রাসেল আহমদ
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬ ১১:১০ এএম
অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাওয়া হাওরে ধান পচনে পানিদূষণ ও মাছের মড়কের আশঙ্কা বাড়ছে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
গত কয়েক সপ্তাহের অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জসহ বৃহত্তর হাওরাঞ্চলের অধিকাংশ বোরো ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে পড়েছে। কিন্তু এই দৃশ্যমান বিপর্যয়ের আড়ালে আরও বড় এক অদৃশ্য বিপদ এগিয়ে আসছে। পানিতে ডুবে থাকা ধানগাছ পচনের ফলে সৃষ্টি হওয়া বিষক্রিয়ায় পানিদূষণ এবং মাছ ও জলজ প্রাণীর সম্ভাব্য মড়ক। সেই আশঙ্কাই এখন সবাইকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
হাওর শুধু বাংলাদেশের ধানের ভাণ্ডার নয়, এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য-ভাণ্ডারও। দেশের শতকরা ২৫ ভাগ মৎস্য আহরণ করা হয় হাওর থেকে। এখানে প্রায় এক লাখ ২৭ হাজার ৪৮২ হেক্টর মৎস্য চাষ ও আহরণের এলাকা রয়েছে। যেখানে প্রায় প্রতিবছর ৫৭ হাজার ১১৯ টন মাছ উৎপাদন হয়। দেশীয় প্রজাতির বিলুপ্ত প্রায় অনেক মাছ এখনও এই হাওরে টিকে আছে। এখানকার মিঠা পানির মাছ প্রায় ১৪৩ প্রজাতির। দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণে ৩০-৩৫ শতাংশ মাছের সরবরাহ আসে এই হাওরের পাললিক জলাশয় থেকে।
এই হাওরই লাখো প্রান্তিক কৃষক, জেলে ও খেটে খাওয়া মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু যখন হাওরে আগাম বন্যা বা দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দেয়, তখন বিপর্যয় কেবল ফসলহানিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় ভয়াবহ পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্য সংকটে। ২০১৭ সালের ভয়াবহ হাওর বিপর্যয়ের স্মৃতি এখনও মানুষের মনে তাজা। সেই বছর মার্চের শেষ দিকে পাহাড়ি ঢল ও অস্বাভাবিক বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা ও মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কাঁচা ও আধাপাকা বোরো ধান দীর্ঘদিন পানির নিচে ডুবে থাকায় সেগুলো পচে গিয়ে ভয়াবহ পরিবেশগত সংকট সৃষ্টি করে। পচনশীল ধানগাছ পানির নিচে জৈব অবক্ষয়ের মাধ্যমে অ্যামোনিয়া ও হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাস উৎপন্ন করে। একই সঙ্গে পানির দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়। ফলে মাছ ও জলজ প্রাণীর জন্য পানিতে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা সে সময় জানিয়েছিলেন, পানির স্বাভাবিক পিএইচ মাত্রা ৭ থেকে নেমে অনেক স্থানে ৩ থেকে ৪-এ পৌঁছে যায়, অর্থাৎ পানি অস্বাভাবিকভাবে অ্যাসিডিক হয়ে পড়ে। এর প্রভাব ছিল ভয়াবহ। দেশের জলজ জীববৈচিত্র্যের অন্যতম আধার ও মিঠাপানির মাছের প্রাকৃতিক প্রজননকেন্দ্র খ্যাত টাঙ্গুয়ার হাওর ও হাকালুকি হাওরসহ বিভিন্ন জলাভূমিতে টনকে টন দেশীয় মাছ মরে ভেসে ওঠে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ওই সময়ে ১ হাজার ২৭৬ টন মাছ দূষণে মারা গেছে। মাছ আর ধান হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন কৃষকরা। দূষিত পানি ও পচা খাদ্য খেয়ে অসংখ্য হাঁস মারা যায়। হাওরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র দুর্গন্ধ। মানুষের ব্যবহার উপযোগিতা হারায় পানি। ডায়রিয়া, আমাশয়, জন্ডিস ও চর্মরোগের ঝুঁকি বাড়ে।
সেই সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মৎস্য অধিদপ্তর হাওরের পানিতে চুন ও পটাশ ছিটায়। পানি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হয়। কোথাও কোথাও বিষাক্ত মাছ মানুষের খাদ্যচক্রে প্রবেশ ঠেকাতে মাছ ধরার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়েছিল। কিন্তু এত বড় পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রস্তুতি ছিল সীমিত, সমন্বয় ছিল দুর্বল, আর ক্ষয়ক্ষতি ছিল অপূরণীয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ২০২৬ সালে আবারও সেই একই সংকটের পূর্বাভাস দেখা যাচ্ছে। এবারের জলাবদ্ধতায় প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার টন বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার কৃষক সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনও পানির নিচে ডুবে আছে বিপুল পরিমাণ ধানগাছ।
স্বাভাবিক জলজ পরিবেশের জন্য পানির পিএইচ ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ দশমিক ৫-এর মধ্যে থাকা প্রয়োজন। এই মাত্রা ৬ দশমিক ৫-এর নিচে নেমে গেলে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য পানি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে পানির রঙ পরিবর্তন, দুর্গন্ধ এবং মাছের অস্বাভাবিক আচরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
অর্থাৎ পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে একটি আসন্ন পরিবেশগত দুর্যোগের দিকে ইঙ্গিত করছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হাওরজুড়ে ব্যাপক মাছের মড়ক, পানিদূষণ এবং জীববৈচিত্র্যের ভয়াবহ ক্ষতি দেখা দিতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংকট কেবল মাছের নয়; এটি পুরো হাওর বাস্তুতন্ত্রের সংকট। মাছ মারা গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হন জেলেরা। হাঁস মারা গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হন ক্ষুদ্র খামারিরা। পানি দূষিত হলে অসুস্থ হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। ব্যাঙ, সাপ, গুইসাপ, শামুক, দেশীয় মাছসহ বহু প্রাণী বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ে।
তাই এবার কেবল ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করলেই চলবে না; প্রয়োজন যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি। এখনই হাওরের পানি নিয়মিত পরীক্ষা করে দ্রবীভূত অক্সিজেন, অ্যামোনিয়া, সালফাইড ও পিএইচ মাত্রা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত চুন ও অন্যান্য উপযোগী উপাদান প্রয়োগ করতে হবে। মৎস্য, কৃষি, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত জরুরি টাস্কফোর্স গঠন করা জরুরি। একই সঙ্গে হাওরবাসীকে সচেতন করতে হবে যেন দূষিত পানি ব্যবহার বা মৃত মাছ খাওয়া থেকে বিরত থাকে। প্রয়োজন হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সাময়িক মাছ আহরণ নিষিদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি নিরাপদ খাবার পানি, চিকিৎসাসেবা ও গবাদিপশুর খাদ্য সহায়তার প্রস্তুতিও রাখতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হাওরকে আর শুধু মৌসুমি কৃষিজমি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি সংবেদনশীল জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্যের আধার। প্রতিবছর একই ধরনের বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটলেও যদি আগাম প্রস্তুতি না থাকে, তবে সেটি আর নিছক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; সেটি নীতিগত ব্যর্থতা ও অব্যবস্থাপনার প্রতিফলন।
২০১৭ সালের হাওর বিপর্যয় ছিল একটি সতর্কবার্তা। ২০২৬ সাল যেন সেই সতর্কবার্তার আরেকটি নির্মম পুনরাবৃত্তিতে পরিণত না হয়। কারণ হাওরে যখন ধান পচে, তখন শুধু ফসল নষ্ট হয় নাÑ ধীরে ধীরে বিষাক্ত হয়ে ওঠে পানি, বিপন্ন হয় প্রাণ, আর ক্ষয়ে যেতে থাকে একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।
রাসেল আহমদ
সাংবাদিক ও কলাম লেখক