× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সর্বজনীন পেনশন স্কিম : উন্নয়ন ও বার্ধক্যের সুরক্ষা

ড. মো. সুরাতুজ্জামান

প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৬ ১০:৪৯ এএম

আপডেট : ১৫ মে ২০২৬ ১০:৪৯ এএম

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বাংলাদেশের গণমানুষের স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম ছিল সুদীর্ঘ। একটি দারিদ্র্যমুক্ত, বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের বৃদ্ধ বয়সে সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিম’ প্রবর্তন করা হয়েছে। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা যখন এই স্কিমের সফল বাস্তবায়নের কথা বলছি, তখন এটি স্পষ্ট যে, এটি কেবল একটি সঞ্চয় প্রকল্প নয়, বরং এটি একটি কল্যাণমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের দৃঢ় অঙ্গীকার।

কেন সর্বজনীন পেনশন

বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে বাংলাদেশের জনমিতিক কাঠামোতে এক বড় পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ও সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে আমাদের গড় আয়ু এখন ৭৩ বছরের ওপরে। আয়ু বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে আনন্দের সংবাদ, কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বার্ধক্যজনিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকির প্রশ্ন। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশে যৌথ পরিবার প্রথা বৃদ্ধদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করত। কিন্তু নগরায়ণ ও বিশ্বায়নের প্রভাবে বর্তমানে একক পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে শেষ বয়সে অনেককেই পরিবার ও সমাজের কাছে বোঝা হিসেবে গণ্য হতে দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। যাদের কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মকালীন সুবিধা বা গ্র্যাচুইটি নেই। এই বিশাল জনবলকে একটি কাঠামোগত সুরক্ষায় নিয়ে আসা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব ছিল। চলমান সর্বজনীন পেনশন স্কিম সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে বলে সরকার আশা করছে।

বিশ্বব্যাপী পেনশন ব্যবস্থার চিত্র ও বাংলাদেশ

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে যেমন নরওয়ে, সুইডেন বা নেদারল্যান্ডসে শক্তিশালী পেনশন ব্যবস্থা বিদ্যমান। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও ‘অটল পেনশন যোজনা’ বেশ কার্যকর। বাংলাদেশ এই স্কিম প্রণয়নের আগে বিশ্বের সেরা মডেলগুলো বিশ্লেষণ করেছে। আমাদের স্কিমটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন তা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। এটি একদিকে রাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ কমাবে, অন্যদিকে জনগণের সঞ্চয়কে জাতীয় বিনিয়োগে রূপান্তরিত করবে।

চার স্কিমের বিস্তারিত বিশ্লেষণ 

বর্তমানে কার্যকর চারটি স্কিম দেশের ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক স্তরের মানুষকে সুরক্ষা দিচ্ছে :

১. প্রগতি স্কিম : বেসরকারি খাতের শক্তিবৃদ্ধি : বাংলাদেশের জিডিপিতে বেসরকারি খাতের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে সঞ্চয়ের অভাব এবং অবসরের পর আয়ের উৎস না থাকায় মেধাবী তরুণরা সরকারি চাকরির পেছনে ছুটছেন। প্রগতি স্কিম চালুর পর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক স্থিতি এসেছে। প্রতিষ্ঠানের মালিক ও শ্রমিক উভয়ের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই স্কিমটি বেসরকারি খাতের পেশাদারত্ব বৃদ্ধি করছে।

২. সুরক্ষা স্কিম : অসংগঠিত খাতের স্বীকৃতি : কৃষক, জেলে, তাঁতি, রিকশাচালক থেকে শুরু করে হালের ফ্রিল্যান্সার, যাদের আয়ের কোনো ধরাবাঁধা সীমা বা মাস শেষে বেতনের নিশ্চয়তা নেই, সুরক্ষা স্কিম তাদের জন্য এক আশীর্বাদ। ২০২৬ সালে আমাদের তথ্য-উপাত্ত বলছে, স্বনির্ভর পেশাজীবীদের জন্য এই সুরক্ষা স্কিমের সদস্য হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটি তাদের আয়ের একটি অংশকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে রূপান্তর করবে।

৩. প্রবাসী স্কিম : রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অধিকার : আমাদের প্রবাসীরা বিদেশের মাটিতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে নিঃসন্দেহে দেশের রিজার্ভ শক্তিশালী করছেন। কিন্তু বিদেশে কাজ শেষে দেশে ফিরে তাদের অনেক সময় শূন্য হাতে ফিরতে হয়। প্রবাসী স্কিমটি তাদের জন্য এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন তারা বৈদেশিক মুদ্রায় চাঁদা জমা দিয়ে দেশে ফেরার পর একটি সচ্ছল ও মর্যাদাপূর্ণ অবসর জীবন যাপন করতে পারেন।

৪. সমতা স্কিম : সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিফলন : সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অতি দরিদ্র মানুষ, যাদের সঞ্চয় করার ক্ষমতা নগণ্য, তাদের জন্য ‘সমতা’ স্কিম সরকার ও নাগরিকের যৌথ প্রয়াস। এখানে চাঁদাদাতার ১০০০ টাকার চাঁদার মধ্যে ৫০০ টাকা স্বয়ং সরকার প্রদান করছে। এটি কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, এটি দারিদ্র্যবিমোচনের একটি টেকসই মডেল।

ইসলামিক পেনশন স্কিম

বাংলাদেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী মুসলিম ধর্মাবলম্বী হওয়ায় পেনশন স্কিমে সুদমুক্ত ইসলামিক বিনিয়োগ পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী সুদ বা রিবা হারাম হওয়ায় অনেক ধর্মপ্রাণ নাগরিক প্রচলিত পেনশন স্কিমে অংশগ্রহণে দ্বিধান্বিত ছিলেন। এই বাস্তবতা অনুধাবন করে সরকার প্রতিটি স্কিমের পাশাপাশি একটি করে ইসলামিক ভার্সন চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রতিটি স্কিমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ইসলামিক স্কিমগুলোর নাম ইসলামিক প্রবাস, ইসলামিক প্রগতি, ইসলামিক সুরক্ষা ও ইসলামিক সমতা নামকরণ হতে পারে, যা নিয়ে এখন কাজ চলমান রয়েছে। এজন্য ‍এ সংক্রান্ত আইন ও বিধিবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে। এই ইসলামিক স্কিমগুলো পরিচালনার জন্য একটি স্বাধীন শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড গঠন করা হবে, যেখানে দেশের বিশিষ্ট ইসলামী অর্থনীতিবিদ ও আলেমগণ অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। তাদের তত্ত্বাবধানে স্কিমের বিনিয়োগ পোর্টফোলিও সর্বদা শরিয়াহ নীতিমালার আলোকে পরিচালিত হবে। এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের ইসলামী আর্থিক খাতকে আরও শক্তিশালী করবে এবং কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলিম নাগরিককে পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনার পথ সুগম করবে। এই উদ্যোগ দেশের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলিম নাগরিকের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করবে এবং পেনশন স্কিমে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

২০২৬ সালের সর্বশেষ পরিসংখ্যান

বর্তমান বছরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বজনীন পেনশন স্কিমে নিবন্ধিত মোট গ্রাহক সংখ্যা 377524 জন। জমাকৃত তহবিলের পরিমাণ বর্তমানে 254 কোটি টাকার ওপরে। এই বিশাল পরিমাণ মূলধন ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এতে গ্রাহকের অর্থের নিশ্চয়তা বিধান হচ্ছে। 

পেনশন ক্যালকুলেশন (১৮ বছর বয়সীদের জন্য সম্ভাব্য) : ২০২৬ সালের সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী, একজন গ্রাহক ৪২ বছর মেয়াদে সর্বনিম্ন চাঁদা দিয়েও যে রিটার্ন পাবেন, তা অন্য যেকোনো স্কিমের চেয়ে অনেক বেশি এবং নিরাপদ।

ডিজিটাল আর্কিটেকচার ও নিরাপত্তা : পুরো পেনশন ব্যবস্থাটি একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ‘স্মার্ট পেনশন প্লাটফর্ম’-এর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। সর্বশেষ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উন্নত সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় এখানে ডেটা ম্যানিপুলেশন বা জালিয়াতির কোনো সুযোগ নেই। নাগরিকরা তাদের মোবাইল ফোন থেকেই প্রতি মাসের জমার স্থিতি এবং সম্ভাব্য পেনশনের পরিমাণ দেখতে পাচ্ছেন।

চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা : যেকোনো বড় উদ্যোগের শুরুতে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকে। আমরা বর্তমানে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করছি : 

১. সচেতনতা বৃদ্ধি : গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে এই স্কিমের সুফল পৌঁছে দিতে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, তফসিলি ব্যাংক ও পোস্ট অফিসগুলোকে আরও সক্রিয় করা হচ্ছে। 

২. বিনিয়োগ বহুমুখীকরণ : পেনশন তহবিলের টাকা যেন সর্বোচ্চ নিরাপদ এবং লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করা যায়, সেজন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তহবিল ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। 

৩. সেবার মানোন্নয়ন : বীমা খাতের মতো কোনো হয়রানি যেন না হয়, তা নিশ্চিত করতে আমরা সরাসরি ব্যাংক টু স্কিম (B2S) ট্রানজেকশন জনপ্রিয় করছি।

আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে পেনশন হোল্ডারদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য কার্ড বা হেলথ ইনস্যুরেন্স সুবিধা যোগ করা, যেন বার্ধক্যে তারা কেবল টাকা নয়, উন্নত চিকিৎসাও পেতে পারেন।

একটি সুখী ও সমৃদ্ধ জাতির স্বপ্ন

পেনশন কোনো দয়া বা দান নয়, বরং সর্বজনীন পেনশন কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। কর্মক্ষম জীবনে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পর, বার্ধক্যে রাষ্ট্র তাকে আর্থিক সুরক্ষা দিয়ে আগলে রাখবে এটাই আধুনিক সভ্যতার পরিচয়। সর্বজনীন পেনশন স্কিম আজ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে একটি আস্থার নাম। আমরা চাই ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্য এই স্কিমের আওতায় আসুক। নিশ্চিন্ত বার্ধক্য, স্বনির্ভর জীবন এবং উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে আসুন আমরা সবাই এই জাতীয় মহাযজ্ঞে শামিল হই। আজকের আপনার ছোট একটি সঞ্চয়ের সিদ্ধান্ত আগামী দিনের স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের গ্যারান্টি দিতে পারে।


ড. মো. সুরাতুজ্জামান
নির্বাহী চেয়ারম্যান, জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা