ইমেইল থেকে
এমদাদ হোসেন ভূঁইয়া
প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬ ১৫:২৯ পিএম
আপডেট : ০৯ মে ২০২৬ ১৫:৩০ পিএম
ক্লাস রুটিনে অন্যান্য সাবজেক্ট থাকলেও ‘গ্রন্থাগার বিজ্ঞান’ নেই। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
স্কুল আছে, গ্রন্থাগার আছে, গ্রন্থাগারিক আছেন, যিনি নিয়মিত বেতন-ভাতা পান, কিন্তু কার্যক্রম নেই, দ্যুতি (আলো) নেই, নিষ্প্রভ। গ্রন্থাগার পরিচালনার পরিবর্তে গ্রন্থাগারিককে রুটিনে অন্য ক্লাসে ‘এনগেজ্ড’ রাখা হয়। ফলে বছরের পর বছর গ্রন্থাগার অব্যবহৃত থাকে। বই, আলমারি ও চেয়ার-টেবিলে ধুলোর আস্তর জমে। এ নিয়ে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি (এসএমসি), প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, সিনিয়র শিক্ষক, জুনিয়র শিক্ষক কারও কোনো গরজ নেই, আগ্রহ নেই, মাথাব্যথা নেই। সবার এক কথা, লাইব্রেরি দিয়ে কী হবে, বই পড়ে কী হবে, শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবই পড়েই সময় পায় না, ‘বাড়তি বই’ পড়বে কখন? একশ্রেণির শিক্ষক ও অভিভাবকদের মুখে অহরহ এ কথা শোনা যায়। মহান স্বাধীনতার ৫৫ বছরের পরও এমন তো হওয়ার কথা ছিল না।
সঙ্গত কারণেই ক্লাস রুটিনে অন্যান্য সাবজেক্ট থাকলেও ‘গ্রন্থাগার বিজ্ঞান’ নেই। এ যেন ‘কাজির গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই’। এই ‘হ-য-ব-র-ল’ অবস্থা চলছে দেশের হাইস্কুল বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে। থানা শিক্ষা অফিস, জেলা শিক্ষা অফিস, শিক্ষা অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয়Ñ সবই আছে, কিন্তু এ বিষয়ে সঠিক তদারকি নেই। গ্রন্থাগার কার্যক্রম নিয়ে সমাজ, প্রশাসন, রাষ্ট্রের এমন উদাসীনতা পৃথিবীর আর কোনো দেশে আছে কি না, জানা নেই। এই ‘খরা’ কবে কাটবে, তাও আমার জানা নেই।
দেশে বেসরকারি জুনিয়র হাইস্কুল ২ হাজার ৩৬৯, বেসরকারি মাধ্যমিক হাইস্কুল ১৫ হাজার ৯১১, স্কুল অ্যান্ড কলেজে স্কুল সেকশন ১ হাজার ৩৮২, সরকারি ৬৪টি, আপগ্রেডেড সরকারি প্রাইমারি ৬৫০। সর্বমোট মাধ্যমিক স্কুল ২১ হাজার ৩টি।
ম্যধ্যমিক স্কুলে ‘একাডেমিক লাইব্রেরি’ বা ‘শিক্ষায়তন গ্রন্থাগার’ থাকতে হবে। সেখানে কমপক্ষে ২ হাজার বই থাকতে হবে। পাঠদানের অনুমতি গ্রহণ, স্বীকৃতি লাভের সময় এটা বাধ্যতামূলক। নির্দিষ্ট সময় অন্তর স্বীকৃতি নবায়নের ক্ষেত্রেও বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়। বইয়ের সংখ্যা যত বাড়বে, গ্রন্থাগার তত সমৃদ্ধ হবে। ২০১০ সালে তৎকালীন সরকার মাধ্যমিক স্কুলে ‘গ্রন্থাগারিক পদ’ সৃষ্টি করে। পদটি ‘এমপিওভুক্ত’। গ্রন্থাগারিক পদকে অনেকেই অবমূল্যায়ন করেন। এ নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন গ্রন্থাগারিকরা। তারা পদবি পরিবর্তনের দাবি তোলেন। এবার সাবজেক্টের নাম ও গ্রন্থাগারিক পদবি পরিবর্তন করে রাখা হয় যথাক্রমে ‘গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান’ ও সহকারী শিক্ষক (গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান)।
এতে গ্রন্থাগারিকদের ভাষায় তাদের অসম্মান (!) হয়তো ঘুচেছে, কিন্তু সুবিধা হয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষের, আর ক্ষতি হয়েছে গ্রন্থাগার কার্যক্রমের। সহকারী শিক্ষক (গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান) এখন শিক্ষার্থীদের অন্যান্য সাবজেক্টের ক্লাস নিয়ে থাকেন। তাদেরকে এভাবেই কাজে লাগানো হয়। কোনো শিক্ষক ছুটিতে বা কোনো কারণে অনুপস্থিত থাকলে তারা ‘প্রক্সি ক্লাস’ও নিয়ে থাকেন। সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে ‘পড়ুয়া সুনাগরিক’ তৈরির সম্ভাবনাময় একটি ‘সেক্টর’ যুগ যুগ অপাঙ্ক্তেয় পড়ে আছে।
স্কুলে সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিন (শুক্র-শনি), কর্মদিবস ৫ দিন, রবি-বৃহস্পতিবার। শিক্ষার্থীদের গ্রন্থাগারমুখী করতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক। যেমন :-
(ক) রুটিন: ‘গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান’ ক্লাস রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ ব্যাপারে বোর্ডের নির্দেশনাও আছে। পরিপালন করা জরুরি। কর্মদিবসে প্রতিটি ক্লাস/শাখা যেন ‘গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান ক্লাস’ পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য দৈনিক ক্লাসের সংখ্যা ৭টির পরিবর্তে ৮টি করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে।
(খ) পাঠচক্র: নির্দিষ্ট বই ধরে পাঠচক্র চালু করা যেতে পারে। পঠন-পাঠন, কথন-লিখন প্রক্রিয়ায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীদের উপহার (বই) দেওয়া যেতে পারে। উপস্থাপনা কৌশল, বিতর্ক, আবৃত্তি, সাধারণ জ্ঞান, সুন্দর হাতের লেখা প্রভৃতি প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে পুরস্কার দেওয়া যেতে পারে।
(গ) পুরস্কার অবশ্যই বই: পুরস্কার সামগ্রী হিসেবে গ্লাস, জগ, কাপ, পিরিচ, পেয়ালা, তোয়ালে তথা গৃহস্থালি তৈজসপত্র নয়, অবশ্যই বই দিতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
(ঘ) ম্যাগাজিন ও বই: গ্রন্থাগারে অন্তত একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা রাখতে হবে। এ ছাড়া শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞান ও সাধারণ জ্ঞান বিষয়ক ম্যাগাজিন রাখতে হবে। সময় ও চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে নিয়মিত নতুন বই-ম্যাগাজিন সংযোজন করতে হবে। বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করে কমিটির মাধ্যমে অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে। প্রতি মাসে বা তিন মাস অন্তর বই কিনতে হবে। মহান একুশে বইমেলা পরিদর্শনে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
(ঙ) কোর্স চালু: স্কুল পর্যায়ে ‘গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান’ সাবজেক্ট চালু করতে হবে। এটা ফোর্থ সাবজেক্ট বা চতুর্থ বিষয়ও হতে পারে। তাহলে শিক্ষার্থীদের মাঝে আজীবন বইপড়ার অভ্যাস গড়ে উঠবে।
(চ) সেরা পাঠক: মাসের সেরা পাঠক-পাঠিকা (শিক্ষক-শিক্ষার্থী) নির্বাচন করে তাদেরকে পুরস্কার দিতে হবে।
(ছ) বিবিধ: বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বিজ্ঞান জাদুঘর, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, পরিবেশ অধিদপ্তর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের বিভিন্ন সময়ে নানান প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। এসব প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থী (প্রতিযোগী) পাঠাতে হবে।
এমদাদ হোসেন ভূঁইয়া
গ্রন্থাগার সংগঠক, বেরাইদ, ঢাকা