সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১২ মে ২০২৬ ১০:১৪ এএম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হলের সামনের ফুটওভার ব্রীজ। ছবি: ফেসবুক থেকে
সরকারি কর্মকাণ্ডে অব্যবস্থাপনার বিষয়টি আমাদের দেশে নতুন নয়। এর কবলে পড়ে সরকারের বহু ভালো উদ্যোগ বিনষ্ট হয়, সৃষ্টি করে জনভোগান্তি। একই সঙ্গে শ্রাদ্ধ হয় রাষ্ট্রীয় তহবিলের। গতকালের ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’ এ তেমনি দুটি উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম পাতায় মুদ্রিত একটি ছবি সবারই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। রাজধানীর হাইকোর্ট মাজার থেকে বঙ্গবাজার যাওয়ার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হল সংলগ্ন ফুটওভার ব্রিজটি এতটাই জরাজীর্ণ অবস্থায় উপনীত হয়েছে যে, তা এখন ব্যবহারকারীদের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। ওভার ব্রিজটির স্টিলের পাটাতন ভেঙে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল গর্ত। একটু অসতর্ক হলেই পথচারীর মর্মান্তিক পরিণতি বরণ করার আশঙ্কা রয়েছে। দিনের পর দিন সেটা একই অবস্থায় থাকলেও এর নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন রয়েছে শীতনিদ্রায়। বোঝা যায়, কর্তৃপক্ষের এদিকে সময় বা নজর দেওয়ার ফুরসত নেই। শুধু ওই একটি ওভার ব্রিজ নয়, খোঁজ নিলে রাজধানীতে এমন বহুসংখ্যক ফুটওভার ব্রিজের সন্ধান পাওয়া যাবে, যেগুলো নগরবাসীর সুবিধা না বাড়িয়ে উৎপীড়নের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্মিত ফুটওভার ব্রিজগুলোর অধিকাংশ রাতের বেলায় ছিনতাইকারী-সন্ত্রাসীদের দখলে চলে যায়। কোনো পথচারী ওভার ব্রিজে উঠলে তাকে সর্বস্ব হারাতে হয় দুর্বৃত্তদের হাতে। কখনও কখনও দুষ্কৃতকারীদের বন্দুকের গুলি কিংবা ছোরার আঘাতের শিকার হতে হয়। রাত একটু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওভার ব্রিজগুলোর ওপর বসে মাদকসেবীদের জমজমাট আসর। তখন কোনো ভদ্রলোকের পক্ষে সেখান দিয়ে সড়ক পার হওয়া সম্ভব হয় না। পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবে ফুটওভার ব্রিজগুলো সমাজবিরোধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। শুধু মাদক সেবন নয়, ভাসমান যৌনকর্মীরাও ওগুলোকে তাদের আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে। সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, রাজধানীর এসব ফুটওভার ব্রিজে যদি সন্ধ্যার পর নিয়মিত পুলিশ টহলের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে পারে।
এটা অস্বীকার করা যাবে না, নিতান্ত বাধ্য না হলে কেউ রাজধানীর ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করেন না। এর নানাবিধ কারণ রয়েছে। তন্মধ্যে ব্রিজগুলোর নির্মাণজনিত ত্রুটি অন্যতম। ফুটওভার ব্রিজগুলো এতটাই সুউচ্চ যে, শিশু ও বৃদ্ধদের পক্ষে তা ব্যবহার কষ্টসাধ্য। যদিও হাতেগোনা কয়েকটিতে এস্কেলেটর লাগানো হয়েছে, তবে বাকি সবগুলোতে পায়ে হেঁটে উঠতে হয়। সচেতন ব্যক্তিদের অভিমত হলো, রাস্তা পারাপার নিরাপদ করতে হলে সব বয়সের মানুষ যাতে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে আগ্রহী হয়, সে ব্যবস্থা করা দরকার। প্রতিটি ফুটওভার ব্রিজে এস্কেলেটর সংযোজন করে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। পাশাপাশি যেসব বড় রাস্তায় সম্ভব সেগুলোতে আন্ডারপাস নির্মাণ করা হলে সমস্যা সমাধানে অগ্রগতি হবে।
একই দিনে আরও দুটি খবর সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে। একটি খবর এসেছে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা থেকে। অপরটি সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা থেকে। পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সংলগ্ন লতাচাপলি ইউনিয়নের ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সীমান্তবর্তী খালের ওপর নির্মিত একটি সেতু সংযোগ সড়কের অভাবে অব্যবহৃত পড়ে আছে চার বছর ধরে। প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে এলজিইডি নির্মিত ওই সেতুটি এলাকার মানুষের চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধুমাত্র দুই পাশের সংযোগ সড়কের অভাবে এলাকাবাসী এর সুফল পাচ্ছে না। অন্যদিকে সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগরের গড়মহল সড়কটি ২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়। তারপর কেটে গেছে ছয় বছর। কিন্তু বিধ্বস্ত সড়কটি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়ার গরজ বোধ করেনি কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের অর্থায়নে নির্মিত বাঁশের সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার গ্রামবাসী ও স্কুলের ছেলেমেয়েদের যাতায়াত করতে হচ্ছে। নিত্যদিনের এ ভোগান্তির অবসান কবে হবে, তা জানে না এলাকাবাসী। প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, সড়কটির প্রায় সাতশ ফুট জায়গা বিলীন হয়ে গেছে। সেখানে সৃষ্টি হয়েছে গভীর খাদ। সংস্কার করতে প্রচুর মাটি প্রয়োজন, তাই আপাতত বাঁশের সাঁকো দিয়ে পারাপারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
রাজধানীর ফুটওভার ব্রিজ ফোকলা হওয়া, পটুয়াখালীর কুয়াকাটার লতাচাপলি ইউনিয়নের ব্রিজের সংযোগ সড়ক নির্মিত না হওয়া এবং সাতক্ষীরায় বিধ্বস্ত সড়ক ছয় বছর ধরে মেরামত না হওয়া পরস্পর সম্পর্কযুক্ত নয়। তবে এ খবরগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও উদাসীনতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ নিঃসন্দেহে। বাস্তবায়ন ও তদারককারী কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের ঔদাসীন্যে সরকারের অনেক ভালো উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়। হতাশাজনক হলো, এ ধরনের অবহেলা-ঔদাসীন্যজনিত জনদুর্ভোগের খবর গণমাধ্যমে প্রচার-প্রকাশ হলেও কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে না। তারা বোধ করি ‘কানে তুলো গুঁজেছেন এবং চোখে ঠুলি এঁটে বসে দিন কাটাচ্ছেন। হাজারো সমালোচনা তাদের বিবেককে নাড়া দিতে পারে না। যে তিনটি খবর নিয়ে আজকের প্রতিদিনের বাংলাদেশের এই সম্পাদকীয় স্তম্ভ, তা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কতটা নাড়া দিতে পারবে আমরা জানি না। তবে এটা সত্যি যে, এসব অব্যবস্থাপনার কারণে সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হয়। এ বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী কর্তৃপক্ষ যত দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন ততই মঙ্গল।