ফাইল ছবি
ফারাক্কা লংমার্চ বাংলাদেশের প্রতিবেশী ও বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, কর্ণফুলী, সুরমা, তিস্তা, বরাকসহ অসংখ্য নদ-নদী বাংলাদেশকে জালের মতো ছেয়ে রেখেছে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ৫৮টি আন্তর্জাতিক নদীর ৫৫টির উৎপত্তি হিমালয়সহ ভারতের অন্যান্য উৎস থেকে। বাংলাদেশের মিঠাপানির মাত্র ৭ ভাগ পাওয়া যায় এখানকার বৃষ্টির পানি থেকে আর ৯৩ ভাগ আসে সীমান্তের ওপার থেকে বৃষ্টি ও বরফ গলানোর ফলে।
পানি শূন্য আজ পদ্মা। একসময়ের প্রমত্ত পদ্মা আজ ধু-ধু মরুভূমি। এর কারণই হচ্ছে ফারাক্কা। হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে উৎপন্ন গঙ্গা। বাংলাদেশের রাজশাহী সীমান্তে এসে পদ্মা নাম ধারণ করে দেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ভারত গঙ্গার পানি উত্তর প্রদেশ এবং বিহার প্রদেশে সেচ কাজের জন্য ক্রমবর্ধমান হারে প্রত্যাহার করায় পশ্চিমবঙ্গে ভাগীরথী-হুগলি নদীর পানি প্রবাহ কমে আসে। সেজন্য ভারত পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা বন্দরের নাব্য বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশের সীমানার ১০ কিলোমিটার উজানে মুর্শিদাবাদ জেলার ফারাক্কা নামক স্থানে বাঁধ দিয়েছে।
এই বাঁধের প্রথম পরিকল্পনা করা হয়েছিল ১৯৫১ সালে। সে বছরই বাঁধ নির্মাণ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ভারত সরকারের কাছে কঠোর ও তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। ১০ বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে দেনদরবারের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১৯৬১ সালের পর জানা যায় ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই ১৯৭৪ সালের মধ্যে ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ সমাপ্ত করে।
১৯৭৪ সালের মে মাসে নতুন দিল্লিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে দ্বীপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকেই সর্বপ্রথম বলা হয়, কলকাতা বন্দরের চাহিদা ও বাংলাদেশের চাহিদা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত পানি গঙ্গায় না থাকায় চাহিদা মেটানোর জন্য পানির প্রবাহ বাড়াতে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করছে ভারত। ১৯৭৫ সালের গোড়ার দিকে ফারাক্কা ফিডার ক্যানেলটির কার্যকারিতা যাচাই করার জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কার বাঁধ চালু করার জন্য ভারত বাংলাদেশকে প্রস্তাব দেয়। পরীক্ষামূলক সময়টি হবে ১৯৭৫-এর ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে এই ৪১ দিন। বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করে। তারপর আর সেই ৪১ দিন শেষ হয়নি। শুরু হয় বাংলাদেশের দুর্দশা। পানির অভাবে ধীরে ধীরে প্রমত্তা পদ্মা হয়ে ওঠে ধু-ধু বালুচর। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কোটি কোটি মানুষ। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ক্রমান্বয়ে মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। বাঁধ চালুর আগে বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানির প্রবাহ থাকত প্রায় ৭৪ হাজার কিউসেক। বাঁধের পর পদ্মার গড়ে বছরে প্রায় ৩০-৩৫ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহ হতো।
দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের কিছুসংখ্যক বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ ফারাক্কার ভয়াবহতা সম্পর্কে উপলব্ধি করতে না পেরেই ফারাক্কার পক্ষে ওকালতিতে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছিল। সেদিন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন। আর সে কারণেই ফারাক্কা বাঁধের ভয়াবহতা সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে অবহিত করতে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে তার নেতৃত্বে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ফারাক্কা লংমার্চ শেষে কানুপুর ঘাটের জনসভায় ভাসানী বলেন, ‘আজ আমরা এসেছি পদ্মার তীরে, দেশের প্রাণ এ নদীর জন্য। ভারত আমাদের পানি কেড়ে নিচ্ছে, আমাদের কৃষককে মেরে ফেলছে, আমাদের জমিকে শুকিয়ে মরুভূমি বানাচ্ছে।’ সেই কণ্ঠ, সেই ভাষণ, সেই মার্চ এগুলো শুধুই প্রতিবাদের ছিল না, ছিল আত্মমর্যাদার এক মহামিছিল। ছিল জন্মভূমির প্রতি অঙ্গীকার, ছিল রাষ্ট্রীয় অধিকার রক্ষার এক অগ্নিশপথ। ভাসানীর নেতৃত্বে এই লংমার্চ ছিল জল ও জীবন রক্ষার জন্য এক পবিত্র সংগ্রাম। তার মুখে যখন উচ্চারিত হয়, ‘আমরা ভিক্ষা চাই না, অধিকার চাই’, তখন তা হয়ে ওঠে এক স্বাধীন জাতির আভিজাত্য ও সাহসের প্রতীক।
ফারাক্কা, টিপাইমুখসহ ভারতের অব্যাহত পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার কোনো বিকল্প আছে কি? ভারত মূলত দুটি উদ্দেশ্যে পানি আগ্রাসন অব্যাহত রেখেছে। এর একটি হচ্ছে রাজনৈতিক কারণে পানিকে ব্যবহার করা আর রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যর্থ ও পঙ্গু রাষ্ট্রে পরিণত করা। ভারতের পানি আগ্রাসন রুখতে হলে, পানি অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হলে দেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, সকল রাজনীতিবিদদেরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশের জনগণের ঐক্যকে শক্তিতে পরিণত করতে হবে। আজকের তরুণ প্রজন্মের জন্য ফারাক্কা লংমার্চ কেবল একটি আন্দোলনের নাম নয়, এটি হলো এক জীবন্ত ইতিহাস, এক অদম্য চেতনা, যা শেখায় কীভাবে একজন মানুষ পুরো জাতিকে পথে নামাতে পারে।
ভারতের নিকট থেকে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় কোনো দলীয় সমস্যা নয়। এই সমস্যা দেশের এবং সমগ্র জাতির। কারণ এই অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। ভারতের অব্যাহত পানি আগ্রাসনের বিষয়ে বিশ্ববাসীকে অবহিত করার জন্য পানি আন্দোলনকে আরও বেগবান ও ফলপ্রসূ করতে হবে। এজন্য দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত প্রত্যেকটি বাংলাদেশির এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে হবে এবং দাবি করতে হবে নদী বাঁচাও, দেশ বাঁচাও, বাংলাদেশ বাঁচাও। ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবসে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে।
এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া
কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক