বাংলাদেশে আগেও তিনটি ব্যারেজ নির্মাণ করা হয়েছে। ছবি: গেটি ইমেজেস
ভারতের ফারাক্কা বাঁধের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের নদনদীতে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি ও এর ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিষয়টি দীর্ঘকাল থেকেই আলোচিত। ভারত গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করায় দাবি উঠেছিল ফারাক্কা বাঁধের বিপরীতে অনুরূপ একটি ব্যারাজ নির্মাণের। দাবিটি অনেক পুরনো, ১৯৬১ সালের, যখন ভারত পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ শুরু করে, তখনই এর নেতিবাচক প্রভাবের কথা ভেবে বাংলাদেশে (তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান) আরেকটি বাঁধ নির্মাণের যৌক্তিকতা উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা আর এগোয়নি। নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ভারত বাংলাদেশের অনুমতি নিয়ে শর্তসাপেক্ষে ফারাক্কা বাঁধটি চালু করে ১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসে। ভাটির দেশ হিসেবে গঙ্গার পানিতে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রদান করার কথা। কিন্তু বাঁধ চালু করার পর ভারত তা বিস্মৃত হয়ে গঙ্গার পানি একতরফা প্রত্যাহার করতে থাকে। বহু দেনদরবারের পর ১৯৭৭ সালে গ্যারান্টি ক্লজসহ একটি অস্থায়ী চুক্তি হয়। সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে ভারত আবার একতরফা পানি প্রত্যাহার শুরু করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরে ওই বছর ১২ ডিসেম্বর ত্রিশ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ-ভারত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের পানিপ্রাপ্তির গ্যারান্টি ক্লজ না থাকায় তা প্রহসনের দলিলে পরিণত হয়। যার প্রমাণ পাওয়া যায় শুকনো মৌসুমে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার এবং বর্ষা মৌসুমে বাঁধের সব গেট খুলে দিয়ে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে বন্যা প্লাবিত করে দেওয়ার মধ্যে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটি বিকল্প বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। এতদিন তা আলোচনা ও লেখালেখিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও এবার তা বাস্তবে রূপায়িত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। গত বুধবার একনেক সভায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় অনুমোদিত প্রকল্পে বলা হয়েছে, এই বাঁধটি নির্মিত হবে রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার পদ্মা নদীর অংশের ওপর। বাঁধের মূল দৈর্ঘ্য হবে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার। এতে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস এবং দুটি ফিস পাস থাকবে। এই বাঁধের মাধ্যমে শুকনো মৌসুমের জন্য ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে এ প্রকল্প থেকে ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে, যা জাতীয় গ্রিডে সংযোজিত হবে। একনেকের সভা শেষে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এক প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিকদের বলেছেন, পদ্মা ব্যারাজ আমাদের স্বার্থের ব্যাপার, এ নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনার কিছু নেই। তবে গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা হবে। তিনি জানিয়েছেন, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের ফলে দেশের মোট আয়তনের এক-তৃতীয়াংশ এলাকার মানুষ উপকৃত হবে। ফারাক্কা বাঁধের ফলে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হচ্ছে সেটা কাটিয়ে উঠতে রাজবাড়ীর পদ্মা ব্যারাজ সহায়ক হবে।
পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের সিদ্ধান্তের খবরে দেশবাসী উৎফুল্ল হবে সঙ্গত কারণেই। কেননা, ফারাক্কার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার এই পথের দিকেই তারা তাকিয়ে ছিল দীঘকাল ধরে। তবে এ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি। যদিও বলা হয়েছে, সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আহরিত অর্থে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ধরা হয়েছে সাত বছর। অর্থাৎ চলতি বছরের জুলাইয়ে শুরু হয়ে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ কাজ শেষ হবে ২০৩৩ সালের জুন মাসে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সামর্থ্যের দিকটি বিবেচনায় নিলে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে উচ্চাভিলাষী না বলার উপায় নেই। কেননা বিগত প্রায় সতেরো বছরের লুটপাট ও দেড় বছরের অব্যবস্থাপনা দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে দিয়েছে। সে সঙ্গে বৈশ্বিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে বোঝার ওপর শাকের আঁটি হয়ে। এহেন পরিস্থিতিতে পদ্মা ব্যারাজের মতো মেগা প্রকল্পে অর্থায়ন এবং এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হওয়া অসঙ্গত নয়।
তা ছাড়া প্রকল্পটি বাংলাদেশের জন্য কতটা বাস্তবানুগ তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। তারা বলছেন, এই প্রকল্পের ফলে উজান ও ভাটি উভয় এলাকায়ই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। প্রথমত, ব্যারাজের উজানে নদীতে পলি পড়ার ফলে তলদেশ ভরাট হয়ে রাজবাড়ীর পাংশা থেকে রাজশাহী পর্যন্ত প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার নদীর দুই তীরে বন্যা এবং তীর ভাঙন বৃদ্ধি পাবে।
দ্বিতীয়ত, শুষ্ক মৌসুমের যতটুকু পানি দক্ষিণ-পশ্চিমে অপসারিত হবে, দেশের মধ্যাঞ্চল এবং মেঘনা মোহনার জন্য ঠিক ততটুকু পানিই হ্রাস পাবে। এর ফলে আড়িয়াল খাঁসহ অন্যান্য নদীর প্রবাহ কমে যাবে এবং মেঘনা মোহনা দিয়ে লবণাক্ততা দেশের আরও ভেতরে প্রবেশ করবে। তৃতীয়ত, এই প্রকল্পের ফলে ভারতের কাছে গঙ্গার হিস্যা আদায়ের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। কেননা, ভারত এ প্রকল্পকে কখনোই সুনজরে দেখবে না। তা সত্ত্বেও আমরা মনে করি, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ বাংলাদেশের পানি-সার্বভৌমত্বের জন্য একটি মাইলফলক হবে। নিজস্ব অর্থায়নে এ প্রকল্প সম্পন্ন করা গেলে এর ইতিবাচকে প্রতিক্রিয়া জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়বে। আমরা সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।