সহিদুল আলম স্বপন
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬ ১১:১৬ এএম
সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে রপ্তানি খাত ও কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার প্রয়োজন। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যকার বাণিজ্য সম্পর্কের দিকে তাকালে একটি অস্বস্তিকর চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল তুলনামূলকভাবে সহনীয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে তা ফুলেফেঁপে দাঁড়িয়েছে ৪১৪ কোটি ৩৯ লাখ মার্কিন ডলারে। এই সংখ্যাটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের রপ্তানি কাঠামোর দীর্ঘদিনের দুর্বলতার জীবন্ত দলিল। একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশের রপ্তানি ২০১৮-১৯ সালের ১০ কোটি ৬৮ লাখ ডলার থেকে কমে ২০২৪-২৫ সালে নেমে এসেছে মাত্র ৭ কোটি ৭১ লাখ ডলারে। অর্থাৎ রপ্তানি বাড়েনি, বরং কমেছে। অথচ একই সময়ে সুইজারল্যান্ড থেকে আমদানি ২৭ কোটি ২০ লাখ ডলার থেকে লাফিয়ে উঠেছে ৪৯ কোটি ২১ লাখ ডলারে। দুটি সংখ্যার এই বিপরীতমুখী যাত্রাই বলে দেয়, সমস্যাটি কতটা কাঠামোগত এবং কতটা দীর্ঘমেয়াদি।
এই ঘাটতির মূলে রয়েছে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের অসহনীয় একমুখিতা। সুইজারল্যান্ডে আমাদের মোট রপ্তানির ৯০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। একটিমাত্র খাতের ওপর এই অতিনির্ভরতা যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা বৈশ্বিক বাজারের যেকোনো ধাক্কায় টের পাওয়া যায়। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ড আমাদের কাছে রপ্তানি করছে যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ওষুধ, রাসায়নিক দ্রব্য, নিখুঁত প্রকৌশল যন্ত্র এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, অর্থাৎ উচ্চমূল্য ও বহুমাত্রিক পণ্যের এক বিশাল সম্ভার। দুই দেশের রপ্তানি কাঠামোর এই বৈসাদৃশ্য আসলে দুই দেশের অর্থনৈতিক পরিপক্বতার পার্থক্যকেই তুলে ধরে।
এখানে একটি বাস্তব প্রতিবন্ধকতার কথা না বললেই নয়। পণ্য পৌঁছানোর সময় একটি বড় সমস্যা। উদাহরণস্বরূপ, তুরস্ক থেকে পণ্য সুইজারল্যান্ডে পৌঁছে মাত্র ৫ থেকে ৭ দিনে, আর বাংলাদেশ থেকে সেই একই গন্তব্যে পৌঁছতে লেগে যায় কমপক্ষে চার সপ্তাহ। এই দীর্ঘ পরিবহন সময় কেবল ব্যবসায়িক খরচ বাড়ায় না, ক্রেতার আস্থাও কমায়। দ্রুত ফ্যাশন চক্রের যুগে চার সপ্তাহের লিড টাইম অনেক সময় একটি অর্ডার হারানোর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে এই সংকটের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক বিশাল সম্ভাবনা। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, ওষুধ শিল্প, পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, সিরামিক, হালকা প্রকৌশল পণ্য, সাইকেল এবং তথ্যপ্রযুক্তি সেবাÑ এই খাতগুলোতে বাংলাদেশের প্রকৃত সম্ভাবনা রয়েছে। সুইজারল্যান্ড একটি উচ্চ-আয়ের, গুণমান সচেতন বাজার। এই বাজারে প্রবেশ করতে হলে চাই মানসম্পন্ন পণ্য, নির্ভরযোগ্য সরবরাহ শৃঙ্খল এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক কূটনীতি।
এই প্রসঙ্গে জেনেভায় অবস্থিত বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি কথা বলা এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। জেনেভা কেবল একটি শহর নয় এটি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনার কেন্দ্রভূমি। এই অসাধারণ কৌশলগত অবস্থানে থেকেও যদি মিশন কেবল আনুষ্ঠানিক বৈঠক, ফটোসেশন আর বিবৃতির মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখে, তাহলে এই সুযোগ নিছক অপচয়ে পরিণত হয়। চকচকে অনুষ্ঠানের ডামাডোল আর সংবাদ মাধ্যমে মুখরোচক উদ্ধৃতি দিয়ে বাণিজ্য ঘাটতি কমে না, সেটা কমে কেবল তখন, যখন মাটিতে নেমে সত্যিকারের কাজ হয়।
বাংলাদেশ মিশনকে এখন প্রোটোকলের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হবে। সুইস শিল্প সংগঠন, বাণিজ্য চেম্বার এবং প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিয়মিত ও অর্থবহ সংলাপ, সম্পর্ক গড়ে তোলা মিশনের গুরুদায়িত্ব হওয়া উচিত। যে ব্যবসায়ী সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশি পণ্য আমদানিতে আগ্রহী, যে বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনের কথা ভাবছেন, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং তাদেরকে বাংলাদেশ সম্পর্কে আবারও আগ্রহী করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া মিশনের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত। শুধু উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সফর আর পারস্পরিক সৌজন্য বিনিময়ে বাণিজ্যিক ফলাফল আসে না। আসে তখন, যখন মিশনের কর্মকর্তারা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে বাংলাদেশের পণ্য ও সম্ভাবনার কথা সুইস ব্যবসায়ী মহলে তুলে ধরেন, রপ্তানিকারকদের হয়ে বাজার অনুসন্ধান করেন এবং দুই দেশের উদ্যোক্তাদের একই টেবিলে বসার সুযোগ করে দেন।
বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, অনেক ক্ষেত্রেই দেশীয় রপ্তানিকারকরা বিদেশে অবস্থিত মিশন থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান না। বাজার তথ্য, ক্রেতার সন্ধান, প্রদর্শনী আয়োজন কিংবা ব্যবসায়িক যোগাযোগ স্থাপনে মিশনের সক্রিয় ভূমিকার অভাব বারবার অনুভূত হয়। এই নেতিবাচক সংস্কৃতি বদলাতে হবে। জেনেভা মিশনকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে ব্যবসায়ী-বান্ধব ভূমিকা হতে হবে। মিশনের দরজা যেন সত্যিকারের উদ্যোক্তাদের জন্য সর্বদা উন্মুক্ত থাকে, তাদের সমস্যার কথা শোনা এবং সমাধানে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সুইস বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের সেবা খাত, ফার্মাসিউটিক্যালস, চামড়া, হালকা প্রকৌশল এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। সুইস রাষ্ট্রদূত রেতো রেংলিও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এই দ্বিপাক্ষিক ইচ্ছাশক্তিকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কেবল মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে মিশনের ধারাবাহিক ও ফলমুখী কার্যক্রম।
সরকারের উচিত কেবল সংখ্যার হিসাব না কষে একটি কার্যকর রপ্তানি বহুমুখীকরণ কৌশল প্রণয়ন করা। পণ্যের মান উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় সহায়তা, রপ্তানিকারকদের জন্য প্রণোদনা, লজিস্টিক অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক সংলাপ জোরদার করা এই পদক্ষেপগুলো একসঙ্গে নিতে না পারলে এই ঘাটতি কমবে না, বরং আরও বাড়বে।
বাণিজ্য ঘাটতি মানেই পরাজয় নয়। কিন্তু একই ঘাটতি বছরের পর বছর বাড়তে থাকলে এবং সেই বৃদ্ধির পেছনে যদি কাঠামোগত অদক্ষতা, উদ্যোগের অভাব এবং মিশনের নিষ্ক্রিয়তা দায়ী থাকে, তাহলে সেটি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার লক্ষণ। সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্যের এই অসমতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় বৈচিত্র্যহীন অর্থনীতি, ফটোসেশন-নির্ভর কূটনীতি এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন মিশন দিয়ে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। পোশাকের বাইরেও অন্যান্য প্রচলিত-অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানির সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে। প্রয়োজন শুধু সঠিক নীতি, দায়িত্বশীল ও সক্রিয় মিশন এবং সত্যিকারের ব্যবসায়ীদের হাত ধরে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
সহিদুল আলম স্বপন
কবি ও সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