× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চিকিৎসা ব্যয়ে পিষ্ট মানুষ

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬ ১৬:২২ পিএম

চিকিৎসা ব্যয়ে পিষ্ট মানুষ

উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের উচ্চ খরচের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৬১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশই ভুক্তভোগীকে নিজের পকেট থেকে দিতে হচ্ছে। যার বেশিরভাগ ওষুধ এবং হাসপাতালে ভর্তির পেছনে খরচ হয়। স্বাস্থ্যসেবায় নানা উন্নয়ন ও সাফল্যের গল্প বলা হলেও বাস্তবে চিকিৎসা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের বিপুল অর্থ ব্যয়ের চিত্র বলছে অন্য কথা।

ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার সঞ্চয় হারাচ্ছে, ঋণগ্রস্ত হচ্ছে এমনকি নতুন করে দারিদ্র্যের জাঁতাকলে পড়ছে। গবেষণার এই তথ্যটি উদ্বেগজনক এবং দ্রুত সমাধানের দাবি রাখে।

গত বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিআইডিএস সম্মেলন কক্ষে ‘বাংলাদেশে অপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা চাহিদা ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয়ের পরিবর্তিত বাস্তবতা পুনর্বিবেচনা’ শীর্ষক সেমিনারে ভয়াবহ এই তথ্য উঠে আসে। উল্লেখ্য, গবেষণায় ১৪ হাজার ৪০০ পরিবার এবং ৬২ হাজার ৩৮৭ জন ব্যক্তির তথ্য বিশ্লেষণের কথা বলা হয়েছে।


গবেষণায় দেখা গেছে, একটি পরিবারকে গড়ে প্রতি মাসে ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করতে হয়, যা তাদের মোট ব্যয়ের ১০ শতাংশ। অনেক ক্ষেত্রে আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত চলে যাচ্ছে চিকিৎসায়। চিকিৎসাসেবায় গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্যও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ এলাকায় অপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবার হার ৬৫ শতাংশের বেশি, শহরে তা প্রায় ৫৯ শতাংশ। স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, চিকিৎসকের ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।


গবেষণায় বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ যাচ্ছে ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে একটি পরিবারকে গড়ে ২ হাজার ৩৪২ টাকা ব্যয় করতে হয়। ডায়াগনস্টিক পরীক্ষায় গড়ে ২ হাজার ৮১৪ টাকা এবং ওষুধে প্রায় ১ হাজার ২৮০ টাকা খরচ হয়। পরিবহন, চিকিৎসক ফি ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হলে মোট খরচ আরও বাড়ে। কিছু রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যয় আরও বেশি। ক্যানসার চিকিৎসায় একটি পরিবারের সর্বোচ্চ ব্যয় প্রায় ৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়েছে।


হৃদরোগে গড়ে প্রায় ১ লাখ টাকা এবং কিডনি রোগে গড়ে ৬৩ হাজার টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। এমনকি নিউমোনিয়া, টাইফয়েড বা দুর্ঘটনার মতো রোগের চিকিৎসায়ও কয়েক লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। শুধু তাই নয়, গবেষণায় স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা ও প্রাপ্তির মধ্যে বড় ফারাক লক্ষ করা গেছে। যাদের চিকিৎসা প্রয়োজন, তাদের বড় অংশই কার্যত সেবা থেকে বঞ্চিত থাকছে।

বলা বাহুল্য, স্বাস্থ্য খাত সমাজ ও রাষ্ট্রীয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য খাত। প্রতি বছর বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দও দেওয়া হয়। কিন্তু অগ্রগতির নানা সাফল্যের গল্পের আড়ালে উল্লিখিত খাতের পরিসংখ্যানটি নির্মম বাস্তবতা। এটি কেবল পরিসংখ্যানই নয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, সামাজিক বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাহীনতার এক গভীর প্রতিচ্ছবি।


বিস্ময়কর হচ্ছে, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সরকারি হাসপাতাল থাকলেও সেখানে প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা মানসম্মত সেবার প্রকট ঘাটতি রয়েছে। সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়েই বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের দ্বারস্থ হচ্ছে। যেখানে চিকিৎসা ব্যয় অনেকের সামর্থ্যের বাইরে। পরিবারের কোনো সদস্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হলে সেই পরিবারের অবস্থা তো আরও দুঃসহ। এই নির্মম বাস্তবতার সামনেই মানুষের জীবন। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের।


উন্নত দেশগুলোতে নাগরিকদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকলেও বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ জনগণকেই বহন করতে হয়। অপ্রিয় হলেও সত্য, আমাদের দেশে এখনও কার্যকর স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এই পরিস্থিতির জন্য শুধু স্বাস্থ্য বাজেটই নয়, স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাও দায়ী। সরকারি হাসপাতালের নানা অনিয়ম, চিকিৎসক সংকট, দালাল চক্র এবং নিম্নমানের সেবার কারণে মানুষ আস্থা হারাচ্ছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে চিকিৎসা ব্যয়ের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় হাসপাতালগুলো ইচ্ছামতো ফি নির্ধারণ করছে। এতে স্বাস্থ্যসেবা একটি মৌলিক অধিকার না হয়ে ব্যবসায় পরিণত হচ্ছে।


আমরা মনে করি, একটি দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার নাগরিকরা ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা পেতে নিঃস্ব বা বিড়ম্বনায় না পড়েন। চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে যদি লাখো মানুষ দরিদ্র হয়ে যায়, তবে সেই উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। তাই এখনই সময় স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মানুষের ‘অধিকার’ নিশ্চিত করার। রাষ্ট্রের উচিত দ্রুত স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। এই ক্ষেত্রে শুধু জেলা-উপজেলা নয়, ইউনিয়ন পর্যায়েও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা চালু, সরকারি হাসপাতালের সেবার মান বাড়ানো এবং বেসরকারি হাসপাতালের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি দরকার।


চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ চিকিৎসা ব্যয়ে পিষ্ট হচ্ছে, নিঃস্ব হচ্ছে। এই বাস্তবতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রাষ্ট্র, সমাজ ও বিত্তবানদের উচিত এই দরিদ্র মানুষদের পাশে দাঁড়ানো। আমরা মনে করি, মানবিক ও কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে এই দারিদ্র্যসীমার সংখ্যা আরও বাড়বে। তাই এখনই প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা