দক্ষিণ গাজা উপত্যকার রাফাহতে গাজা মানবিক ফাউন্ডেশনের পাঠানো খাবারের ব্যাগ মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছেন এক ফিলিস্তিনি নারী। ছবি: এপি
আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে একটি কথা চিরসত্য ‘যুদ্ধক্ষেত্রে যা জেতা যায় না, আলোচনার টেবিলে তা আদায় করা অসম্ভব’। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে ইরান বিশ্বকে এক নতুন সমীকরণ দেখাল। তারা প্রমাণ করল, কেবল সামরিক শক্তি নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি, অনড় অবস্থান এবং ‘স্ট্রং পজিশন’ থেকে কথা বলার সাহস থাকলে আলোচনার টেবিলকেও রণক্ষেত্রের মতো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে ইরানের যে দরকষাকষি আমরা দেখলাম, তা কেবল একটি সাময়িক সমঝোতা নয়, বরং আগামীর বিশ্বব্যবস্থার এক নতুন ইশতেহার। ১২ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির দিকে তাকালে বোঝা যায়, এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা এখন আর ওয়াশিংটনের একক ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল নয়।
১. সাধারণত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক হুমকির মুখে থাকা দেশগুলো আলোচনার টেবিলে বসে কিছুটা নমনীয় হয়ে থাকে। কিন্তু ইরান তার উল্টোটা করেছে। তারা প্রমাণ করেছে, তারা আলোচনায় এসেছে নিজেদের প্রয়োজনে নয়, বরং বিশ্বশান্তি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনে। ট্রাম্প প্রশাসনের অনুরোধে পাকিস্তানে আয়োজিত এই বৈঠকটি ইরান নিয়ন্ত্রণ করেছে প্রথম থেকেই।
প্রথমত, তারা কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করেনি। নিউক্লিয়ার থ্রেটের মতো স্পর্শকাতর বিষয়েও তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে শর্তহীন কোনো আলোচনা হবে না। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে ইরানের ১০ পয়েন্ট দাবির ভিত্তিতে আলোচনার প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করা ছিল তেহরানের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক বিজয়। এটি কেবল একটি প্রতিশ্রুতি ছিল না, বরং ছিল আমেরিকার দীর্ঘদিনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির পরাজয়।
২. ইরানের এই শক্তিশালী অবস্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় যে ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ারটি কাজ করেছে, তা হলো হরমুজ প্রণালী। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথটি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী। প্রতিদিন বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ইরানের জন্য এটি কেবল একটি ভৌগোলিক রেখা নয়, বরং এটি তাদের অস্তিত্বের ‘লাইফলাইন’ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস।
নেগোশিয়েশন টেবিলে ইরানের এই যে ‘নো কম্প্রোমাইজ’ মনোভাব, তার নেপথ্যে ছিল হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। ইরান জানে, যদি এই অঞ্চলে কোনো বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হয় এবং তারা যদি এই প্রণালীটি বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি মহাসংকটে পতিত হবে। তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং পশ্চিমের উন্নত দেশগুলো চরম জ্বালানি সংকটে পড়বে। ট্রাম্প প্রশাসন যখন আলোচনার জন্য মরিয়া হয়ে পাকিস্তানকে অনুরোধ পাঠাচ্ছিল, তখন পর্দার আড়ালে এই হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তাই ছিল আমেরিকার প্রধান দুশ্চিন্তা। ইরান এই অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তাদের কূটনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে।
নেগোশিয়েশনে ইরান যে পেশাদারত্ব দেখিয়েছে, তা মুসলিম বিশ্বের জন্য এক বড় শিক্ষা। আমেরিকান প্রতিনিধি দল পাকিস্তানে পৌঁছে অপেক্ষা করলেও ইরান ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের প্রতিনিধি পাঠায়নি, যতক্ষণ না লেবাননে হামলা বন্ধ এবং তাদের ফ্রিজ হওয়া ৬ বিলিয়ন ডলার অবমুক্ত করার সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত টেবিলে না বসার এই যে দৃঢ়তা, তা মূলত প্রতিপক্ষকে বার্তা দেয় যে ‘আমরা তোমাদের সমকক্ষ, তোমাদের অনুগত নই।’ এটি কেবল অর্থের বিষয় ছিল না, এটি ছিল জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার লড়াই। এই ৬ বিলিয়ন ডলার উদ্ধার করা ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্য যেমন স্বস্তিদায়ক, তেমনি এটি আমেরিকার আর্থিক নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতাকে বিশ্ববাসীর সামনে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ ছিল ইরানের ৮৬ সদস্যের প্রতিনিধি দলটি। সেখানে কেবল রাজনীতিবিদ বা কূটনীতিক ছিলেন না; ছিলেন পরমাণু বিজ্ঞানী, আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। এর গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। ইরান কেবল ‘কথা বলতে’ যায়নি, তারা ‘চুক্তি করতে’ গিয়েছিল, যেখানে কোনো কারিগরি ফাঁকফোকর থাকবে না।
একজন পরমাণু বিজ্ঞানীর উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে, নিউক্লিয়ার ডিল নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা রাখা হবে না। আইন বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন, চুক্তির প্রতিটি শব্দ যেন ইরানের স্বার্থ রক্ষা করে। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের উপস্থিতি ছিল অর্থনৈতিক গ্যারান্টি নিশ্চিত করার জন্য। এই ধরনের সর্বাত্মক প্রস্তুতিই নিশ্চিত করেছে, কোনো প্রলোভন বা কূটকৌশল দিয়ে তাদের প্রতারিত করা সম্ভব নয়।
৩. ১২ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য আমূল বদলে গেছে। একসময় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে যে স্থায়ী শত্রুতা দেখা যেত, তা এখন কৌশলগত সহযোগিতায় রূপ নিচ্ছে। আমেরিকান প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে এসে আঞ্চলিক শক্তিগুলো এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করার পথে হাঁটছে।
পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় আমরা দেখতে পাচ্ছি ‘মাল্টি-পোলার’ বা বহুমুখী শক্তির উত্থান। এখানে ডলারের একক আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে। ইরান যেভাবে নিজেদের অর্থ ছাড় করিয়ে নিল এবং চীন ও রাশিয়ার সাথে তাদের কৌশলগত সম্পর্ককে আলোচনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করল, তাতে বোঝা যায়, বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এখন আর কল্পনা নয়, বাস্তবতা। মধ্যপ্রাচ্য এখন আর কেবল জ্বালানি সরবরাহের আধার নয়, বরং বৈশ্বিক কূটনীতির স্নায়ুকেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানের এই বুদ্ধিবৃত্তিক কূটনীতি কেবল তাদের নিজেদের জয় নয়, এটি পুরো অঞ্চলের জন্য শান্তির একটি সম্ভাব্য ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
১. এই জলপথটি যেহেতু বৈশ্বিক লাইফলাইন, তাই এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানসহ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে একটি ‘জয়েন্ট সিকিউরিটি কো-অপারেশন’ চুক্তি হতে হবে। বাইরে থেকে আসা নৌবহর এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ায়, তাই আঞ্চলিক দেশগুলোর হাতেই এর দায়িত্ব থাকা উচিত।
২. মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশকে একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান জানানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। ইরান যেভাবে সম্মানের সাথে আলোচনার টেবিলে আমেরিকাকে বসিয়েছে, সেই একই পারস্পরিক শ্রদ্ধা অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর মধ্যেও থাকা প্রয়োজন।
৩. বাইরের শক্তির (যেমন আমেরিকা বা ইউরোপ) ওপর সামরিক নির্ভরতা কমিয়ে একটি ‘মিডল ইস্ট সিকিউরিটি অ্যালায়েন্স’ গঠন করা প্রয়োজন। যেখানে তুরস্ক, সৌদি আরব, ইরান এবং মিসর নেতৃত্ব দেবে। আঞ্চলিক সমস্যা সমাধানে স্থানীয় সংবেদনশীলতাকে প্রাধান্য দিতে হবে।
৪. মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক বাধা দূর করতে হবে। ইরানের ফ্রিজ হওয়া ফান্ড যেভাবে মুক্ত হলো, তেমনি ফিলিস্তিন, ইয়েমেন বা সিরিয়ার পুনর্গঠনে একটি সম্মিলিত আঞ্চলিক ফান্ড গঠন করতে হবে। অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতা যুদ্ধের সম্ভাবনাকে ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসে।
৫. ইরানের ১০ দফা দাবির মধ্যে ফিলিস্তিন ইস্যু সবসময়ই কেন্দ্রীয়। স্থায়ী শান্তি ততক্ষণ আসবে না, যতক্ষণ না ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে। ইরান যেভাবে লেবাননে হামলা বন্ধের শর্ত দিয়ে টেবিল নিয়ন্ত্রণ করেছে, ঠিক একইভাবে ফিলিস্তিন ইস্যুতেও মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধভাবে শর্তারোপ করতে হবে।
৬. ইরানের ৮৬ সদস্যের প্রতিনিধিদলের মডেল অনুসরণ করে প্রতিটি মুসলিম রাষ্ট্রকে তাদের কূটনীতিতে বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী এবং বুদ্ধিজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আবেগের বদলে তথ্যের ভিত্তিতে কথা বললে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গ্রহণযোগ্যতা ও দর কষাকষির ক্ষমতা উভয়ই বৃদ্ধি পায়।
ইরানের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করেছে, বিশ্বব্যবস্থা এখন আর একক কোনো মোড়লের হুকুমে চলে না। বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য, সঠিক প্রস্তুতি এবং হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত সম্পদকে কাজে লাগিয়ে যেকোনো পরাশক্তিকে আলোচনার টেবিলে নামিয়ে আনা সম্ভব। চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত টিকবে কি না, তা সময়ের ব্যাপার; কিন্তু ইরান যে ‘নেগোশিয়েশন টেবিল’ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আর বুদ্ধিমত্তা দেখাল তা থেকে বর্তমান মুসলিম বিশ্বের অনেক কিছু শেখার আছে।
২০২৬-এর এপ্রিল-পরবর্তী বিশ্ব হবে মেধার বিশ্ব। মধ্যপ্রাচ্যকে যদি চিরস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে মুক্তি দিতে হয়, তাহলে ইরানের এই ‘পাওয়ার গেম’ বা শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোকে বুঝতে হবে যে, ডেস্পারেশন নয়, বরং জ্ঞান, কৌশল এবং নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক শক্তির (যেমন হরমুজ প্রণালী) সঠিক ব্যবহারই পারে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও জাতীয় সম্মান ফিরিয়ে আনতে। আজ ইরান যা করে দেখাল, কাল যদি পুরো মধ্যপ্রাচ্য সেই বুদ্ধিবৃত্তিক পথ অনুসরণ করে, তাহলে বিশ্বব্যবস্থার মানচিত্র নতুন করে আঁকা হবে যেখানে অধিকার থাকবে শোষিতের হাতে, আর নিয়ন্ত্রণ থাকবে ন্যায়ের পক্ষে।
শাহাব উদ্দিন মাহমুদ
কলাম লেখক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক