× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মনুষ্যত্ব জাগ্রত হোক

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬ ১৩:১২ পিএম

আপডেট : ১১ মে ২০২৬ ১৩:২৫ পিএম

মনুষ্যত্ব জাগ্রত হোক

দেশে পারিবারিক বিরোধ ও সহিংসতা যেন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে, যা প্রায়শই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড বা আত্মহত্যার মতো ট্র্যাজিক ঘটনায় রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে, নারী ও শিশুরা এই সহিংসতার শিকার হচ্ছে বেশি। সহজ করে বললে নানা কারণে নিজ পরিবারেও নিরাপদ নয় নারী-শিশুরা।অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের খুব কাছের সদস্যের হাতেও নির্মমতার বলি হন তারা। সাম্প্রতিক সময়ে পারিবারিক কলহ, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, দাম্পত্য সংকট কিংবা অন্যকোনো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে খুন, আত্মহত্যা ও নৃশংস হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এমনকি ধর্ষণের মতো নৃশংসতা থেকে রেহাই  পাচ্ছেনা শিশুরা। প্রশ্ন হচ্ছেÑ কেন সমাজ সহিংস হয়ে উঠছে এবং এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ কী?

আরও পড়ুন: পারিবারিক বিরোধের বলি হচ্ছে নারী ও শিশুরা

সর্বশেষ গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ভাড়া বাসায় স্ত্রী, তিন শিশুসন্তান ও শ্যালকসহ পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ উঠেছে ফোরকান নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ঘটনার পর নিখোঁজ স্বামী ফোরকান মিয়া। এরই মধ্যে বগুড়া থেকে আসে আরেক বিভীষিকাময় খবর। সেখানে এক নবজাতককে গলা কেটে হত্যার পর পুকুরে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে মা ও সৎবাবার বিরুদ্ধে। একইভাবে ২৪ এপ্রিল কুমিল্লার লালমাইয়ে নিজ সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করে বাবা। কাপাসিয়ায় পাঁচজনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা দেশবাসীকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়, এটি সমাজে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা ও মানসিক অস্থিরতার ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি।

গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর ‘পারিবারিক বিরোধের বলি হচ্ছে নারী ও শিশুরা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম চার মাসের পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল, এই চার মাসে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৫ হাজার ৯৫৮টি। একই সময়ে হত্যা মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৪২টি। পুলিশ বলছে, এসব হত্যার বড় একটি অংশ পারিবারিক সহিংসতা, দাম্পত্য দ্বন্দ্ব, সম্পর্কগত সংকট কিংবা ঘরের ভেতরের বিরোধের সঙ্গে জড়িত। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ছিল ১ হাজার ২৮১টি। ফেব্রুয়ারিতে তা ১ হাজার ১৮১, মার্চে ১ হাজার ৪৮৫ এবং এপ্রিলে বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ১১টিতে। একই সময়ে হত্যার সংখ্যাও উদ্বেগজনক। জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চে ৩১৭ এবং এপ্রিলে ২৮৮টি হত্যা মামলা রেকর্ড হয়েছে। পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়Ñ শুধু নারী ও শিশু নির্যাতন নয়, অপহরণ, পুলিশ অ্যাসল্ট, চুরি, সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ, মাদক ও অন্যান্য অপরাধও ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে এপ্রিল মাসে মোট মামলা হয়েছে ১৭ হাজার ১৮০টি, যা চলতি বছরের প্রথম চার মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। পুলিশ বলছে, দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের অভ্যন্তরে নানান অনিয়ম-অঘটন ঘটলেও তা থানা-পুলিশ পর্যন্ত আসে না। যে কারণে হত্যা বা ভয়াবহ নির্যাতনের পর মামলা হলে তদন্তে উঠে আসে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধের তথ্য। তখন আর ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার সুযোগ থাকে না।

বলা বাহুল্য, দেশে সামাজিক বন্ধন ও পারিবারিক মূল্যবোধ একসময় ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু নগরায়ণ, অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব মানুষের ধৈর্য ও সহনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকে। ক্ষোভ, হতাশা কিংবা রাগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে মানুষ ভয়াবহ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক সহিংসতার পেছনে মানসিক অবসাদ ও সামাজিক চাপ বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার ঘাটতি। বিরোধ মীমাংসায় সামাজিক বা আইনি পদ্ধতির পরিবর্তে অনেকে প্রতিশোধের পথ বেছে নিচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে সালিশ ও মধ্যস্থতার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে ছোট বিরোধও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। একই সঙ্গে দেশে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক সহজলভ্য হওয়ায় সহিংসতার মাত্রা আরও বাড়ছে।

আমরা মনে করি, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ। পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে সহনশীলতা, সংলাপ ও মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে- যাতে মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ব জাগ্রত হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে হবে। উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত কাউন্সেলিং ও মনোসামাজিক সহায়তা সম্প্রসারণ জরুরি। পাশাপাশি পারিবারিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও স্থানীয় স্তরের নেতৃত্বের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

পারিবারিক নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুরা কার্যত সমাজের নিপীড়িত অংশ। এই সমস্যার সমাধান কেবল আইন বা প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সম্ভব নয়। বরং আমাদের মনোভাব ও পারিবারিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে। দৃঢ় করতে হবে পারিবারিক বন্ধন। সবচেয়ে বড় কথা, সহিংসতাকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক ভাবা যাবে না। সমাজে মতভেদ থাকবে, কিন্তু তার সমাধান কখনও রক্তপাত হতে পারে না। গাজীপুরের এই হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। এখনই যদি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একযোগে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে এ ধরনের নৃশংসতা আরও বাড়বে। আমরা চাই, বন্ধ হোক পারিবারিক সহিংসতা। আমরা মনে করি, মানবিক মূল্যবোধ পুনর্গঠন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই পারে এই অন্ধকার প্রবণতা দূর করতে।


সম্পাদকীয় 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা