নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬ ১২:১৭ পিএম
আপডেট : ০৮ মে ২০২৬ ১৪:০৮ পিএম
নিরঞ্জন রায়; সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিশ্বে সবচেয়ে বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ কোনটি, এমন প্রশ্নের উত্তরে সকলেই একবাক্যে বলবেন আমেরিকার কথা। এ কথা এখন সবাই জানে যে, আমেরিকা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম অর্থনীতি। কারণ আমেরিকার অর্থনীতির আকার ৩০ ট্রিলিয়ন ডলার। বিশ্বের আর কোনো দেশ আমেরিকার অর্থনীতির আকারের ধারে-কাছেও নেই। অর্থনীতির আকারের দিক থেকে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে আছে চীন, যাদের অর্থনীতির আকার ২১ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি নিয়ে তৃতীয় স্থানে আছে জার্মানি। এদিকে ভারতের অর্থনীতি ৪.৫১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তারা সম্প্রতি জাপানকে পিছনে ফেলে চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, চীন ব্যতিরেকে অন্যসব দেশের অর্থনীতি আমেরিকার ছয় ভাগের এক ভাগ বা তার নিচে। যে চীনের অর্থনীতি বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে আছে, তাদের অর্থনীতির আকারও আমেরিকার অর্থনীতির তিন ভাগের দুই ভাগ বা ৬৬%।
এখানে অবশ্য হিসাবের ক্ষেত্রে এক শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। কেননা আমেরিকার অর্থনীতির আকার ৩০ ট্রিলিয়ন ডলার হলেও তাদের সার্বভৌম বা রাষ্ট্রীয় ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৩৮.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। পক্ষান্তরে চীনের অর্থনীতির আকার যে ২১ ট্রিলিয়ন ডলার, তার বিপরীতে রাষ্ট্রীয় ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ১৭ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, যা ২০২৬ সাল শেষে বৃদ্ধি পেয়ে ২০ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। একইভাবে জার্মানির রাষ্ট্রীয় ঋণ হচ্ছে ২.৭ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ভারতের রাষ্ট্রীয় ঋণের পরিমাণ বৈদেশিক এবং অভ্যন্তরীণ মিলে ২.২ ট্রিলিয়ন ডলার। এখন যদি অর্থনীতির আকার এবং রাষ্ট্রীয় ঋণের পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে প্রকৃত বা নিট অর্থনীতির আকার নিরূপণ করা হয়, তাহলে আমেরিকার অর্থনীতির আকার হবে ঋণাত্মক অর্থাৎ -৮.৫০ ট্রিলিয়ন (৩০-৩৮.৫০) ডলার, চীনের অর্থনীতি ১ (২১-২০) ট্রিলিয়ন ডলার, জার্মানির অর্থনীতি ২.৩ (৫-২.৭) ট্রিলিয়ন ডলার এবং ভারতের অর্থনীতি হবে ২.৩১ ট্রিলিয়ন (৪.৫১-২.২০) ডলার।
যদি রাষ্ট্রীয় ঋণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির আকার বা অবস্থান নির্ণয় করা হয়, তাহলে অবস্থা কী দাঁড়াবে, তা পাঠকরা ওপরের তথ্য থেকে খুব সহজেই ধারণা করতে পারবেন। বিষয়টি কিছুটা বাংলাদেশের গরিব মানুষ আর কানাডায় আমাদের মতো সচ্ছল মানুষের মতো অবস্থা, আর কী। বাংলাদেশের গরিব মানুষের আয়-উপার্জন উল্লেখযোগ্য না থাকলেও, তাদের সেরকম ব্যক্তিগত বা ক্রেডিট কার্ড ঋণ নেই। আমরা বেড়াতে গেলে তারা তাদের কষ্টার্জিত উপার্জন দিয়ে খুবই অল্প মূল্যের উপহার হিসেবে একটা শার্ট বা শাড়ি কিনে দেয়। পক্ষান্তরে কানাডায় আমাদের উপার্জন যদি বছরে হয় চল্লিশ হাজার ডলার, তাহলে আমাদের ক্রেডিট কার্ড ঋণ বা ব্যক্তিগত লাইন অব ক্রেডিটের ঋণের পরিমাণ থাকে পঞ্চাশ হাজার ডলার বা তার বেশি। আমরা যখন দেশে বেড়াতে যাই, তখন সুটকেস ভর্তি করে আত্মীয়স্বজন এবং পরিচিতদের জন্য হরেকরকম উপহার নিয়ে যাই। কিন্তু এর সবকিছুই ক্রয় করে থাকি ক্রেডিট কার্ড বা ব্যক্তিগত লাইন অব ক্রেডিট ব্যবহার করে। তারপরেও দিন শেষে আমরাই ভালো এবং আমরাই শান্তিতে আছি। আর এ কারণেই আমরা নিজের দেশ হওয়া সত্ত্বেও দেশে না যেয়ে কানাডায় থাকতে চাই। আর বাংলাদেশের মানুষ অনেক অনিশ্চয়তা মেনে নিয়েও কানাডা আসার জন্য উদগ্রীব থাকে এবং এজন্য বৈধ, অবৈধ যেকোনো পথ অবলম্বন করতে রাজি থাকে।
যাহোক, অর্থনীতি চলে সংখ্যা বা পরিসংখ্যান দিয়ে। আবার সংখ্যা এবং পরিসংখ্যানের বৈশিষ্ট্যই এমন, যা অনেকভাবেই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা যায়। এ কারণেই জনপ্রিয় একটি কথা প্রচলিত আছে যে একটি বোতলের অর্ধেক পানি ভর্তি অবস্থাকে দু’ভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়, যেমন অর্ধেক খালি বোতল বা অর্ধেক পূর্ণ বোতল। সরাসরি অর্থনীতির আকার বা জিডিপি (জাতীয় মোট উৎপাদন বা গ্রস ডমেসটিক প্রডাক্ট) এবং প্রকৃত বা নিট অর্থনীতির আকার বা জিডিপির বিষয়টি বাদ দিয়ে মাথাপিছু জিডিপির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয় তাহলে দেখা যাবে যে চীনের থেকে আমেরিকার অর্থনীতি অনেক বেশি বড় হবে। কেননা চীনের জনসংখ্যা হচ্ছে এক বিলিয়নের ওপরে, অথচ আমেরিকার জনসংখ্যা ৩৪২ মিলিয়ন।
সংখ্যা দিয়ে সবকিছু বিচার করলে যে সব সময় সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না, সেটাও আমাদের জানা। এ কারণেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দুই ধরনের তত্ত্ব থাকে, যার একটি হচ্ছে সংখ্যাতত্ত্বের মানদণ্ড বা কোয়ানটিটেটিভ তত্ত্ব এবং আরেকটি হচ্ছে গুণগত মান বা কোয়ালিটেটিভ তত্ত্ব। একটি পরিবার সুখী কি না তা সেই পরিবারের বাড়িতে পা দিয়েই বোঝা যায়। এজন্য সেই পরিবারের আয়-উপার্জন কত বা সম্পদের পরিমাণ কত, সেটা জানার প্রয়োজন পড়ে না। একইভাবে একটি দেশে পদার্পণ করেই বোঝা যায় যে সেই দেশ কেমন, অর্থাৎ উন্নত না অনুন্নত। আমেরিকায় নেমেই বোঝা যায় যে আমেরিকা এখনও বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্বের অবস্থানে আছে এবং আগামী আরও কয়েক দশক যে থাকবে, অন্তত আমাদের জীবদ্দশায় যে থাকবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ কারণেই আমেরিকার কট্টর সমালোচকও আমেরিকায় আসার এবং বসবাসের জন্য আগ্রহী। একইভাবে আমেরিকার চরম প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রও আমেরিকায় অর্থ জমা রাখতে এবং বিনিয়োগ করতে নিরাপদ মনে করে। আর এখানেই আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব।
বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতির বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমার ব্যক্তিজীবনে চাকরি পাওয়ার একটা তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে গেল, যা পাঠকদের সাথে শেয়ার করার অভিপ্রায়ে এখানে উল্লেখ করার মাধ্যমে আজকের লেখা শেষ করব। আমি বাংলাদেশে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি সরকারি সংস্থায় মধ্যম সারির কর্মকর্তা পদে চাকরির জন্য আবেদন করে চাকরি পেয়েছিলাম। আমরা সমসাময়িক চারজন সেই প্রতিষ্ঠানে এক সাথে নিয়োগ পেয়েছিলাম এবং আমরা চারজনই একে অন্যের বেশ পরিচিত ছিলাম। আমাদের সেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল বিদেশি পরামর্শক কমিটি। একসাথে নিয়োগ পেলেও আমরা চারজন ভিন্ন ভিন্ন সময় যোগদান করেছিলাম। সেই সংস্থার প্রশাসনের প্রধান ছিলেন একজন অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার একজন ব্যক্তি, যিনি বেশ কঠোর এবং নিয়মতান্ত্রিক প্রশাসক হলেও ছিলেন সেকেলে মানসিকতা সম্পন্ন। যাহোক, আমি সেই সংস্থায় যোগদান করে দেখলাম যে, আমার জ্যেষ্ঠতা চারজনের মধ্যে সবার নিচে, যা দেখে আমি রীতিমতো অবাক হয়েছিলাম। কেননা বাকি তিনজনকে আমি ভালোভাবেই চিনতাম, তাই নিশ্চিত ছিলাম যে তারা আমার চেয়ে এতটা ভালো ছিল না যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় মেধাক্রমে আমার থেকে আগে থাকতে পারে। আমি তখন ভাবলাম যে আমি যেহেতু সবার পরে যোগদান করেছিলাম, তাই আমার জ্যেষ্ঠতা সবার নিচে হয়েছে, কেননা আমি তখনও সরকারি অফিসের নিয়মকানুন সেভাবে জানি না।
আমার এক সহকর্মী আমাকে নিশ্চিত করে জানাল যে সরকারি অফিসে যোগদানের তারিখ নয়, মেধাতালিকার ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারিত হয়। এই প্রসঙ্গে আমার সহকর্মীরা আমাকে বিষয়টি খতিতে দেখে আমার জ্যেষ্ঠতা ঠিক করে নেওয়ার পরামর্শ দিলেন। আমি বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখলাম যে বিদেশি পরামর্শক কমিটি আমাদের মেধাতালিকা করেছিলেন ঋণাত্মক (নেগেটিভ) নম্বরের ভিত্তিতে, যেমন -৩, -১৫, -২৭ এবং -৩৫ অনুসারে। ঋণাত্মক মেধাক্রম অনুযায়ী যার সংখ্যা কম সে প্রথম হয় এবং সে অনুযায়ী আমি প্রথম হয়েছিলাম। পক্ষান্তরে ধনাত্মক (পজেটিভ) মেধাক্রম অনুযায়ী যে সবচেয়ে বেশি নম্বর পায়, সেই প্রথম হয়। পরামর্শক কমিটি ঋণাত্মক মেধাক্রম অনুসরণ করে আমাকে প্রথম নির্বাচিত করেই নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু সেই অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা ঋণাত্মক বিষয়টি ভালোভাবে না বুঝে পুরো মেধাক্রমটি একদম উল্টে দিয়ে যার নামের পাশে বড় সংখ্যা ছিল, তাকে প্রথম বানিয়ে আমাকে সর্বনিম্ন বানিয়ে দিয়েছিল। ফলে জ্যেষ্ঠতার তালিকায় আমি সবার নিচে পড়ে যাই। আমি যেহেতু সেই প্রতিষ্ঠানে চাকরি দীর্ঘ না করে আমার মূল পেশা, ব্যাংকিং খাতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেই, তাই বিষয়টি নিয়ে আর বেশিদূর এগোনো হয়নি। তাই আমেরিকার অর্থনীতিকে রাষ্ট্রীয় ঋণের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ঋণাত্মক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে আপাতদৃষ্টিতে আমেরিকা যে বিশের সবচেয়ে বৃহৎ অর্থনীতি, সেটাই সর্বজন স্বীকৃত এবং সেটাই বর্তমান সময়ের বাস্তবতা।
লেখক: নিরঞ্জন রায়
সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা