× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

ড্রেন ও ম্যানহোল যেন মৃত্যুফাঁদ

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬ ১৫:৫৬ পিএম

ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তায় চলতে গিয়ে আমাদের কারও না কারও জীবনের গল্প হঠাৎ থেমে যাওয়ার উপক্রম হয়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তায় চলতে গিয়ে আমাদের কারও না কারও জীবনের গল্প হঠাৎ থেমে যাওয়ার উপক্রম হয়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তায় চলতে গিয়ে আমাদের কারও না কারও জীবনের গল্প হঠাৎ থেমে যাওয়ার উপক্রম হয়। ঝকঝকে তকতকে দালানের নিচেই যেন লুকিয়ে আছে এক মরণকামড়। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে বা অন্ধকার রাতে যখন নগরীর ড্রেন আর ম্যানহোলগুলো একেকটি অদৃশ্য গহ্বরে পরিণত হয়, তখন সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর আতঙ্ক ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। নাগরিক জীবনের এই অসহায়ত্বের গল্পগুলো আজ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নগরীর ব্যস্ত ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ করেই আপনার সামনে কোনো সতর্ক সংকেত ছাড়াই দেখা মিলবে একটি খোলা ম্যানহোলের মুখ। এই বিশাল গর্তগুলো যেন পথচারীদের গিলে খাওয়ার জন্য ওঁৎ পেতে থাকা এক একটি ভয়ংকর সুড়ঙ্গ।

অনেক সময় ড্রেনের ওপরের ঢাকনাগুলো ভেঙে পড়ে থাকে অথবা চুরি হয়ে যায়, যা গভীর গর্তের সৃষ্টি করে। এসব ঢাকনাবিহীন গর্তে পড়ে গিয়ে মানুষের হাত-পা ভাঙা থেকে শুরু করে চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার ঘটনা এখন নিয়মিত চিত্র।

বর্ষাকালে যখন সামান্য বৃষ্টিতে পুরো শহর হাঁটুসমান পানিতে ডুবে যায়, তখন রাস্তার ড্রেনগুলো পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে পড়ে। এই জলাবদ্ধতার সুযোগে পানির নিচে লুকিয়ে থাকা গর্তগুলো পথচারীদের জন্য এক প্রাণঘাতী মারণফাঁদে পরিণত হয়।

পৌরসভার অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক ড্রেন উপচে পড়া আবর্জনায় ঢাকা থাকে। বাইরে থেকে বোঝার উপায় থাকে না কোথায় ড্রেনের সীমানা শেষ আর রাস্তার শুরু, যার ফলে অসাবধানতাবশত পা দিলেই ঘটে মহাবিপদ।

ড্রেনের ধারের সরু হাঁটাপথগুলো অধিকাংশ সময় শ্যাওলা ধরে পিচ্ছিল হয়ে থাকে। সামান্য একটু ভারসাম্য হারালেই একজন মানুষ সরাসরি নোংরা পানির ড্রেনে গিয়ে পড়ে যেতে পারেন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। 

বৃষ্টির সময় ড্রেনগুলোর ভয়ংকর রূপ প্রকাশ পায়। প্রবল বর্ষণে যখন রাস্তাঘাট একাকার হয়ে যায়, তখন মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে এই উন্মুক্ত ড্রেনগুলোতে পড়ে তলিয়ে যায়। পানির তীব্র স্রোত ড্রেনের ভেতর এমন এক মরণটান তৈরি করে যে, একবার কেউ ভেতরে পড়লে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। স্রোতের টানে গভীর সুড়ঙ্গে তলিয়ে যাওয়া মানুষের হাহাকার আমাদের আকাশ-বাতাসকে ভারী করে তোলে।

রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোস্টগুলো অকেজো থাকায় পর্যাপ্ত আলোর অভাব দেখা দেয়। ঘুটঘুটে অন্ধকারে খোলা ম্যানহোল শনাক্ত করা কোনোভাবেই সম্ভব হয় না, যা মৃত্যুকে আরও ত্বরান্বিত করে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকে নিষ্পাপ শিশুরা। খেলার ছলে বা স্কুল থেকে ফেরার পথে অসাবধানতাবশত ড্রেনে পড়ে যাওয়ার কারণে অনেক মা-বাবার কোল খালি হয়ে যাওয়ার ট্র্যাজেডি এই নগরী বারবার দেখেছে।

শহরের অন্ধকার গলিগুলোতে বিপদ আরও বেশি। প্রধান সড়কগুলোতে কিছুটা নজরদারি থাকলেও ভেতরের গলিগুলোর ড্রেন প্রায় সব সময়ই ঢাকনাবিহীন অবস্থায় পড়ে থাকে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য এক নিত্য আতঙ্ক। সংস্কার কাজে চরম অবহেলা এই সংকটের মূল কারণ। একবার ড্রেন খুঁড়ে রাখলে মাসের পর মাস তা উন্মুক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়, যেন মানুষের নিরাপত্তার চেয়ে কাজ ফেলে রাখাই বড় বিষয়।

ড্রেনের ময়লা ও দূষিত পানি সংক্রমণের এক বড় উৎস। কেউ যদি সরাসরি ড্রেনে পড়ে যায়, তবে তাৎক্ষণিক আঘাতের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি চর্মরোগ বা পানিবাহিত মারাত্মক রোগের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা প্রতিটি দুর্ঘটনার পর ফুটে ওঠে। প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হলেও কাজের কাজ কিছুই হয় না, ফলে ড্রেনগুলো মৃত্যুকূপ হয়েই রয়ে যায়।

নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের ফলে ড্রেনের স্ল্যাবগুলো অল্প দিনেই ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। দুর্নীতির এই ফল সাধারণ মানুষকে নিজের জীবন দিয়ে ভোগ করতে হচ্ছে।

ঢাকনা চুরির এক বিরাট চক্র এই শহরে সক্রিয়। লোহার ঢাকনাগুলো চুরি করে বিক্রি করার ফলে যে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়, তা অনেক সময় কারও নজরে আসার আগেই অঘটন ঘটিয়ে ফেলে।

সরকারকে ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে মাস্টারপ্ল্যান নিতে হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করে প্রতিটি খোলা ম্যানহোল দ্রুত ভরাট বা ঢাকনা দেওয়ার জন্য বিশেষ বাজেট ও কঠোর নির্দেশনা জারি করতে হবে। সিটি করপোরেশনের প্রধান দায়িত্ব হলো নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন করা। প্রতিটি ড্রেন ও ম্যানহোলের জন্য ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং যেখানেই ঢাকনা ভাঙা বা নেই, সেখানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নতুন স্ল্যাব বসাতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ম্যানহোলের ঢাকনা চুরির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। ড্রেনের ঢাকনা যারা চুরি করে এবং যারা এগুলো ক্রয় করে, উভয় পক্ষকেই আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয় সরকার পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের নিজ নিজ এলাকার ড্রেনগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করতে হবে যারা প্রতিদিন ড্রেনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে এবং তাৎক্ষণিক সংস্কারের ব্যবস্থা নেবে।

জনসাধারণের করণীয় হলো নিজ নিজ এলাকার সমস্যাগুলো নিয়ে সোচ্চার হওয়া। কোথাও খোলা ম্যানহোল দেখলে সেখানে একটি ডাল বা লাল কাপড় বেঁধে সতর্ক সংকেত দেওয়া এবং দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ফোন করে জানানো।

আমাদের এই প্রিয় নগরীর ড্রেন ও ম্যানহোল যেন কারও জন্য শেষ ঠিকানা না হয়। একটি উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা কেবল পানি নিষ্কাশন নয়, বরং মানুষের নিরাপদে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। কর্তৃপক্ষ যদি আজই তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে এবং নাগরিকরা সচেতন হয়, তবে আগামী দিনে হয়তো আর কোনো সংবাদপত্রের পাতায় ‘ড্রেনে পড়ে প্রাণহানি'র খবর আমাদের দেখতে হবে না। এই প্রাণঘাতী উন্মুক্ত গর্তগুলো বন্ধ করে শহরকে একটি নিরাপদ আবাসস্থলে রূপান্তর করাই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার।


ড. মো. আনোয়ার হোসেন

কলাম লেখক ও সংগঠক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা