× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সত্য-মিথ্যার মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানুষ

হাবিব বাবুল

প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬ ১২:৪৩ পিএম

আপডেট : ১৪ মে ২০২৬ ১২:৪৫ পিএম

সত্য-মিথ্যার মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানুষ

ডিজিটাল যুগ মানুষের সামনে এক অভূতপূর্ব সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। পৃথিবীর এক প্রান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনা মুহূর্তেই অন্য প্রান্তের মানুষের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই বিস্ময় মানবসভ্যতাকে যেমন এগিয়ে নিয়েছে, তেমনি তৈরি করেছে এক ভয়ংকর সংকটওÑ সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া। একসময় মানুষ ছবি দেখে বিশ্বাস করত, পরে ভিডিও দেখে নিশ্চিত হতো। এখন সেই ভিডিওও আর বিশ্বাসের জায়গায় নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিপফেক প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল সম্পাদনার ক্ষমতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোনটি বাস্তব আর কোনটি সাজানো তা বোঝা সাধারণ মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে।

আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুললেই দেখা যায়, মীর্জা গালিব নতুন করে কবিতা আবৃত্তি করছেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে কথা বলছেন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আধুনিক সমাজ বিশ্লেষণ করছেন। শুধু সাহিত্যিক নন, বিশ্বনেতারাও এর বাইরে নন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানÑ বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের নামে প্রতিদিন ছড়িয়ে পড়ছে অসংখ্য ভুয়া ভিডিও, ভুয়া বক্তব্য এবং মনগড়া বার্তা। মৃত মানুষদের ‘কণ্ঠ’ তৈরি করা হচ্ছে, তাদের ‘মুখ’ দিয়ে কথা বলানো হচ্ছে। যেন প্রযুক্তি মানুষের স্মৃতি ও ইতিহাসকেও কৃত্রিমভাবে পুনর্গঠন করতে শুরু করেছে। সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এই ভুয়া কনটেন্টের বন্যা শুধু মিথ্যাকে ছড়াচ্ছে না; এটি সত্যের ওপরও সন্দেহ তৈরি করছে। আগে মানুষ ভুয়া খবর নিয়ে চিন্তিত ছিল, এখন সত্যিকারের ভিডিওও সন্দেহের মুখে পড়ছে।

সমস্যাটি এত জটিল হওয়ার একটি বড় কারণ হলো, প্রযুক্তির গতি আইনের চেয়ে অনেক দ্রুত। কোনো রাষ্ট্রই এখনও কার্যকরভাবে এই ভুয়া ভিডিও সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা এশিয়াÑ সব জায়গাতেই সরকারগুলো হিমশিম খাচ্ছে। কারণ, একটি ভিডিও তৈরি হতে কয়েক মিনিট সময় লাগে, কিন্তু সেটি যাচাই করতে লাগে ঘণ্টা কিংবা দিন। ততক্ষণে ভিডিওটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদমও সত্যের চেয়ে উত্তেজনাকর মিথ্যাকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়। কারণ, মিথ্যা বেশি আলোড়ন তোলে, বেশি ক্লিক আনে, বেশি বিজ্ঞাপন আয়ের সুযোগ তৈরি করে।

আইন কি এর সমাধান দিতে পারে? আংশিকভাবে হয়তো পারে, কিন্তু পুরোপুরি নয়। কারণ, প্রযুক্তি এখন সীমান্ত মানে না। একটি ভিডিও বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হলেও সেটি অন্য দেশের সার্ভার থেকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নও এখানে জড়িয়ে আছে। কোন ভিডিও ভুয়া, কোনটি ব্যঙ্গ, কোনটি শিল্পÑ এই সীমারেখা নির্ধারণ করাও সহজ নয়। ফলে কঠোর আইন অনেক সময় রাজনৈতিক দমন-পীড়নের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। তাই শুধু আইন দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

সমাধানের মূল জায়গাটি সম্ভবত প্রযুক্তির বাইরেও, মানুষের ভেতরে। মানুষকে নতুন ধরনের ‘ডিজিটাল সচেতনতা’ অর্জন করতে হবে। যেমন একসময় মানুষকে পড়তে-লিখতে শেখানো হয়েছিল, এখন প্রয়োজন ডিজিটাল সাক্ষরতা শেখানো। একটি ভিডিও দেখেই বিশ্বাস না করা, উৎস যাচাই করা, নির্ভরযোগ্য সংবাদ মাধ্যম অনুসরণ করাÑ এসব অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। স্কুল-কলেজের শিক্ষাক্রমেও ডিজিটাল সত্য যাচাইয়ের শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। কারণ ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের হবে না; তথ্যেরও হবে।

একই সঙ্গে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক কিংবা এক্সÑ এই প্লাটফর্মগুলো শুধু ব্যবসা নয়, এখন বৈশ্বিক জনমতের নিয়ন্ত্রক শক্তি। তারা যদি চায়, তাহলে এআই-নির্ভর শনাক্তকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ভুয়া ভিডিও চিহ্নিত করা অনেকাংশে সম্ভব। ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। কারণ সত্য যাচাইয়ের চেয়ে মুনাফা অনেক সময় বড় হয়ে দাঁড়ায়। এই জায়গায় আন্তর্জাতিক চাপ এবং নৈতিক দায়িত্ব দুটোই প্রয়োজন।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সমাজকে হয়তো নতুন এক বাস্তবতা মেনে নিতে হবেÑ ডিজিটাল যুগে শতভাগ নিশ্চিত সত্য পাওয়া কঠিন। একসময় ছবি ছিল প্রমাণ, পরে ভিডিও ছিল প্রমাণ; এখন হয়তো কোনোকিছুকেই এককভাবে প্রমাণ হিসেবে ধরা যাবে না। মানুষকে তাই একাধিক উৎস, বিশ্লেষণ এবং প্রেক্ষাপট মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শিখতে হবে। অর্থাৎ, প্রযুক্তির যুগে সত্য আর সরল নয়; সত্য এখন অনুসন্ধানের বিষয়।

এই সংকট রাজনীতির ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব ফেলছে। নির্বাচন, জনমত, সামাজিক আন্দোলনÑ সবকিছুই ভুয়া ভিডিও দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। একটি সাজানো ভিডিও একটি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে, সাম্প্রদায়িক সংঘাত তৈরি করতে পারে, এমনকি যুদ্ধের কারণও হতে পারে। ফলে এটি শুধু ব্যক্তিগত বিভ্রান্তির সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তারও প্রশ্ন।

ইতিহাসে প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সঙ্গে মানবসভ্যতা একধরনের নৈতিক সংকটে পড়েছে। ছাপাখানা যেমন ভুয়া পুস্তিকার জন্ম দিয়েছিল, টেলিভিশন যেমন প্রচারণার নতুন যুগ তৈরি করেছিল, তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও সত্যকে নতুনভাবে চ্যালেঞ্জ করছে। কিন্তু ইতিহাস এটিও বলে, শেষ পর্যন্ত মানুষই নতুন ভারসাম্য তৈরি করেছে। হয়তো এই সময়েও মানুষকে নতুন নৈতিকতা, নতুন শিক্ষা এবং নতুন সামাজিক চুক্তির দিকে যেতে হবে।

আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো ধৈর্য ও সমালোচনামূলক চিন্তা। আমরা এমন একসময়ে বাস করছি যেখানে চোখ যা দেখে, কান যা শোনেÑ সবকিছুই সত্য নাও হতে পারে। তাই দ্রুত প্রতিক্রিয়া নয়, যাচাই করা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করার আগে থামা জরুরি। কারণ প্রতিটি ভুয়া ভিডিও শুধু একটি মিথ্যা নয়; এটি সমাজের বিশ্বাসের ভিতকে ধ্বংস করার অস্ত্র।

প্রযুক্তি মানুষ সৃষ্টি করেছে, তাই প্রযুক্তির সংকটের সমাধানও শেষ পর্যন্ত মানুষকেই খুঁজে বের করতে হবে। হয়তো সম্পূর্ণ সমাধান কখনোই আসবে না। কিন্তু সচেতনতা, শিক্ষা, দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সামাজিক সতর্কতা মিলিয়ে অন্তত এই অন্ধকারকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সত্য হয়তো এখন আগের চেয়ে দুর্বল, কিন্তু মানুষের সত্য অনুসন্ধানের ক্ষমতা এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। আর সেই ক্ষমতাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় আশার জায়গা।


হাবিব বাবুল

জার্মান ভিত্তিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা