আবু জুবায়ের
প্রকাশ : ১২ মে ২০২৬ ১০:২৯ এএম
ফাইল ফটো
রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব এবং লোকপ্রশাসনের তাত্ত্বিক কাঠামোতে রাজনীতি হলো একটি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ, জনকল্যাণ এবং সুশাসন নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। তবে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের সমকালীন বাস্তবতায়, রাজনীতির এই ধ্রুপদী সংজ্ঞা প্রায়শই তার প্রাসঙ্গিকতা হারায়। এখানে রাজনীতি রূপান্তরিত হয়েছে এক অন্তহীন রঙ্গমঞ্চে, যেখানে আদর্শ ও নীতির শূন্যস্থান পূরণ করে নিয়েছে নানাবিধ ‘ছলেবলে কৌশল’, চাতুর্য, পরিহাস এবং বাস্তবতাকে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার এক অভিনব শিল্প। এই রঙ্গমঞ্চের কুশীলবরা কেবল ক্ষমতার পালাবদলের খেলায় মত্ত নন; বরং তারা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রম বা ‘ইলিউশন’ তৈরি করেন, যেখানে কৌতুক ও প্রহসনের আড়ালে রাষ্ট্রের গভীর সংকটগুলোকে ধামাচাপা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাত্যহিক আচরণ, বাগাড়ম্বর এবং রাজনৈতিক বয়ান বিশ্লেষণ করলে অত্যন্ত মজাদার কিন্তু হতাশাজনক কাঠামোগত প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়। রাষ্ট্রের যেকোনো জাতীয় সংকট তা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি হোক, সড়ক দুর্ঘটনায় লাশের মিছিল হোক, কিংবা নিজ দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংঘাত হোক ক্ষমতাসীনদের কাছে এর একটিমাত্র পূর্বনির্ধারিত শ্লোক রয়েছে : ‘সরকারকে বিব্রত করার জন্য বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র’। পেঁয়াজ বা চালের দাম আকাশচুম্বী হলে কিংবা ডেঙ্গুর প্রকোপে জনজীবন বিপর্যস্ত হলেও, কাঠামোগত ত্রুটি বা বাজার ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা খোঁজার বদলে অদৃশ্য ষড়যন্ত্রকারীদের সন্ধান করা হয়। এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর জন্য এক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে, যা তাদের যেকোনো জবাবদিহিতা থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়।
অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক বয়ানও সেই একই বৃত্তে ঘুরপাক খায়। দেশের যেকোনো প্রান্তে কোনো ঘটন্-দুর্ঘটনা ঘটলে, এমনকি কোনো সাধারণ নাগরিকের পেটের পীড়া হলেও তারা এর জন্য সরকারের সার্বিক ব্যর্থতাকে দায়ী করে এবং অবিলম্বে সরকারের পদত্যাগের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে। এই মানসিকতা কেবল চায়ের কাপের আড্ডার কোনো সস্তা কৌতুক নয়; রাজনৈতিক জবাবদিহিতা এড়ানোর এবং সমাজকে বিভাজিত করার সুচিন্তিত কৌশল। যখন কোনো সুনির্দিষ্ট জাতীয় সমস্যার কাঠামোগত সমাধান খোঁজার বদলে ষড়যন্ত্রের ধুয়া তোলা হয়, তখন মূল সমস্যাটি জনচক্ষের আড়ালে চলে যায়। এর ফলে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে তা াারও গভীর সংকট তৈরি করে।
এ সুযোগে সংবাদমাধ্যমগুলোও এক ধরনের 'টার্গেট মার্কেটিং' বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক বিপণন মডেলে খবর পরিবেশন করতে শুরু করে। যেহেতু রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী পাঠক বা শ্রোতারা এখন আর বস্তুমুখী সৎ ও নিরপেক্ষ খবর পছন্দ করেন না, তাই পরিবেশিত খবর তারা সহজেই গ্রহণ করেন। এর ফলে সামাজিক সমস্যা বা দুর্নীতি-অপরাধ সংক্রান্ত খবর গুরুত্ব পায় না। ফলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে সবার অলক্ষ্যেই দুর্লঙ্ঘ্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।
প্রখ্যাত সাংবাদিক-সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ তাঁর সুদীর্ঘ জীবনে এই উপমহাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংকটময় রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তাঁর রচিত কালজয়ী গল্পগ্রন্থ 'আয়না' এবং 'ফুড কনফারেন্স' তৎকালীন সমাজ ও রাজনীতির এক নিখুঁত ব্যঙ্গাত্মক দলিল; যা আশ্চর্যহনকভাবে আজও প্রাসঙ্গিক। 'আয়না' গল্পে ধর্মব্যবসায়ী ও অন্যান্য গল্পে ভণ্ড রাজনৈতিক নেতাদের মুখোশের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা শঠতার স্বরূপ উন্মোচন করেছিলেন। তাঁর 'হুযুর কেবলা' গল্পে সমাজে জেঁকে বসা তথাকথিত পীরপ্রথার যে কুৎসিত দিক ফুটে উঠেছে, তা আজকের সমাজেও সমানভাবে দৃশ্যমান।
রাজনৈতিক চেতনা, মতাদর্শ বা দাবিকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো স্লোগান। একটি স্লোগান পারে ইতিহাস বদলে দিতে, পারে মানুষের বুকের ভেতরের জমে থাকা ক্ষোভকে দাবানলে পরিণত করে অন্যায়-অসত্যকে ভষ্ম করে দিতে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্লোগান তার বিশেষত্ব হারিয়ে কীভাবে চটুল, আক্রমণাত্মক এবং চরম অসভ্যতায় বিকৃত রূপ ধারণ করেছে, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' নূরুল আমিনের কল্লা চাই’, ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে ‘আইয়ুব-মোনেম দুই ভাই, এক রশিতে ফাঁসি চাই’ ১৯৭১ সালে 'বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো' স্লোগানগুলো ছিল এদেশের মানুষের মুক্তি-আকাঙ্ক্ষার বাঙ্ময় প্রকাশ। নব্বইয়ের দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও স্লোগানের এই বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক আবেদন অক্ষুন্ন ছিল। শহীদ নূর হোসেনের বুকে-পিঠে লেখা 'স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক' অথবা 'এক দফা এক দাবি, এরশাদ তুই কবে যাবি' স্লোগানগুলো গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিককালে স্লোগানের এই বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গাটি দখল করেছে অশালীনতা, ব্যক্তি-আক্রমণাত্মক সব বাক্য।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজনৈতিক কর্মীদের দ্বারা 'অমুক ভাইয়ের চরিত্র, ফুলের মতো পবিত্র' ধরনের চাটুকারিতামূলক স্লোগানও একসময় বেশ জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ চরিত্রের নেতারাও যখন এই স্লোগান ব্যবহার করতে শুরু করেন, তখন সৎ রাজনীতিকরা এর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং সাধারণ মানুষের কাছে এটি একটি কৌতুককর উপাদানে পরিণত হয়। স্লোগানের এই অবক্ষয় আসলে সামগ্রিক রাজনৈতিক চিন্তার অবক্ষয়েরই প্রতিচ্ছবি। তরুণ প্রজন্মের মুখে যখন "টিনের চালের কাউয়া, …." জাতীয় স্লোগান শোনা যায়, তখন বুঝতে হবে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মীদের আদর্শিক শিক্ষা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। রাজনীতি যখন মেধা, দর্শন ও জনকল্যাণের পথ ছেড়ে কেবল পেশিশক্তি ও অন্ধ অনুকরণের পথে হাঁটে, তখন স্লোগানও পরিণত হয় সস্তা বিনোদন এবং সহিংসতার উসকানিমূলক উপাদানে।
রাজনীতির এই ছলে বলে কৌশলের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী এবং নীরব নিয়ন্ত্রক হলো দেশের আমলাতন্ত্র। কৈশোরে নচিকেতার 'আমি সরকারি কর্মচারী' গান শুনে যাঁদের মনে আমলাতন্ত্রের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হয়, কালের পরিহাসে তারাই যখন সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন, তখন সিস্টেমের জাঁতাকলে তাদের মনস্তত্বেও পরিবর্তন আসে। প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে (Foundation Training) আইনকানুন শেখানোর পাশাপাশি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে আচরণের শিক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু এই ক্লাসগুলো নিতে যখন প্রভাবশালী আমলারা তাদের জাঁকজমকপূর্ণ প্রটোকল, দামি গাড়ি এবং গার্ড অব অনার নিয়ে হাজির হন, তখন নতুন কর্মকর্তারা জনসেবার ব্রত ভুলে ভবিষ্যতে একই রকম সম্মান ও প্রভাব-প্রতিপত্তির মালিক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হন।
আমলাতন্ত্রের সবচেয়ে হাস্যকর ও বিড়ম্বনাপূর্ণ দিকটি উন্মোচিত হয় 'সত্যায়ন' বা Attestation প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো কিছুতেই বিশ্বাস নেই বলে দেশের প্রতিটি নাগরিককে তার জন্ম, শিক্ষা এবং অস্তিত্বের প্রতিটি সনদ প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা দ্বারা সত্যায়িত করতে হয়। একজন জীবিত, শ্বাস নেওয়া মানুষকে প্রমাণ করতে হয় যে, তিনি সত্যিই অস্তিত্বশীল। আর সেই প্রমাণের জন্য প্রয়োজন হয় একজন কর্মকর্তার সিল ও স্বাক্ষর। এই সত্যায়নের জন্য সাধারণ মানুষকে যে পরিমাণ হয়রানির শিকার হতে হয়, তা যেকোনো স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গাত্মক সাহিত্যকে হার মানায়।
একজন সরকারি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনায় দেখা যায়, কীভাবে একজন প্রবাসী বাংলাদেশি এমআরপি পাসপোর্টের জন্য কাগজপত্র সত্যায়িত করতে গিয়ে দিনের পর দিন হয়রানির শিকার হয়েছেন। অন্য দপ্তরে কর্মকর্তারা যখন চা পান বা পত্রিকা পড়ায় ব্যস্ত থেকে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছেন, তখন একজন সংবেদনশীল কর্মকর্তার সামান্য একটু মানবিক আচরণ ও মূল্যায়নে সেই প্রবাসী ভদ্রলোক আবেগপ্রবণ হয়ে কাঁদতে শুরু করেন। প্রবাসীরা, যারা তাদের রেমিট্যান্স দিয়ে দেশের অর্থনীতি সচল রেখেছেন, তারাই নিজ দেশে সরকারি দপ্তরে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত।
বর্তমানে রাষ্ট্রের রাজনীতি আর কেবল রাজনীতিবিদদের একক নিয়ন্ত্রণে নেই; নানা কৌশলে আমলা এবং বিত্তশালীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। রাজনীতিবিদরা যখন নিজেদের মধ্যে কাদা ছোঁড়াছুড়িতে ব্যস্ত থাকেন, তখন ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু ধীরে ধীরে আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে স্থানান্তরিত হয়। ফলে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও অনেক সময় আমলাদের প্রটোকল, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং নথির মারপ্যাঁচের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন।
আমাদের সমাজের প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক একটি ক্ষুদ্র স্বৈরাচারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। পরিবারে যখন স্ত্রীর বা সন্তানের মতামতকে সম্মান না করে অভিভাবকের মত চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন সেই পরিবেশ থেকে উঠে আসা একজন ব্যক্তি যখন রাজনীতিতে যুক্ত হন, তখন তিনি স্বভাবতই ভিন্নমতের প্রতি চরম অসহিষ্ণু আচরণ করবেন। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের একজন উচ্চশিক্ষিত সাবেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক যখন রাজনৈতিক ক্ষোভে ভিন্ন জেলার মানুষকে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে আমাদের শিক্ষার্জন কেবল প্রাতিষ্ঠানিক খোলসমাত্র, এটি আমাদের মননকে উদার করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতি কোনো সরল রেখায় বা সুনির্দিষ্ট আদর্শিক পথে চলে না। এটি এমন এক জটিল মনস্তাত্বিক গোলকধাঁধা ও রঙ্গমঞ্চ, যেখানে আদর্শের চেয়ে হিসাব-নিকাশ বড় এবং প্রতিশ্রুতির চেয়ে অবস্থান পাল্টানোই প্রধান কৌশল। রাজনৈতিক দলগুলোর বাস্তবতাকে অস্বীকার করার প্রবল প্রবণতা, নিজেদের ভুল বিন্দুমাত্র স্বীকার না করে নিরন্তর প্রতিপক্ষকে দোষারোপ করার নীতি এবং সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে মেগা-উন্নয়নের বয়ান দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা, এ সবই এই রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশে পরিণত হয়েছে।
আবু জুবায়ের
কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক