× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হাওরে বন্যা নিয়ন্ত্রণই বড় চ্যালেঞ্জ

ড. মিহির কুমার রায়

প্রকাশ : ১০ মে ২০২৬ ১৩:১৮ পিএম

হাওরে বন্যা নিয়ন্ত্রণই বড় চ্যালেঞ্জ

হাওর বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল জলরাশি, যা বর্ষার চিত্র। যতদূর চোখ যায় পানি আর পানি। গ্রামগুলো যেন দ্বীপের মতো ভাসতে থাকে পানির ওপর। আবার শুকনো মৌসুমে যেদিকে চোখ যায় অবারিত সবুজের সমারোহ। সাধারণত সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার হাওরসমূহ নিয়ে হাওর অঞ্চল গঠিত, যেখানে রয়েছে ৬২টি উপজেলার ৫৪১টি ইউনিয়ন। হাওরজুড়ে শুধু ধান আর ধান। আবার বেষ্টিক অর্থনীতির মানদন্ডে হাওর অঞ্চল থেকে যে ধান উৎপাদন হয়ে চাল আকারে দেশের কেন্দ্রীয় স্টকে জমা হতো, যার আর্থিক মূল্য ৩ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। এটি দেশের জিডিপিতে একটা বড় প্রভাব ফেলে। কারণ দেশের সার্বিক উন্নয়নে হাওর অঞ্চল থেকে শতকরা ১৮ ভাগ চাল খাদ্য নিরাপত্তায় সংযোজন হয় এবং শতকরা ২২ ভাগ গবাদিপশু এই অঞ্চলে লালিত-পালিত হয়। মৎস্যভাণ্ডারে ভরপুর এই অঞ্চল দেশের আমিষের চাহিদা পূরণে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, চৈত্র-বৈশাখ মাস থেকে কৃষকরা একটা আতঙ্কের মধ্যে থাকে পাহাড়ি ঢলের বন্যার পানি কখন আসবে।

সম্প্রতি সিলেটে হাওরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ডুবে আছে ৩ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমির বোরো ধান। পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া কাঁচা ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। শত শত সেচযন্ত্র লাগিয়েও অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না। রাতের বৃষ্টি আবার ভরে দেয় হাওর। বুকভরা কষ্ট নিয়ে এখন গবাদিপশুর জন্য কোমরপানিতে নেমে ধান কেটে নৌকায় করে বাড়ি ফিরছেন কৃষক। চোখের সামনেই কৃষকের সারা বছরের খোরাকি স্বপ্নের ফসলের এই ক্ষতি মানতে পারছেন না তারা। সম্প্রতি সদর উপজেলার দেখার হাওরপাড়ের ইসলামপুর গ্রামে পানির নিচ থেকে কাঁচা ধান কেটে নৌকায় তোলার দৃশ্য দেখা যায়। তলিয়ে যাওয়া কাঁচা ধান গরু, ছাগলের খাবারের জন্য ব্যবহার করা হবে। আবার কেউ এই ধান সিদ্ধ দিয়ে চাল বের করার চেষ্টা করবেন। কৃষকদের অভিযোগ, হাওরে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় অধিকাংশ কৃষকের অপরিপক্ব কাঁচা ধান তলিয়ে যায়। তাদের ক্ষোভ- যদি হাওরের ফসল রক্ষাই না হলো, তা হলে ক্ষেত করে লাভ কী। এলাকায় বাঁধে কোনো স্লুইসগেট না থাকায় দেখার হাওরে বৃষ্টির পানিতে কৃষকের জমির আধাপাকা ধান তলিয়ে গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, অপরিকল্পিত বাঁধ কৃষকের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। জমিতে গলাসমান পানি। কৃষকের বাঁচার উপায় নেই। যে ধান কাটা হচ্ছে সেগুলো কিছুদিন পরে কাটলে পরিপক্ব হয়ে যেত। এলাকায় অন্তত ৫০০ সেচ যন্ত্র নিষ্কাশনে কাজ করছে। তবু সমাধান হচ্ছে না। ইতোমধ্যে জলাবদ্ধতায় অনেক কৃষকের ধান ডুবে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আগামী মৌসুমে সার বীজ সংকট দেখা দিতে পারে। এই মুহূর্তে হাওরে পরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ও স্লুইসগেট নির্মাণ জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। জানা গেছে ইতোমধ্যে, ৩ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমির ফসল ডুবে গেছে। এর মধ্যে হয়তো আংশিক উদ্ধার হবে।

সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলার, ৪২টি হাওরের প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়। এই ফসল রক্ষার জন্য প্রতিবছর এই কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ভাটির বুকে একটি কথা প্রচলিত আছে, বাঁধের জন্য যে পরিমাণ টাকা বরাদ্দ হয়, সেই টাকা ধাতব মুদ্রায় রূপান্তরিত করে বাঁধ দিলে তা ডুববে না। তারপরেও অধিকাংশ বছরই বাঁধ তলিয়ে যায়। কোনো কোনো বছর ভাগ্যবিধাতা সহায় হলে রক্ষা পায়। হাওরপাড়ের অনেক বাঁধই স্থায়ীভাবে নির্মাণ করা সম্ভব। বাঁধের ওপর স্থায়ী বসতি স্থাপন ও পর্যটন স্পট গড়ে তোলা সম্ভব। দেশের যেকোনো দুর্যোগে সেনাবাহিনীকে কাজে লাগাতে দেখা যায়। হাওরপাড়ের এই বাঁধের দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে দেওয়া যেতে পারে। নদীগুলো খননের ব্যবস্থা করা, কারণ পলি পড়ে নদীগুলো ভরাট হয়ে গেছে। মোটামুটি এই চারটি পদক্ষেপ নিলে হাওরপাড়ের মানুষের সমস্যা শতভাগ দূরীভূত হবে। আমরা জানি, ঢাকা শহরের একটি ফ্লাইওভারের জন্য শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। হাওরপাড়ের বাঁধের জন্য এককালীন বড় আকারের বরাদ্দ দিয়ে, কাজের সঠিক মান নিশ্চিত করতে পারলে হাওরবাসীর দুঃখ চিরতরে দূর হবে।

