ইমেইল থেকে
ওরাইনা খাঁন চৌধুরী
প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬ ১৩:০২ পিএম
আপডেট : ১৬ মে ২০২৬ ১৩:২৭ পিএম
প্রতীকী ছবি
‘বিশ্বে যা কিছু সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’- জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই অমর পঙ্ক্তি যুগে যুগে নারী-পুরুষের সমান অবদানের এক অনন্য স্বীকৃতি হয়ে আছে। পৃথিবীর প্রতিটি সুন্দর, কল্যাণকর ও মানবিক সৃষ্টির পেছনে যেমন পুরুষের শ্রম রয়েছে, তেমনি রয়েছে নারীর নিঃস্বার্থ অবদান। নারী শুধু একজন মানুষ নন; তিনি কখনও মা, কখনও বোন, কখনও বন্ধু, কখনও সহধর্মিণী। জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি ভালোবাসা, মমতা ও ত্যাগের মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করে চলেছেন। প্রকৃতি ও নারীর মাঝে এক গভীর রহস্যময় সৌন্দর্যের মিল খুঁজে পান কবি-সাহিত্যিকরা। হালকা বাতাসে উড়ে যাওয়া শাড়ির আঁচল, কাচের চুড়ির টুংটাং শব্দ কিংবা মায়াময় হাসিÑ এসবই কবিতার ভাষায় নারীর সৌন্দর্যকে নতুন মাত্রা দেয়। যুগে যুগে সাহিত্যিকরা নারীর সৌন্দর্য, মমতা ও ভালোবাসাকে নানা রূপে তুলে ধরেছেন। কারণ নারী শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রতীক নন, তিনি অনুভূতির গভীরতা ও আত্মত্যাগেরও প্রতিচ্ছবি।
একজন নারীর জীবন জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অসংখ্য দায়িত্ব ও
সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। ছোটবেলায় বাবার আদরের মেয়ে, কৈশোরে পরিবারের
দায়িত্বশীল সদস্য, আর বিয়ের পর পুরো সংসারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন তিনি।
মা-বাবা, ভাইবোন, স্বামী-সন্তানÑ সবাইকে আগলে রাখতেই যেন তার জীবন কেটে যায়। অনেক
নারী উচ্চশিক্ষিত হয়েও সন্তানের ভবিষ্যৎ কিংবা পরিবারের সুখের কথা ভেবে নিজের
ক্যারিয়ার বিসর্জন দেন। অথচ সেই নারীকেই একসময় শুনতে হয়Ñ ‘তুমি তো সারাদিন ঘরেই
থাকো!’ বাস্তবতা হলোÑ নারীর অদৃশ্য শ্রমের মূল্য সমাজ এখনও পুরোপুরি উপলব্ধি করতে
পারেনি। সংসারের প্রতিটি কাজ, পরিবারের সুখ-দুঃখ, সন্তান লালন-পালন সবকিছুই একজন
নারী নীরবে সামলে যান। কখনও নিজের ইচ্ছা, স্বপ্ন কিংবা আনন্দ বিসর্জন দিয়ে অন্যদের
জীবন সুন্দর করে তোলেন। মোমবাতির মতো তিনি নিজে পুড়ে চারপাশ আলোকিত করেন। অথচ
জীবনের শেষ প্রান্তে অনেক নারীই অবহেলা ও একাকিত্বের শিকার হন। এটি কেবল একজন
নারীর নয়, আমাদের সমাজেরও নির্মম বাস্তবতা। নারীর হৃদয় অত্যন্ত কোমল ও গভীর
অনুভূতিপূর্ণ।
সাহিত্যিক অস্কার ওয়াইলড বলেছিলেন, ‘নারীরা ভালোবাসার জন্য,
জানার জন্য নয়।’ যদিও এই উক্তি বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়, তবু এটি নারীর আবেগময়
ভালোবাসার দিকটি তুলে ধরে। আবার টাইটানিক চলচ্চিত্রের বিখ্যাত সংলাপ- ‘A woman’s
heart is a deep ocean of secrets’-নারীর অনুভূতির গভীরতাকে প্রকাশ করে। একজন নারী
মন-প্রাণ দিয়ে কাউকে ভালোবাসলে সেই মানুষটিই হয়ে ওঠে তার পৃথিবী। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ
থেকেও নারীর মর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাচীনকালে নারীরা ছিলেন নানা বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার।
সমাজের ক্ষমতাবানদের ভোগ-বিলাসের বস্তু হিসেবে ব্যবহার করা হতো তাদের। কোথাও
কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো, কোথাও আবার বিধবা নারীকে স্বামীর চিতায় পুড়ে
মরতে বাধ্য করা হতো। কিন্তু সময় বদলেছে। আজকের নারী পৃথিবীর প্রতিটি ক্ষেত্রে
নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। বিজ্ঞান, চিকিৎসা, সাংবাদিকতা, আইন, প্রশাসন, সামরিক
বাহিনী কিংবা রাজনীতিÑ সবখানেই নারীরা সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন। বাংলাদেশেও নারীর
অগ্রযাত্রা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া নারী পাইলট, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, আইনজীবী,
পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা উদ্যোক্তা হিসেবে দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
রাখছেন। ঘরে বসে অনলাইন ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমেও বহু নারী
আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠছেন। তবে নারীর অগ্রগতির পাশাপাশি সমাজে কিছু নেতিবাচক
দৃষ্টিভঙ্গিও বিদ্যমান। কিছু মানুষ নারীদের সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করেন
কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ব্যর্থতার দায় নারীর ওপর চাপিয়ে দেন।
পরিবার থেকেই ছেলে-মেয়েদের সমান মর্যাদা ও মানবিক মূল্যবোধ
শেখাতে হবে। কন্যাশিশুকে নিরাপদ ও আত্মবিশ্বাসী পরিবেশে বড় করে তুলতে হবে। নারীকে
অবমূল্যায়ন করে কোনো জাতি কখনও উন্নতির শিখরে পৌঁছতে পারে না। কারণ নারী শুধু একজন
ব্যক্তি নন, তিনি একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি সভ্যতার ভিত্তি। তাই নারীর
প্রতি সম্মান, নিরাপত্তা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। বিশ্বকবি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন, ‘নারীরা দাসী বটে, সেই সঙ্গে নারী রানীও বটে।’
নারী যেন কেবল ত্যাগের প্রতীক হয়ে না থাকেন, বরং নিজের স্বপ্ন, অধিকার ও মর্যাদা
নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারেনÑ সেই সমাজ গড়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
ওরাইনা খাঁন চৌধুরী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়