× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাণিজ্য চুক্তি এবং বাংলাদেশের ভালো-মন্দ

জাকির হোসেন

প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬ ১২:৫৬ পিএম

বাণিজ্য চুক্তি এবং বাংলাদেশের ভালো-মন্দ

যুক্তরাষ্ট্রের বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি বিমান কেনার চূড়ান্ত চুক্তি সই করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এতে খরচ পড়বে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। ১৪টি বিমানের মধ্যে ১০টি ওয়াইড-বডির ‘৭৮৭ ড্রিমলাইনার’ এবং ৪টি ন্যারো-বডির ‘৭৩৭ ম্যাক্স’ মডেলের। চুক্তি অনুযায়ী ২০৩১ সালের অক্টোবরে বিমান সরবরাহ শুরু হতে পারে। এরপর ধাপে ধাপে ২০৩৫ সালের মধ্যে পুরো বহর হস্তান্তর সম্পন্ন হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মাহবুবুর রহমান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কিনতে ক্রয়াদেশ দেওয়ার কথা জানান। তবে তখন ‘বিমান কর্তৃপক্ষ’ কিছুই জানে না বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল। এরপর গত ৩০ ডিসেম্বর বিমান পরিচালনা পর্ষদে ১৪টি বোয়িং কেনার ‘নীতিগত’ সিদ্ধান্ত হয়, যা ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি চুক্তি আকার ধারণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কের চাপ কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার বোয়িংয়ের বিমান কেনার বিষয়ে গুরুত্ব দেয়। নতুন এই উড়োজাহাজ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দীর্ঘ দূরত্বের রুটে ব্যবহৃত হবে। এসব উড়োজাহাজ প্রায় ২০ শতাংশ বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী এবং যাত্রীসেবায় উন্নত সুবিধা দেবে। অন্তর্বর্তী সরকারের একেবারে শেষ সময়ে নির্বাচনের কয়েক ঘন্টা আগে গোপনে চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। এরপর এ নিয়ে নানা মহলে আলোচনা আছে। ওই গোপন চুক্তির একটি ছিল ১৪টি বিমান ক্রয়ের বিষয়টি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে সেটি বাস্তবায়ন করল। প্রশ্ন হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার গোপন চুক্তিটি বিএনপি সরকার কেন বাস্তবায়ন করছে।

তবে নানা সমালোচনার পর গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করার সুযোগ আছে। এক নম্বর, ৬০ দিনের নোটিস দিয়ে বাতিল করে দেওয়া যাবে। দুই নম্বর হচ্ছে, এই চুক্তির মধ্যে আরেকটি শর্ত আছে। দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির বিভিন্ন শর্তে পরিবর্তন করতে পারে।’ উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমি এই ইস্যুতে কথা বলেছি। আমরা সরকারের মধ্যেও এই চুক্তিটা নিয়ে কিছু পর্যালোচনা এবং চুক্তি এটা খুবই শক্তিশালী চুক্তি এবং এটা বাতিল করে দেওয়ার ইমপ্যাক্ট কী হতে পারে, নিশ্চয়ই আমরা বুঝতে পারি, কোন প্রেক্ষাপটে এই চুক্তিটা স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেটাও আমরা বুঝতে পারি।.. যে যে জায়গাগুলোকে আমরা বেশি সমস্যাজনক মনে করি, রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে মনে করছি, সেগুলো নিয়ে আমরা আগে আমাদের প্রাথমিক বিবেচনা করব।’ (সূত্র : প্রথম আলো)

 

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। নানান ইস্যুতে শেখ হাসিনাকে একপ্রকার জবাবদিহি করতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। বিশেষ করে, চট্টগ্রাম বন্দর ও সেন্টমার্টিন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নানা সময় বাংলাদেশকে চাপ প্রয়োগ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাগ্রহণ করে সেই দূরত্ব কমিয়ে আনার চেষ্টা করে। চট্টগ্রাম বন্দর ও সেন্টমার্টিন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে ত্বরিত কিছু কর্মকাণ্ড দেখায়।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’Ñ এআরটি আসলে কী ছিল? চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে গম, সয়াবিন ও জ্বালানি আমদানি এবং শূকরজাত পণ্য আমদানির সুযোগের বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে এমন চুক্তিতে না যাওয়া, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী। চুক্তি অনুযায়ী ৫ বছরে ৩৫ লাখ টন গম, সয়াবিন ও তুলাসহ বিভিন্ন কৃষি ও জ্বালানি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আমদানির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পূর্বে নিষিদ্ধ থাকা শূকরের মাংস ও সংশ্লিষ্ট উপজাত পণ্য আমদানির সুযোগ। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা এই চুক্তিকে ‘দাসখত’ বা দেশের স্বার্থবিরোধী হিসেবে অভিহিত করেছেন। কেউ কেউ একে অন্য দেশ থেকে কম দামে পণ্য কেনার সুযোগ সীমিত করবে এবং দেশীয় কৃষি ও জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলবে বলে মন্তব্য করেছেন।

চুক্তি অনুযায়ী গম, সয়াবিন, তুলা ও জ্বালানি শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র থেকেই কেনা বাধ্যতামূলকতায় বাংলাদেশ বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতামূলক দাম যেমন : রাশিয়া বা ভারত থেকে কম দামে গম কেনা যাচাই করার সুযোগ হারাবে। যদি বিশ্ববাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের দাম বা পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, তবুও বাংলাদেশ তাদের থেকেই পণ্য কিনতে বাধ্য থাকবে। এটি দেশের খাদ্য ও জ্বালানি ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। সম্প্রতি রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়েছে। ভাগ্য ভালো যুক্তরাষ্ট্র বাধা দেয়নি। যদি বাধা দিত তবে জ্বালানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করতে পারত। চুক্তির শর্ত অনুসারে এমন কোনো তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি করা যাবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশের বাইরে চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখতে পারবে না। বা সম্পর্ক সীমিত করতে হবে। আমরা জানি, বাংলাদেশে চীন এবং রাশিয়ার বড় বিনিয়োগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্বার্থ রক্ষা করতে হলে বাংলাদেশের এসব বিনিয়োগ হারাতে হতে পারে। এতে বাংলাদেশের সরকারের স্বাধীনভাবে পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য নীতিনির্ধারণের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করবে।

চুক্তিটি স্বাক্ষরের সময় এবং গোপনীয়তা নিয়ে সমালোচিত হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। দীর্ঘমেয়াদি বা কৌশলগত কোনো বড় চুক্তি করা অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ নয়, যা পরবর্তী সরকারগুলোকে বিপাকে ফেলতে পারে। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে দুয়েকজন রাজনীতিক কিছু বক্তব্য দিলেও তা বেশিদূর যায়নি। একদিকে প্রধান দলগুলোর কৌশলগত নীরবতা বা পরোক্ষ সম্মতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অবশ্য বামপন্থী দল ও নাগরিক সমাজ একে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দাবি করেছেন, চুক্তিটি স্বাক্ষরের আগে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে আলোচনা করে তাদের সম্মতি নেওয়া হয়েছিল। যদি তা-ই হয়ে থাকে তবে এই চুক্তির বিরোধিতা বা আপত্তি আসবে না এটাই স্বাভাবিক। হয়তো এ কারণেই বোয়িং কেনা হচ্ছে। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রথমে জানানো হয়, এই চুক্তির বিষয়ে তাদের সাথে কোনো পরামর্শ করা হয়নি এবং তারা এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের অবস্থান পরিবর্তন হয়।

যদিও সিপিবি, বাসদ এবং ওয়ার্কার্স পার্টির মতো বামপন্থী দলগুলো চুক্তির বিরোধিতা করেছে। তাদের মতে, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও দেশীয় কৃষি খাতকে হুমকির মুখে ফেলবে। কিন্তু তাদের কথা শোনার মতো মানুষ খুব একটা নেই। নবনির্বাচিত সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাই একমাত্র এই চুক্তিকে ‘দাসখত’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এটি সংসদে উত্থাপনের দাবি জানিয়েছেন। যদিও বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনার কোনো লক্ষণ নেই। তাই এ পর্যায়ে বলা যায়, যারা চুক্তিটিকে গোপন চুক্তি বলছেন তারা ভুল করছেন।

বিমান ক্রয় নতুন কিছু নয়। দোষেরও না। প্রতিটি সরকারের সময়ে বিমান কেনা হয়েছে। এর আগে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ১৫টি বিমান ক্রয় করেছে। এটাই ছিল সবচেয়ে বেশি বিমান ক্রয়ের ঘটনা। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার মাত্র দেড় বছরে ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি অনেক কিছুরই ইঙ্গিত করে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে চলতে চাওয়া এবং বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যেই এই চুক্তি। প্রকৃত অর্থে অপরিকল্পিত বাস্তবায়ন দেশীয় শিল্প, কৃষি ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই এই ধরনের চুক্তিতে আবেগ নয়, বরং বাস্তববাদী ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল প্রয়োজন।


জাকির হোসেন

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা