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র, যেখানে উদ্ভিদ, প্রাণী, মানুষ এবং
প্রাকৃতিক উপাদান একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এর ভেতরের প্রতিটি জলাশয়,
প্রতিটি গাছ এবং প্রতিটি পথ এই ভারসাম্যের অংশ। বর্তমান বিতর্ক একদিকে যেমন একটি
নির্দিষ্ট জলাধারের ক্ষয়ক্ষতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, অন্যদিকে এটি
বৃহত্তরভাবে দেখিয়েছেÑ সংরক্ষিত বনাঞ্চল ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিক মনোযোগ ও সমন্বয়ের
প্রয়োজন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সাতছড়ির সবুজ এখনও জীবন্ত, কিন্তু সেই জীবনের শিরায়
শিরায় প্রবাহিত ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্ব ক্রমশ আরও জরুরি হয়ে উঠছে।
সংগ্রাম দত্ত
ফ্রিল্যান্স লেখক,
সিলেট