ইমেইল থেকে
আমানুর রহমান
প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬ ১৩:১৪ পিএম
আপডেট : ১৬ মে ২০২৬ ১৩:১৯ পিএম
প্রতীকী ছবি
ইতিহাস মূলত একক অস্তিত্ব থেকে সম্মিলিত অস্তিত্বের দিকে ধাবিত হওয়ার এক দীর্ঘ পথপরিক্রমা। আদিম অরণ্যচারী মানুষ যখন প্রথম উপলব্ধি করেছিল যে একা টিকে থাকা সম্ভব নয়, ঠিক তখনই জন্ম হয়েছিল সমাজ, রাষ্ট্র ও নৈতিক আইনের। অর্থাৎ, সমাজ কোনো কৃত্রিম বিন্যাস নয়; বরং মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার এক যৌক্তিক প্রয়োজন। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, সামাজিক দায়বদ্ধতা কেবল নৈতিক কোনো আবেগের বিষয় নয়, বরং এটি সভ্যতার চাকা সচল রাখার এক অপরিহার্য শর্ত। মানুষ পৃথিবীতে একা জন্মগ্রহণ করলেও কখনোই একা বাঁচতে পারে না; তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে যেমন সমাজের বাতাস মিশে থাকে, তেমনি তার ভাগ্যের রেখাও জড়িয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের শ্রম, ত্যাগ ও ভালোবাসার সঙ্গে। তাই সমাজের কোনো ক্ষত যখন আমাদের চোখে পড়ে, সেটি কেবল ‘অন্যের সমস্যা’ হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একটি শিশুর ক্ষুধাকষ্ট থেকে রাষ্ট্রের দুর্নীতিÑ সবই সভ্যতার আয়নায় আমাদের সম্মিলিত দায়িত্বহীনতার প্রতিফলন।
আজকের এই উন্নত প্রযুক্তির যুগে আমরা চাঁদে পৌঁছেছি,
গগনচুম্বী অট্টালিকা তৈরি করেছি; কিন্তু মানুষের হৃদয়ে সহমর্মিতার বোধটি ক্রমেই
ফিকে হয়ে আসছে। সভ্যতার প্রকৃত মাপকাঠি দালানকোঠার উচ্চতা নয়, বরং মানুষের বিবেকের
গভীরতা। আধুনিক মানুষ অধিকারের ভাষা খুব জোরালোভাবে রপ্ত করলেও দায়িত্বের ভাষা
ক্রমশ ভুলে যাচ্ছে। আমরা সবাই নিরাপদ সমাজ ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র চাই, অথচ নিজের
সুবিধার জন্য করা ছোট ছোট অসততাকে স্বাভাবিক মনে করি। একটি সমাজ কেবল আইন দিয়ে
সুন্দর হয় না; সমাজ সুন্দর হয় নাগরিকের ব্যক্তিগত নৈতিকতার শক্তিতে। যখন একজন
শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে শিশুর মন গড়ে তোলেন, একজন সাংবাদিক সত্য প্রকাশের সাহস দেখান
কিংবা একজন সাধারণ মানুষ অন্যের বিপদে এগিয়ে আসেন তখনই সভ্যতা প্রকৃত অর্থে আলোকিত
হয়। ইতিহাসের প্রতিটি মহান পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল কোনো এক ব্যক্তির বিবেক জাগ্রত
হওয়ার মধ্য দিয়ে। মনে রাখতে হবে, প্রদীপের শিখা হয়তো সব অন্ধকার দূর করতে পারে না,
কিন্তু সে অন্ধকারের কাছে আত্মসমর্পণও করে না।
সামাজিক সমস্যার কোনোটিই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দুর্নীতি,
দারিদ্র্য বা নৈতিক অবক্ষয়Ñ সবকিছুই পরস্পর সংযুক্ত। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, প্রতিটি
সামাজিক সংকটের একটি ‘রিপল ইফেক্ট’ বা তরঙ্গপ্রভাব থাকে। দারিদ্র্য কেবল অর্থের
অভাব নয়; এটি অপরাধ ও সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেয়। আবার দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক
ক্ষতি করে না; এটি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে দেয়। জার্মান দার্শনিক
হান্না আরেন্টের ‘ব্যানালিটি অব ইভিল’ ধারণার মতে, ভয়াবহ অন্যায়গুলো অনেক সময়
সাধারণ মানুষের নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা মানে পরোক্ষভাবে অন্যায়ের পক্ষেই
দাঁড়ানো। তাই সামাজিক দায়বদ্ধতা মানে শুধু ভালো কাজ করা নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে
নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করাও। আমরা যদি নিজেদের স্বার্থের দেয়াল তুলে বিচ্ছিন্ন থাকতে
চাই, তবে মনে রাখতে হবে যে সমাজের পতন ঘটলে সেই দেয়াল আমাদের কাউকেই দীর্ঘ মেয়াদে
সুরক্ষা দিতে পারবে না।
বর্তমান ভোগবাদী সভ্যতা মানুষকে কেবল ‘ভোক্তা’ হিসেবে গড়ে
তুলছে, কিন্তু আমরা ভুলে যাচ্ছি যে আমরা প্রত্যেকেই একেকজন নৈতিক সত্তা। প্রতিটি
নাগরিকের নিরাপত্তা অন্যের দায়িত্বশীল আচরণের ওপর নির্ভরশীল। একজন কৃষকের উৎপাদিত
খাদ্য, একজন শ্রমিকের নির্মাণশ্রম আর একজন চিকিৎসকের সেবা মিলেই গড়ে ওঠে সভ্য
জীবন। ব্যক্তি কখনোই একক কোনো সত্তা নয়; সে মূলত সমাজের সম্মিলিত অবদানের ফল। তাই
সমাজের প্রতি দায়িত্ব অস্বীকার করা মানে নিজের অস্তিত্বের ভিত্তিকেই অস্বীকার করা।
সামাজিক সমস্যার সমাধান কোনো অলৌকিক শক্তির হাতে নেই; এটি
আমাদের বিবেকের জাগরণ ও সম্মিলিত মানবিক চেতনার ফল। সমাজকে সুন্দর করার দায়ভার
কেবল রাষ্ট্রের বা কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি প্রতিটি মানুষের কাঁধে
ন্যস্ত এক অবিচ্ছেদ্য নৈতিক আমানত। সভ্যতা শেষ পর্যন্ত অস্ত্রের শক্তিতে নয়, বরং
মানুষের দায়বদ্ধতার শক্তিতেই টিকে থাকে। আইন দিয়ে সমাজকে শাসন করা যায়, কিন্তু
বিবেক দিয়ে তাকে সুন্দর করতে হয়। আমরা যখন কেবল নিজের জন্য নয়, বরং অন্যের জন্য
বাঁচতে শিখব, তখনই মানুষ হিসেবে আমাদের প্রকৃত উচ্চতা নিশ্চিত হবে এবং একটি টেকসই
ও মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
আমানুর রহমান
চাষাড়া, নারায়ণগঞ্জ।