আবার অন্যদিকে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল এখন এক অপার সৌন্দর্যের বিস্তীর্ণ সবুজ গালিচা। দিগন্তজোড়া ইরি-বোরো ধানের মাঠে মৃদু বাতাস দোল খেয়ে যায়, আর সেই দোলায় যেন জেগে ওঠে কৃষকের সোনালি স্বপ্ন। জেলার ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, করিমগঞ্জ, তাড়াইল, নিকলী ও বাজিতপুরÑ এই সাতটি হাওরপ্রবণ উপজেলার ফসলি জমিতে এবারের বোরো মৌসুম যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। এবারের মৌসুমে কৃষকরা ব্রি ধান-৮৮, ৮৯, ৯২, ১০২, ১১৪, ৮১ এবং বিনা ধান-২৪ ও ৩৫সহ উন্নত জাতের উচ্চফলনশীল ধান আবাদ করেছেন। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কৃষকরা কেউ জমিতে সেচ দিচ্ছেন, কেউ সুষম সার প্রয়োগ করছেন, আবার কেউ রোগবালাই রোধে কীটনাশক ছিটাচ্ছেন। তাদের এই নিরলস পরিশ্রমে প্রতিটি ধানের চারা এখন একেকটি আশার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

এখন হাওরের কৃষককে প্রকৃতি-নির্ভর না হয়ে সমস্যার আলোকে সমাধানের পথ খুঁজে বের করাই শ্রেয়। তবে প্রকৃতির চেয়েও কৃষকদের বড় দুর্ভোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষের তৈরি অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, জলাবদ্ধতা এবং উন্নয়নের নামে অবহেলা। ফলে হাওরবাসীর কান্না এখন শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের নয়, বরং নীতিনির্ধারণের ব্যর্থতার এক দীর্ঘ শোকগাথা। তাই স্থায়ী সমাধান হতে পারে-

১. হাওরপাড়ের অনেক বাঁধই স্থায়ীভাবে নির্মাণ করা সম্ভব। দেশের যেকোনো দুর্যোগে সেনাবাহিনীকে কাজে লাগাতে দেখা যায়। নদীগুলো খননের ব্যবস্থা করা, কারণ পলি পড়ে নদীগুলো ভরাট হয়ে গেছে। মোটামুটি এই পদক্ষেপ নিলে হাওরপাড়ের মানুষের সমস্যা শতভাগ দূরীভূত হবে। ঢাকা শহরের একটি ফ্লাইওভারের জন্য শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। হাওরপাড়ের বাঁধের জন্য এককালীন বড় আকারের বরাদ্দ দিয়ে, কাজের সঠিক মান নিশ্চিত করতে পারলে হাওরবাসীর দুঃখ চিরতরে দূর হবে।

২. হাওরে মানুষ যুদ্ধ করছে প্রকৃতির সাথে, যার সহযাত্রী হিসাবে থাকবে সরকারÑ এই উপলব্ধিটি প্রতিবছর বন্যায় তাদেরকে নূতন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। এখন সরকারের উচিত হবে এই অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর উপলব্ধির প্রতি সম্মান প্রদর্শনসহ জীবন মানের উন্নয়ন।

৩. আসন্ন বাজেটে এই অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়, খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন, সংস্কৃতি রক্ষা প্রভৃতি খাতে বিশেষ ব্যয় বরাদ্দ সংযোজন করা এবং এর সফল বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে দেওয়া।

৪. প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর দিকে বিশেষ নজর দেওয়া যেমন সময়ের আবর্তে পলি সংযোজিত হয়ে হাওরের জলাশয়গুলোর ভরাট হওয়ায় অল্প বর্ষায় প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি নিরসন এবং ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে এই জলধারাগুলোর নাব্যতা বৃদ্ধি, বাঁধ নির্মাণের টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহার, যার সাথে এই অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিবেশের সামঞ্জস্য থাকবে, পানি ব্যবস্থাপনায় এলাকার বাসিন্দাদেরকে সম্পৃক্ত করে কর্মপরিকল্পনা তৈরি, যা হবে একটি চলমান প্রক্রিয়।

৫. ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের পুনর্বাসনে সরকারি আয়োজনের পাশাপাশি বেসরকারি আয়োজন সমন্বিতভাবে করা, যাতে সেবা উপকরণ বিতরণে কোনো অভাবলোপন কিংবা ডুপলিকেটিং না হয়, যা হবে সম্পূর্ণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচালিত রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়।

৬. বন্যার পানি চলে যাওয়ার সাথে সাথে এই অঞ্চলে বর্ষা আসবে, যা হবে প্রায় ছয় থেকে সাত মাস স্থায়ী। এই  মৌসুমে হাওরবাসীর জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে, যেমনÑ যানবাহনের জন্য নৌকায় অর্থায়ন, মহিলাদের জন্য কুটিরশিল্পের ব্যবস্থ করা, জলায় হাঁস পালনে সহায়তা করা ইত্যাদি।


ড. মিহির কুমার রায়

উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও সমাজ গবেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা