সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬ ১১:৩২ এএম
রেলের বহরে থাকা মোট ২৯৭টি ইঞ্জিনের মধ্যে ১৫০টি ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল শেষ, যা মোট ইঞ্জিনের ৫১ শতাংশ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আমাদের বাংলাদেশটা এখনও মূলত গ্রাম/নগরেও যারা বাস করেন তাদের শেকড় গ্রামে। গ্রামের বাড়িকে তাই এদেশের মানুষ ‘দেশের বাড়ি’ বলেই চেনে। পালা-পার্বণ, উৎসব-অনুষ্ঠানে তাই সবাই ছোটে শহর খালি করে গ্রামে। ঈদুল আজহা সামনে রেখে মানুষের ঘরমুখো যাত্রা শুরু হবে কয়েক দিন পরেই। প্রতিবছর ঈদ এলেই সড়কপথ ও নৌপথের পাশাপাশি রেলপথে যাত্রীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও তুলনামূলক আরামদায়ক হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে রেলই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাহন। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলোÑ এই বিশাল ঈদযাত্রা সামাল দিতে বাংলাদেশ রেলওয়েকে এখনও অনেকাংশে নির্ভর করতে হচ্ছে পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনের ওপর। যেকোনো সময় এসব ইঞ্জিন বিকল হলে ট্রেন চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাতে পারে, ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। বাস্তব এই সংকটকে সামনে রেখেই ঈদযাত্রায় রেলের বড় ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব পুরনো বুড়ো ইঞ্জিন।
যদিও ঈদযাত্রায় নির্বিঘ্ন ট্রেন চলাচলের আশ্বাস দিচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। যেখানে যাত্রীচাপ সামাল দিতে প্রতিদিন প্রয়োজন ৯০ থেকে ৯৫টি লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন)। যার মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ বছর পুরনো ইঞ্জিনই বেশি। যাদের আয়ুষ্কাল কার্যত শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই। রেল সংশ্লিষ্টদের মতে, লোকোমোটিভ ইঞ্জিনের কারণে শুধু ট্রেনের সংখ্যা নয়, সময়সূচি রক্ষা করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় একটি ইঞ্জিন বিকল হলে পুরো রুটের ট্রেন চলাচলে প্রভাব পড়ে। এতে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় স্টেশনে অপেক্ষা করতে হয়। তখন আনন্দের যাত্রা পরিণত হয় দুর্ভোগ আর ভোগান্তিতে।
উল্লেখ্য, গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সময়ে পুরনো ইঞ্জিন বিকল হয়ে ট্রেন আটকে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। কখনও পাহাড়ি রুটে, কখনও গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃনগর ট্রেনে। এতে মাঝপথে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এবারও তেমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঈদুল আজহা সামনে রেখে পূর্বাঞ্চলের পাহাড়তলী ও ঢাকা বিভাগের লোকোমোটিভ কারখানায় ৯০টি ইঞ্জিন তড়িঘড়ি মেরামত করা হচ্ছে। এর মধ্যে পাহাড়তলী ডিজেল শপে ৫৫টি এবং ঢাকা বিভাগে ৩৫টি ইঞ্জিন প্রস্তুতের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে ৪৬টির মেরামত শেষ হয়েছে। চিন্তার বিষয় হলো, রেলের বহরে থাকা মোট ২৯৭টি ইঞ্জিনের মধ্যে ১৫০টি ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল শেষ, যা মোট ইঞ্জিনের ৫১ শতাংশ। এর মধ্যে মিটারগেজ ইঞ্জিন ১৬৭টি ও ব্রডগেজ ইঞ্জিন ১৩০টি। রেলট্র্যাকে যুক্ত হওয়ার পর একটি ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ধরা হয় ২০ বছর। সেই হিসেবে অর্ধেকের বেশি ইঞ্জিন এখন ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ অবস্থায় চলাচল করছে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল রয়েছে রেলওয়েতে এমন ইঞ্জিনের সংখ্যা ১৪৭টি। বাকি ১৫০টি ইঞ্জিনের মধ্যে ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৫০টি ও ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী রয়েছে ১৬টি। অবশিষ্ট ৮৪টি ইঞ্জিনের বয়স ৪০ বছর পেরিয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, দক্ষ লোকবলের সংকট ও মানসম্মত যন্ত্রাংশের অভাবে ইঞ্জিন মেরামতে বেগ পেতে হচ্ছে। অভিজ্ঞ কর্মী না থাকায় নতুনদের দিয়েই গুরুত্বপূর্ণ মেরামত কাজ চালাতে হচ্ছে।
এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্ট করছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে থাকা বহু ইঞ্জিন ইতোমধ্যে তাদের আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে। নিয়মিত মেরামত ও সংস্কারের মাধ্যমে এগুলো সচল রাখা হলেও বাস্তবতা হলো, পুরনো যন্ত্রপাতি কখনোই পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য হতে পারে না। ঈদের সময় অতিরিক্ত ট্রেন পরিচালনা, দীর্ঘ রুটে একটানা চলাচল এবং অতিরিক্ত চাপ ইঞ্জিনগুলোর ওপর বাড়তি চাপ ও ঝুঁকি তৈরি করে। এই দুর্বলতার পেছনে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাব দায়ী। সরকার রেলপথ উন্নয়নে বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ করলেও ইঞ্জিন ও কোচ আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি এখনও দৃশ্যমান নয়। নতুন রেললাইন নির্মাণের পাশাপাশি আধুনিক ইঞ্জিন সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অবকাঠামো থাকলেও পর্যাপ্ত সক্ষমতার ইঞ্জিন না থাকলে পুরো রেল নেটওয়ার্ক অকার্যকর হয়ে পড়ে।
আমরা মনে করি, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে এখনই জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পুরনো ইঞ্জিনগুলোকে বিশেষ কারিগরি পরীক্ষার আওতায় এনে ঝুঁকিপূর্ণ ইঞ্জিন সাময়িকভাবে চলাচল থেকে বিরত রাখতে হবে। বিকল্প ইঞ্জিন প্রস্তুত রাখতে হবে, যাতে মাঝপথে কোনো ট্রেন বিকল হলে দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থা নেওয়া যায়। রেলওয়ের কর্মীদের ছুটি সীমিত করে সার্বক্ষণিক মনিটরিং জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে যাত্রীদের সঠিক তথ্য জানাতে কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রেলকে সত্যিকার অর্থে গণমানুষের ভরসার পরিবহনে পরিণত করতে হলে পুরনো ইঞ্জিন-নির্ভরতা কমাতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ইঞ্জিন সংগ্রহ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। মনে রাখা দরকার, ঈদযাত্রা কেবল মানুষের বাড়ি ফেরা নয়; এটি রাষ্ট্রের সেবাদানের সক্ষমতারও বড় পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় সফল হতে হলে রেলব্যবস্থাকে ঝুঁকিমুক্ত ও আধুনিক করা অপরিহার্য।