ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬ ১১:২৫ এএম
ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম, সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান-ন্যাশনাল এফ এফ ফাউন্ডেশন। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ঋণের চাপে রয়েছে বর্তমান সরকার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সরকারের ব্যাংক খাত থেকে ঋণের স্থিতি প্রায় ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০৮% । এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া নিট ঋণ ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে । বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ১১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি । ঋণ স্থিতি সম্পর্কিত মূল তথ্য (এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত): মোট অভ্যন্তরীণ ঋণ: এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি ৬,৬৩,৬৬৬ কোটি টাকা। বেসরকারি খাত: ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে বেসরকারি খাতের ঋণের স্থিতি ১৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক ঋণ: ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ১১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা আগের বছর ৯১৩ কোটি ডলার বেড়েছে। প্রধান প্রকল্পসমূহ: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (৯১ হাজার কোটি টাকার বেশি), মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র (৪৩ হাজার কোটি টাকার বেশি) এবং মেট্রোরেল (১৯ হাজার কোটি টাকার বেশি) প্রকল্পে বড় অঙ্কের বিদেশি ঋণের স্থিতি রয়েছে। এই তো গেল ঋণের অবস্থা।
আগামী পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ বাংলাদেশের ওপরে এক বিরাট অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। এই সংবাদ শঙ্কার। হিসাব করে দেখা গেছে যে, ২০২৬ থেকে ২০৩০ এই পাঁচ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের জন্য বাংলাদেশকে ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার ব্যয় করতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতেও এ ঋণভার বিশাল। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫৪ বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের জন্য বাংলাদেশ যেখানে ৪ হাজার কোটি ডলার খরচ করেছে, সেখানে আগামী ৫ বছরেই এ খাতে বাংলাদেশকে ব্যয় করতে হবে উপরোক্ত পরিমাণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। গত বছরের জুন মাস নাগাদ বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ ছিল ৭ হাজার ৭০০ কোটি ডলার, যা আমাদের জাতীয় আয়ের ১৯ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশে ঋণ ও সরকারি আয়ের অনুপাত ১৬.৫ শতাংশ। অনুপাতটি আন্তর্জাতিক মুদ্রাভান্ডারের নির্ধারিত ঝুঁকিপূর্ণ অনুপাতের (১৮ শতাংশ) সামান্য নিচে, সন্দেহ নেই। তবে সব মিলিয়ে পুরো চিত্রটি খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২৬-২০৩৫ এই ১০ অর্থবছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ হবে ৫ হাজার ১০০ কোটি ডলার। ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে বৈদেশিক ঋণ মেটাতে সর্বোচ্চ সাড়ে ৫০০ কোটি ডলার খরচ করতে হবে।

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স থেকে ২০২১-২০২৫ সময়ে আমাদের আয় হয়েছে ২০০ কোটি ডলার। সুতরাং তিন মাসের প্রবাসী আয় থেকে আমরা ওই সর্বোচ্চ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে পারি। বর্তমান প্রবণতা চলতে থাকলে দেশের বর্তমান ঋণভার থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে বাংলাদেশের ৩৭ বছর লাগবে (২০৬৩ পর্যন্ত)। প্রশ্ন হলো, এ বিপুল ঋণভার কী করে আমাদের ওপরে বর্তাল? এসব কারণের কিছু কিছু বৈশ্বিক, কিছু দেশীয়।
বৈশ্বিক কারণের মধ্যে আছে ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে, কোভিড-১৯-এর মতো অতিমারি এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট, আমাদের রপ্তানি, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং প্রবাসী শ্রম আয়কে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে। এতে দেশজ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে। অর্থনীতির এই সংকোচন সরকারের রাজস্ব আয়কেও হ্রাস করেছে। ফলে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ বাংলাদেশের জন্য কষ্টকর হয়ে উঠেছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, বৈশ্বিক অস্থিরতা ও নাজুকতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধীরগতি ও ভঙ্গুরতা আমাদের রপ্তানি-আমদানি, বিশেষত জ্বালানি আমদানি, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং প্রবাসী শ্রম-আয়কে একটি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর ফলে আমাদের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও নাজুক হচ্ছে। এ ব্যাপারে দেশীয় কারণগুলো হচ্ছে- প্রথমত, অতীতে বাংলাদেশে যেসব বিশাল প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ব্যয়ভার এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধকে দুঃসহ করে তুলেছে। মনে রাখা দরকার, বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমেই এসব প্রকল্পের বেশিরভাগ অর্থায়ন হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী? বৈশ্বিক জ্বালানি-সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে এ ঋণভার বাংলাদেশ অর্থনীতির জন্য একটি অতিরিক্ত ঝুঁকির সৃষ্টি করছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে যখন নতুন ঋণ পরিশোধের সময় আসবে, তখন পুরো পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। এর থেকে উত্তরণের জন্য একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এর মধ্যে একদিকে যেমন রয়েছে ১১ বিলিয়ন ডলারের রূপপুর পরমাণু শক্তি প্রকল্প, অন্যদিকে রয়েছে কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা রেল সংযোগ, শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো একাধিক বিশাল উদ্যোগ। এর কোনো কোনোটি বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে, যার ফলে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে বৈদেশিক ঋণণে পরিমাণ।
২০২৮ সাল নাগাদ রূপপুর প্রকল্পের ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বার্ষিক ঋণ পরিশোধ চক্র শুরু হয়ে যাবে। বিভিন্ন প্রকল্প বিলম্ব হওয়ার কারণে সেসব প্রকল্প থেকে যেসব আয় এবং সুফল পাওয়ার কথা ছিল, তাও বিলম্বিত হয়েছে। যেমন জাপানি দুই বিলিয়ন ডলার অর্থায়নে শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এখনও চালু হয়নি। বিদ্যমান ঋণভারের ওপরে এগুলো অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে করজালের বিস্তার না ঘটাতে পারায় কর আয়, বিশেষ করে প্রত্যক্ষ কর কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছতে পারেনি। বাংলাদেশে কর-জাতীয় আয়ের অনুপাত মাত্র ৭ শতাংশ এবং এ অর্থনীতি বিপুলভাবে অপ্রত্যক্ষ করনির্ভর। বাংলাদেশের চলমান ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে আবগারি শুল্কের সুযোগও সীমিত। সরকারের কর আয় সীমাবদ্ধ হলে উন্নয়ন ব্যয়ভারসহ তার মোট ব্যয়ভার মেটাতে তাকে ঋণের দ্বারস্থ হতে হবে, যার একটি উৎস বহিঃঋণ। তৃতীয়ত, যেহেতু বাংলাদেশ অর্থনীতি আমদানি শুল্কের মতো অপ্রত্যক্ষ করের ওপরে নির্ভর করে, সেহেতু সাম্প্রতিক সময়ের বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ ও ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক অবস্থা বাংলাদেশের আমদানিকে ব্যয়বহুল করেছে। ফলে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা মজুদের ওপরে চাপ পড়ছে। সেই সঙ্গে রপ্তানি এবং প্রবাসী শ্রম আয়ের সংকোচনের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার জোগানও কমে যাচ্ছে। যার কারণে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধও একটি নাজুক ভবিষ্যতের সম্মুখীন হচ্ছে। চতুর্থত, বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন বহুপক্ষীয় বা দ্বিপক্ষীয় দাতাগোষ্ঠী একদিকে যেমন তাদের সুদকাঠামো পরিবর্তিত করেছে, তেমনি ঋণ পরিশোধের সময়সীমাকে হ্রাস করেছে। সেই সঙ্গে সংকুচিত হয়েছে ঋণ পরিশোধের অতিরিক্ত ছাড় সময়সীমা। সবটা মিলিয়ে চাপ সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধ পরিস্থিতির ওপরে। বৈশ্বিক জ্বালানি-সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে এ ঋণভার বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি অতিরিক্ত ঝুঁকির সৃষ্টি করছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে যখন নতুন ঋণ পরিশোধের সময় আসবে, তখন পুরো পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। এর থেকে উত্তরণের জন্য একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
শুধু বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিপ্রেক্ষিতেই নয়, বাংলাদেশ অর্থনীতির যথার্থ ব্যবস্থাপনা এবং বজায়ক্ষম স্থিতিশীলতার জন্য এ অর্থনীতির কর আয়, বিশেষত প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। কর-জাতীয় আয়ের অনুপাত অন্ততপক্ষে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর সমকক্ষ হওয়া প্রয়োজন। দুর্বল কর আদায়প্রক্রিয়া বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে এবং বর্তমানের গ্রহণযোগ্য ঝুঁকিকে।
আমাদের রপ্তানির বৈচিত্র্যকরণ এবং বহুধাকরণেও কোনো বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে আমদানিরও যৌক্তিকীকরণ প্রয়োজন। আমদানির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বনাম অপ্রয়োজনীয়, বিলাসপণ্য বনাম উৎপাদন উপকরণের মধ্যে একটি বিভাজন করা দরকার। চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে এ জাতীয় ভেদরেখা টানা খুবই জরুরি। সেই সঙ্গে প্রবাসী শ্রম আয় বর্ধিতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তাছাড়া প্রকল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রে কঠোর ও বস্তুনিষ্ঠ হতে হবে। মেগা প্রকল্পের প্রবণতা হ্রাস করাই বাঞ্ছনীয়। সেই সঙ্গে প্রকল্পের অর্থায়নের উৎস যতটা সম্ভব দেশজ রাখাটা জরুরি। সে সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমার ব্যাপারে যৌক্তিক কারণ ভিন্ন ছাড় দেওয়া যাবে না।
ঋণ-অর্থায়নে প্রকল্পের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই অত্যন্ত জরুরি। বিশেষত জ্বালানি খাতে, যেখানে বিনিয়োগ বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের বিদ্যমান বহু সমস্যার সমাধানে অপরিহার্য। ঋণ পরিশোধ অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপরে নির্ভরশীল। যার জন্য রপ্তানির প্রসারণ এবং রাজস্ব পরিসীমার বিস্তার অপরিহার্য। ঊর্ধ্বমুখী ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বনাম নতুন ঋণের ধাক্কার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এড়ানোর জন্য চারটি জায়গায় সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি। রপ্তানি সম্প্রসারণ, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি, উন্নত বিনিয়োগ পরিবেশ এবং কর আয় নিশ্চিতকরণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে একটি ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। বিদেশি ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশ কখনও খেলাপ করেনি, যা শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে হয়েছে। বাংলাদেশকে দেখতে হবে যে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধীরগতি, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ডামাডোল এবং বর্তমান বৈশ্বিক সংকটে তার ঋণ যাতে খেলাপ না হয়।
ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম
সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান-ন্যাশনাল এফ এফ ফাউন্ডেশন