মো. জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশ : ১০ মে ২০২৬ ১২:৫৭ পিএম
আপডেট : ১০ মে ২০২৬ ১২:৫৯ পিএম
প্রকৃতির কাছে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব মানুষ পৃথিবীতে আসে খালি হাতে, কিন্তু বেঁচে থাকে প্রকৃতির অমূল্য দানে। বিশুদ্ধ বাতাস, পানি, খাদ্য, ছায়া ও জীবনের উপযোগী পরিবেশÑ সবই আমরা প্রকৃতি থেকে পাই। তাই পৃথিবী থেকে বিদায়ের আগে একটি প্রশ্ন আমাদের ভাবতেই হবেÑ আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী রেখে যাচ্ছি? এই প্রশ্ন শুধু অর্থনৈতিক ঋণের নয়; এটি প্রকৃতির কাছ থেকে নেওয়া ঋণেরও প্রশ্ন। আমরা প্রতিদিন অক্সিজেন নিচ্ছি, গাছের ছায়া ব্যবহার করছি, কিন্তু প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দিচ্ছি কতটুকু? একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৫০ লিটার অক্সিজেন গ্রহণ করেন। ৭০ বছরের গড় আয়ু হিসেবে একজন মানুষের জীবনে প্রয়োজন হয় প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ লিটার অক্সিজেন। এই চাহিদা পূরণে অন্তত ১৭ থেকে ২০টি পূর্ণবয়স্ক গাছ প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ একজন মানুষ যদি জীবনে অন্তত ২০টি গাছ লাগিয়ে বড় করতে পারেন, তাহলে তিনি নিজের প্রকৃতিগত ঋণের একটি বড় অংশ শোধ করার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত নয়। পরিবারও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক সময় বাবা-মা
বা পূর্বসূরিরা পর্যাপ্ত গাছ লাগিয়ে যেতে পারেন না, আবার সন্তানরাও ভবিষ্যতে এই পৃথিবীর
ওপর নির্ভর করবে। তাই একজন সচেতন মানুষের উচিত পুরো পরিবারের হিসাব মাথায় রাখা। ধরুন
একটি পরিবারে বাবা, মা, স্বামী-স্ত্রী ও দুই সন্তান মোট ছয়জন সদস্য। তাহলে সেই পরিবারের
অক্সিজেনের চাহিদা বিবেচনায় অন্তত ১২০টি গাছ লাগানো যুক্তিসঙ্গত একটি লক্ষ্য হতে পারে।
এটি কোনো কঠিন বিষয় নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্বশীল পরিকল্পনা। আল্লাহ যদি সামর্থ্য
দেন, তাহলে আমাদের উচিত নিজের পাশাপাশি বাবা-মা ও সন্তানদের জন্যও গাছ লাগানো। এতে
মনে হবে প্রকৃতির কাছে জমে থাকা ঋণের কিছুটা হলেও আমরা শোধ করার চেষ্টা করেছি। এই উপলব্ধি
মানুষকে মানসিক প্রশান্তিও দেয়। আজ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশও বড় সংকটে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, বায়ুদূষণ, নদীভাঙন ও পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা প্রতিদিনের বাস্তবতা
হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে, উত্তরবঙ্গসহ
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। শহর হারাচ্ছে সবুজ, গ্রাম হারাচ্ছে
ছায়া। এই পরিস্থিতিতে গাছ লাগানো এখন শুধু পরিবেশ রক্ষার কাজ নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে
বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব। একটি গাছ শুধু অক্সিজেন দেয় না। এটি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ
করে, মাটির ক্ষয় রোধ করে, বৃষ্টিপাতের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয়
তৈরি করে। একটি গাছ মানে একটি জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থা। বাংলাদেশ সরকারের পাঁচ বছরে ২৫
কোটি গাছ রোপণের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে শুধু সরকারের ওপর নির্ভর
না করে সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, তরুণ সমাজ
ও পরিবারÑ সবাইকে এই সবুজ বিপ্লবে অংশ হতে হবে।
কবি কামিনী রায়ের সেই চিরন্তন বাণীÑ ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’Ñআজ পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রেও সমানভাবে সত্য। একদিন আমাদের সবাইকে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু যদি আমরা কিছু গাছ, কিছু সবুজ ছায়া এবং কিছু বিশুদ্ধ বাতাস রেখে যেতে পারিÑ তাহলেই হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে। তাই আসুন, আজই প্রতিজ্ঞা করিÑ নিজের জন্য, বাবা-মায়ের জন্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অন্তত কিছু গাছ লাগাব। প্রকৃতির কাছে মানুষের সবচেয়ে সুন্দর দায়শোধ হতে পারেÑ একটি সবুজ পৃথিবী রেখে যাওয়া।
পরিবেশ ও সমাজকর্মী এবং নির্বাহী পরিচালক, গোল্ডেন বাংলাদেশ