সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬ ১৩:১২ পিএম
দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো অবস্থায় নেই, এটা সর্বজনবিদিত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের ফলে দেশের লাইনচ্যুত অর্থনৈতিক ট্রেনটি এখনও টেনে তোলা সম্ভব হয়নি। এহেন পরিস্থিতিকে ‘পেইনফুল’ বা ‘বেদনাদায়ক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন স্বয়ং অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গত পরশু রাজধানীর একটি হোটেলে ৩৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সম্মিলিত উদ্যোগে গঠিত ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেছেন, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বহুমুখী চাপের মুখে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, বিশেষ করে বিনিয়োগ পরিস্থিতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি বলেছেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে এবং সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় পরিস্থিতি উত্তরণের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ব্যাংক খাতে ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ঘটবে না। মন্ত্রী পুঁজিবাজারের উন্নয়নে বড় ধরনের সংস্কারের পদক্ষেপ সরকার নেবে বলেও উল্লেখ করেছেন।
অর্থমন্ত্রীর
কথা আশান্বিত করে তোলে সঙ্গত কারণেই। কেননা, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীমাহীন
লুটপাট দেশের ব্যাংক খাতসহ গোটা অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। ন্যুব্জ সে অর্থনৈতিক
অবস্থা লীগ সরকারের বিদায়ের পরও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকার বিস্তর
আশার বাণী শোনালেও জাতীয় অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য ইতিবাচক কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থির সময়ে দেশ যখন বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা কবলিত, তখন বিগত সরকারের
সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের ব্যাংক-বীমাসহ বহু শিল্পকারখানা জনরোষে পড়ে। অনেক
প্রতিষ্ঠান যায় বন্ধ হয়ে। বেশ কয়েকটি ব্যাংক পড়ে বেকায়দা পরিস্থিতিতে। এহেন উদ্বেগজনক
পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগও স্থবির হয়ে পড়ে।
তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা অনেক দৌড়ঝাঁপ করে আইএমএফ ঋণের কিস্তি ছাড় করাতে সক্ষম হলেও বৈদেশিক
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সাফল্য দেখাতে পারেননি। এই সময়ে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ
বৃদ্ধির লক্ষ্যে একজন কথিত সুপারম্যানকে বিদেশ থেকে এনে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট
অথরিটি (বিডা)-র নির্বাহী চেয়ারম্যান পদে বসানো হয়। তাকে ঘিরে এমন প্রচারণা চালানো
হয় যে, বোধ করি এবার বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের মহাপ্লাবন সৃষ্টি হবে। কিন্তু ফলাফল
অষ্টরম্ভা। প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদার ওই সুপারম্যানের বৈদেশিক বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে
পারফরম্যান্স ‘সুপার ফ্লপ’ বলা যায়। অবশ্য দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের সমবেত করে একটি
‘স্মার্ট প্রেজেন্টেশন’ উপহার দিতে পারলেও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পেরেছেন সামান্যই।
একই সময়ে ব্যাংকিং খাতের স্থবিরতা দেশীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া
সৃষ্টি করে। ফলে লীগ সরকারের আমলে সীমাহীন অব্যবস্থাপনা ও লুটপাটে দেশের অর্থনৈতিক
খাতে যে ভয়াবহ ধস শুরু হয়েছিল, তা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
অনেকেই আশাবাদী
হয়েছেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার ইতিবাচক
পরিবর্তন ঘটবে। নতুন সরকার হয়তো পূর্বের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে জাতীয় অর্থনীতির জন্য
সহায়ক এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, যা অর্থনৈতিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে এবং বিনিয়োগ
গতিশীল হবে। সরকারের বয়স হয়েছে মাত্র আড়াই মাস। এই স্বল্প সময়ে একটি সরকারের পক্ষে
দেশের চিত্র আমূল বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে শুরুতে কিছু আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ ছিল প্রত্যাশিত।
বলা বাহুল্য, সে ধরনের পদক্ষেপ এখনও পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়নি। বরং নানা মাধ্যমে যেসব
খবর চাউর হয়, তাতে সচেতন ব্যক্তিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে।
দেশের ব্যাংকিং
খাত যে এখনও পর্যন্ত সুস্থির হয়নি, সে কথা পুনরুল্লেখের প্রয়োজন পড়ে না। ফ্যাসিস্টের
‘দোসর’ তাড়াতে গিয়ে অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ ব্যাংকারদের এ খাত থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তদস্থলে
দলীয় আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা দেখানো অনভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাহীন ব্যক্তিদের বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে
কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রসঙ্গত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কথা উল্লেখ করা যায়। পোশাক শিল্পে
তার অভিজ্ঞতা থাকলেও ব্যাংকিং ক্যারিয়ারের বাইরের এই বিশিষ্টজন কীভাবে দেশের ব্যাংকিং
সেক্টরকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনবেন বা স্থবিরতা দূর করবেন, সকলেই সেদিকে তাকিয়ে আছে
অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে। বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর গভর্নর পদে যিনি
বসবেন, তার ব্যাংকিং সম্বন্ধে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকতে হবে। ভালো অর্থনীতিবিদ হলেই যে
ভালো ব্যাংকার হওয়া যায় না, অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগকৃত গভর্নর আহসান এইচ মনসুর তার
উদাহরণ। তার আমলে দেশের ব্যাংক খাত এক পা-ও এগোয়নি।
এটা এখনই বলা
যাবে না, নবগঠিত ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি’ বিনিয়োগ খাতে সহায়তা দিতে
কতটুকু সমর্থ বা সফল হবে। ৩৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংক স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে এ সংস্থাটি গঠন
করেছেÑ এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। এর পেছনে সরকার, তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা
অবশ্যই রয়েছে। ফলে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যথাযথ তদারকি ব্যতীত
এই সংস্থা লক্ষ্য পূরণে সফলকাম হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তবে অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হবে না বলে যে মন্তব্য করেছেন, আমরা তাকে সাধুবাদ জানাই। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ তথা খবরদারি দেশের ব্যাংক খাতকে কীভাবে পর্যুদস্ত করে, নিকট অতীতেই তার দৃষ্টান্ত রয়েছে। বর্তমান সরকার সে দৃষ্টান্ত স্মরণে রেখে সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে দেশবাসী আশা করে।