সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার নিরঞ্জন রায়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আমরা তখন গ্রামের স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। একদিন আমাদের প্রধান শিক্ষক জনতা ব্যাংকের স্থানীয় শাখার ব্যবস্থাপকসহ কয়েকজন ব্যাংকারকে নিয়ে ক্লাসে এসে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন যে, ‘ব্যাংকের কর্মকর্তারা তোমাদের কিছু উপদেশ দেবেন’। আমরা আগ্রহভরে সেই ব্যাংক ম্যানেজারের কথা শুনলাম। এখানে বলে রাখা ভালো, আমরা যখন স্কুলে পড়ি তখন এখনকার মতো এত বেশি ব্যাংক ছিল না। হাতেগোনা কয়েকটি সরকারি ব্যাংক ছিল এবং গ্রামে কোনো ব্যাংকের শাখা ছিল না বললেই চলে। আমি অন্তত কোনো গ্রামে ব্যাংকের শাখা দেখিনি। আমাদের গ্রাম যেহেতু তাঁতের শাড়ির জন্য প্রসিদ্ধ এবং তাঁত ব্যবসায়ীরা যেহেতু সচ্ছল, তাই আমাদের গ্রামে জনতা ব্যাংকের একটি শাখা ছিল। সেই ব্যাংক কর্মকর্তারা আমাদের উদ্দেশে যা বলেছিলেন, তার কোনোকিছুই ভালোভাবে বুঝতে পারিনি এবং সেই বয়সে বোঝার কথাও নয়। তবে এতটুকু বুঝেছিলাম যে, ব্যাংকের সেই কর্মকর্তারা আমাদের প্রত্যেককে ব্যাংকে একটি হিসাব খোলার জন্য উৎসাহিত করছিলেন। সেই ব্যাংক ম্যানেজারের একটি কথা আমার আজও স্পষ্ট মনে আছে তা হচ্ছে ‘তোমরা যদি তোমাদের টিফিন, সালামি বা বকশিশ বাবদ যে টাকা পাও, তা জমা রখার জন্য একটি ব্যাংক হিসাব খোল, তাতেও অনেক লাভ আছে’। এই গুরুত্বপূর্ণ কথা শোনার পরও আমি স্কুলজীবনে সেই ব্যাংকে হিসাব খোলার কথা চিন্তা করিনি। এমনকি আমার যে সচ্ছল বন্ধুবান্ধবী ছিল, তাদের কেউ ব্যাংক হিসাব খুলেছিল এমন কথা শুনিনি।
পরবর্তীতে কলেজে ভর্তি হয়ে প্রথমেই ব্যাংকে হিসাব খুলেছিলাম এবং সেখান থেকেই ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে জীবনযাত্রার সবকিছু পরিচালনা করে আসছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে ব্যাংক হিসাবের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে, ছাত্রজীবন থেকে ভালো উপার্জন করলেও নিজের উপার্জনের দশ হাজার টাকার বেশি একসাথে দেখেছি এমন দাবি করতে পারব না। আর উন্নত বিশ্বে আসার পর তো কখনোই নিজের উপার্জিত এক হাজার ডলার একসাথে দেখিনি। আর দেখার প্রয়োজনও পড়ে না, কেননা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমেই সব লেনদেন সম্পন্ন হয়ে যায়। এ থেকে বোঝা যায় যে, বর্তমান আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় একজন মানুষের ব্যাংক হিসাব থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয়। আমাদের ক্লাসে এসে একজন ব্যাংক ম্যানেজারের দেওয়া বক্তব্য পুরোটা না বুঝলেও দুয়েকটি মূল্যবান কথা ঠিকই বুঝেছিলাম। কিন্তু যেটা বুঝিনি তা হচ্ছে সেসময় ব্যাংক কর্মকর্তাদের এভাবে স্কুলে সশরীরে এসে ছাত্রছাত্রীদের ব্যাংকে হিসাব খোলার ব্যাপারে উৎসাহিত করার আসল উদ্দেশ্য কি ছিল।
আমাদের স্কুলজীবনে বেসরকারি ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছিল না। আর সরকারি ব্যবস্থাপনায় যে সীমিত ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা হতো, সেখানে আজকের দিনের মতো ব্যাংকারদের সঞ্চয় বা ডিপোজিট সংগ্রহের জন্য কোনোরকম চাপ বা টার্গেট থাকত না। আর থাকলেও তাদের আমাদের মতো স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের কাছে আসার কথা নয়। কেননা আমাদের অঞ্চলে সচ্ছল ব্যবসায়ীর অভাব ছিল না। তাদের কাছে গেলে যে পরিমাণ ডিপোজিট পাওয়া যেত, সেটাই তো যথেষ্ট ছিল। আমাদের পাশের গ্রাম হচ্ছে এনায়েতপুর, যেখানে সবচেয়ে বেশি ধনাঢ্য লোকের বসবাস। সেই গ্রামের অধিকাংশ মানুষের কাছে যে পরিমাণ নগদ অর্থ জমা থাকত, তা উপহাসের ছলে বোঝানোর জন্য বলা হতো যে এনায়েতপুর গ্রামের মানুষের বিছানার নিচে যে পরিমাণ নগদ অর্থ লুকানো থাকে, তা যদি কাঁচা টাকা (ধাতব মুদ্রা বা কয়েন) হতো, তাহলে এনায়েতপুর গ্রামটি টাকার নিচে তলিয়ে যেত। এই যেখানে অবস্থা, সেখানে ব্যাংক কর্মকর্তারা কেন স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের কাছে ব্যাংক হিসাব খোলার আবেদন নিয়ে এসেছিল, তা আমার কাছে আজও এক কৌতূহলের বিষয় হয়েই রয়ে গেছে।
যাহোক, আজ থেকে প্রায় চার দশক আগে স্কুলজীবনের এই ঘটনাটি মনে পড়ে যখন অনেকেই এখন বলেন এবং বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে বর্তমান ডিজিটাল যুগে ব্যাংক হিসাবের কোনো প্রয়োজন নেই। আর আলোচনা এবং বিশ্বাসের কারণেই বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের এখনও ব্যাংক হিসাব নেই। এই বিষয়টি কিছুদিন আগে একটি পত্রিকার প্রতিবেদনেও প্রকাশিত হয়েছে যেখানে বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ফিনডেক্স-২০২৫-এর বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে বাংলাদেশের ৫৩% প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। অবশ্য আমার ধারণা আমাদের দেশে এই সংখ্যা অনেক বেশি হবে। কেননা আমি যখন গ্রামের ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলি, তখন প্রতি দশজনকে ব্যাংক হিসাবের ব্যাপারে জিজ্ঞাস করলে তাদের আটজনই না-বোধক উত্তর দেয়। আবার মফস্বল শহরে মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, সেখানকার প্রতি দশজন সাধারণ মানুষের মধ্যে সাতজনেরই কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। সেই হিসাবে আমার ধারণা যে বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭০ শতাংশের কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। আর যদি অপ্রাপ্তবয়স্কদেরও বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাখন দেখা যাবে যে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশের কোনো ব্যাংক হিসাব নেই।
অথচ বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়েছিল সেখানে ব্যাংক হিসাব রাখার ব্যাপারে এই দেশ একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারত। বিশেষ করে আমার স্কুলজীবনে তখনকার ব্যাংকাররা যেভাবে ব্যাংকে হিসাব খোলার ব্যাপারে আমাদের উৎসাহিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে ছুটে এসেছিলেন, সেই ধারা যদি অব্যাহত রাখা সম্ভব হতো এবং এই প্রচেষ্টাকে যদি একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যেত, তাহলে অনেক আগেই ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর ব্যাংক হিসাব নিশ্চিত হয়ে যেতে পারত। কিন্তু বাস্তবে সেটা হয়নি। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরে দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রসার ঘটেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, দেশের ব্যাংকিং খাতের এই যে ব্যাপক প্রসার তার প্রকৃত সুবিধা জাতি সেভাবে পায়নি। এমনকি সংখ্যার দিক থেকে ব্যাংকের সংখ্যা যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে সে তুলনায় মাথাপিছু ব্যাংকিং সেবার পরিমাণ একেবারেই বৃদ্ধি পায়নি। প্রায় শতাধিক ব্যাংক এবং দেশব্যাপী শাখা ব্যাংকের নেটওয়ার্ক থাকা সত্ত্বেও আমাদের জনসংখ্যার বিশাল একটি অংশের কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। ব্যাংকিং খাতের প্রসারের সাথে সাথে দেশের অধিকাংশ নাগরিকের ব্যাংক হিসাবের আওতায় আসার কথা থাকলেও আসতে পারেনি বা আনার চেষ্টা হয়নি। এর পিছনে অনেক কারণও আছে, যা এখানে তুলে ধরতে গেলে লেখার স্থান সংকুলান হবে না।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমান ডিজিটাল যুগে এসে ব্যাংক হিসাবের গুরুত্ব না কমে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ আমরা এখন নগদবিহীন লেনদেনের যুগে প্রবেশ করেছি। আর নগদবিহীন লেনদেন ব্যবস্থা নিশিচত করতে হলে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের ব্যাংক হিসাব থাকা অপরিহার্য। এমন একসময় ছিল যখন ব্যাংক হিসাব খোলাই হতো সঞ্চয় করার জন্য। এখন আর সেই দিন নেই। তা ছাড়া সঞ্চয়ের জন্য এফডিআর বা ফিক্সড ডিপোজিট রিসিটের ব্যবস্থা আছে। অনেকেই বলার চেষ্টা করবেন যে এফডিআর তো ব্যাংক হিসাব, কিন্তু আসলে তা নয়। এফডিআর এবং ব্যাংক হিসাবের মধ্যে পার্থক্য আছে। বরং এফডিআর করে অর্থ জমা রাখতে হলে প্রথমেই ব্যাংকে একটি হিসাব খুলতে হয়। যাহোক, এফডিআর এবং ব্যাংক হিসাবের মধ্যকার পার্থক্য আমার আজকের লেখার বিষয় নয়, তাই এ বিষয়ে আলোচনা বাড়িয়ে লেখার প্রসঙ্গ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে চাই না। সুযোগ পেলে অন্য কোনো পরিসরে এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখার চেষ্টা করব।
এখন সঞ্চয় ছাড়াও নানান কারণে একজন মানুষের ব্যাংক হিসাবের প্রয়োজন আছে। যেমন, ব্যাংকের হিসাব অনেক কাজে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ বা দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ব্যাংক হিসাব থাকলে জীবনযাত্রার সবকিছু ব্যাংক হিসেবের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব। ব্যাংক কার্ড একটি স্বীকৃত আইডি বা পরিচয়পত্র হিসেবে গণ্য হয়। অনেক সরকারি লেনদেন, যেমনÑ আয়কর রিটার্ন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাওনা পরিশোধ, বিভিন্ন কর প্রদান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন প্রদানসহ অধিকংশ ব্যক্তিগত লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব। সরকারের কাছ থেকে অর্থ প্রাপ্তি যথাÑ কর ফেরত, পেনশন, বোনাস, স্কলারশিপ এবং বিভিন্ন ভাতা খুব সহজে এবং দ্রুততম সময়ে গ্রহণ করা সম্ভব। ব্যাংক হিসাব থাকার এরকম আরও অনেক সুবিধা এবং উপকারিতা আছে, যা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরার সুযোগ এখানে সীমিত।
আমাদের দেশে ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি। সমগ্র দেশ বলা চলে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আছে এবং জনগণও মোবাইল ব্যাংকিংসহ প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সেবা নিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের সকল নাগরিককে ব্যাংক হিসাবের আওতায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে জোরালো ভূমিকা নিতে হবে। তাদেরকে সঞ্চয় সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি গ্রাহক হিসাব বৃদ্ধির দিকেও নজর দিতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকেও পদক্ষেপ থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে দরিদ্র, হতদরিদ্র, কর্মহীন ও বেকার এবং এমনকি নিম্ন মধ্যবিত্তদের ব্যাংকে হিসাব খোলার পদ্ধতি সহজ এবং বিনামূল্যে করার প্রয়োজন আছে। সেই সাথে সরকারি এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে সকল লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এককথায় ব্যাংক হিসাব থাকলে কোনো ক্ষতি নেই, অথচ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ লাভ আছে অনেক, তাই প্রত্যেক নাগরিকের একটি ব্যাংক হিসাব থাকা প্রয়োজন। আগামী দিনের বাস্তবতা, নগদবিহীন সমাজের জন্য প্রস্তুতি নিতে হলে প্রত্যেক নাগরিকের ব্যাংক হিসাব থাকা অপরিহার্য। কেননা বর্তমান এই ডিজিটাল যুগেও প্রত্যেক নাগরিকের ব্যাংক হিসাব থাকার উপকারিতা হ্রাস পায়নি মোটেও, বরং বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকগুণ এবং ভিন্ন মাত্রায়।
নিরঞ্জন রায়
সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা