ড. রিটা আশরাফ
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬ ১২:১২ পিএম
ফাইল ফটো
স্বাধীনতা তুমি
রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান
স্বাধীনতা তুমি
কাজী নজরুলের ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো
মহান পুরুষ
আমাদের অনেক কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতার মূল্যায়ন করতে গিয়ে এভাবেই বলেছেন কবি শামসুর রাহমান। মূলত তাই। আমাদের রবীন্দ্রনাথ, আমাদের নজরুল আমাদের সত্তার সাথে এভাবেই অবস্থান করছেন। আরও একটি উদাহরণ, আমাদের জাতীয় জীবনের পরিচয়বাহী অন্যতম দুটি সংগীত জাতীয় সংগীত এবং রণ সংগীত। যেকোনো জাতীয় দিবস কিংবা জাতীয় পর্যায়ের কোনো অনুষ্ঠান বা আন্তর্জাতিক কোনো অনুষ্ঠানে জাতীয় পরিচয় তুলে ধরার জন্য এ দুটি সংগীত পরিবেশন অপরিহার্য। এ দুটি সংগীতের কথা ও সুরের মাঝে রয়েছে আমাদের পরিচয়। আর যারা এই সংগীত দুটির রচয়িতা তারা হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের মাটিকে, বাংলাদেশের মানুষকে, প্রকৃতিকে, ইতিহাসকে, ঐতিহ্যকে তারা কতটা ভালোবেসেছিলেন এবং তাদেরও রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল হয়ে উঠতে বাংলাদেশের মাটি, মানুষ, প্রকৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য কতটা ছায়া নিবিড় পরিবেশ দান করে সহযোগিতা করেছিল, মাতৃস্নেহের পরশ বুলিয়ে কবি করে তুলেছিল তারও পরিচয় রয়েছে এই সংগীত দুটিতে। আমাদের অস্তিত্বের প্রকাশ এবং বিকাশ যেমন এই দুই যুগ মানসের মধ্যে নিহিত তেমনি তাদেরও অস্তিত্বের প্রকাশ ও বিকাশ আমাদের এই মাটি। আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতির নানামুখী মানসের অফুরন্ত বিস্ময়ের অন্তহীন উৎস তাদের সৃষ্টি সাধনায়, মননে-দর্শনে, বহুমাত্রিকতা ও বিচিত্রতায় প্রকাশিত। কাজী নজরুল ইসলাম এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেউই জন্মগতভাবে আমাদের নন কিন্তু বিশ্বব্যাপী তাদের পরিচয়ের যে ব্যাপ্তি তার জন্মস্থান আমাদের এই ভূমি। তাদের মন-মনন-মানসিকতার যে সৌকুমার্যমণ্ডিত প্রকাশ এবং ব্যাপ্তি তার জন্মভূমি আমাদের খাল-বিল-নদী, উদাস করা প্রকৃতি, শাসিত-শোষিত এবং নিষ্পেষিত মানুষ। তখন আপনা থেকেই কণ্ঠ ফুড়ে বের হয়ে আসে তারা আমাদের রবীন্দ্রনাথ, আমাদের নজরুল।
এক.
বাংলাদেশের নদী, প্রকৃতি, মানুষ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন, ‘আজকাল আমি বিকেলে সন্ধ্যের দিকে ডাঙ্গায় উঠে অনেকক্ষণ বেড়াতে থাকি পূর্বদিকে যখন ফিরি একরকম দৃশ্য দেখতে পাই, পশ্চিমে যখন ফিরি আর একরকম দেখতে পাই আকাশ থেকে আমার মাথার উপরে যেন সান্ত্বনা বৃষ্টি হতে থাকে, আমার দুই মুগ্ধ চোখের ভিতর দিয়ে যেন একটি স্বর্ণময় মঙ্গলের ধারা আমার অন্তরের মধ্যে প্রবেশ করতে থাকে।
প্রতিবার এই পদ্মার উপর আসবার আগে ভয় হয় আমার পদ্মা বোধ হয় পুরনো হয়ে গেছে। কিন্তু, যখনই বোট ভাসিয়ে দিই, চারদিকে জল কুলকুল করে ওঠে। চারিদিকে একটা স্পন্দন কম্পন আলোক আকাশ মৃদুকলধ্বনি, একটা সুকোমল নীল বিস্তার, একটি সুনিবিড় শ্যামল রেখা, বর্ণ এবং নৃত্য এবং সংগীত এবং সৌন্দর্য্যরে একটি নিত্য উৎসব উদঘাটিত হয়ে যায়, তখন আবার নতুন করে আমার হৃদয় যেন অভিভূত হয়ে যায়।
এখন আমি শিলাইদহ বোটে। এখানে এসে আমার শরীরের সমস্ত ব্যাধি একদিনে দূর হয়ে গেছে। বাস্তবিক, পদ্মাকে আমি বড় ভালবাসি। ইন্দ্রের যেমন ঐরাবত আমার তেমনি পদ্মা আমার যথার্থ বাহন খুব বেশি পোষমানা নয়, কিছু বুনোরকম- কিন্তু ওর পিঠে এবং কাঁধে হাত বুলিয়ে ওকে আমার আদর করতে ইচ্ছে করে। ... আমি যখন শিলাইদহ বোটে থাকি তখন পদ্মা আমার পক্ষে সত্যিকার একটি স্বতন্ত্র মানুষের মতো।’
এই প্রেম, এই চেতনা, এই উপলব্ধিই রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বকবির পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। ১৮৯১ সালে মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ পা রেখেছিলেন বাংলাদেশের শিলাইদহ অঞ্চলে তার জমিদারি দেখাশুনার উদ্দেশ্যে। যদিও এর পূর্বেও তিনি দুয়েকবার এ অঞ্চলে এসেছিলেন তবে তা বেড়াবার উদ্দেশ্যে। ১৮৯১ সাল থেকে ১৯০১ এই সময়টি রবীন্দ্রনাথের মোটামুটি কেটেছে শিলাইদহতেই। শিলাইদহ, পতিসর, শাহজাদপুরে দেখাশুনা করেন জমিদারি। এরপরও ১৯২২ সাল পর্যন্ত তিনি এই এলাকায় আসা-যাওয়া করেছেন জমিদারি তদারকির উদ্দেশ্যে। রবীন্দ্র প্রতিভার প্রকাশ ও বিকাশ মূলত এ সময়টিতেই। এ সময় সেখানখার পদ্মা নদী ও গড়াই নদ রবীন্দ্রনাথের সৃজনশীল মানসপটে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। নদীর বুকে ভেসে ভেসে তিনি আবিষ্কার করেছেন রহস্যময়তা। আর তার ছন্দময় গদ্য ও পদ্যের মাধ্যমে সেসব তুলে ধরেছেন সকলের সামনে। এ সময়ের মাঝে রবীন্দ্রনাথের কাব্যকুঞ্জে রয়েছে সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালী, কথা ও কাহিনী, কল্পনা, ক্ষণিকা, নৈবেদ্য, খেয়া, বলাকা। তার ছোটগল্পের মধ্যে রয়েছে খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, একটি ক্ষুদ্র পুরাতন গল্প, মেঘ ও রৌদ্র, ক্ষুধিত পাষাণ, পুরাতন ভৃত্য, দুর্বুদ্ধি, সদর অন্তর, নষ্টনীড়, নিশীথে, পণরক্ষা, শাস্তি, সমাপ্তি, ঠাকুরদা, ব্রাহ্মণ, উদ্ধার, ফেল, শুভদৃষ্টি, কংকাল, দৃষ্টিদান, জীবিত ও মৃত। এ ছাড়াও তৎকালীন ‘সাধনা’ পত্রিকায় প্রকাশিত রবীন্দ্র ছোটগল্পের মাঝে দালিয়া, মুক্তির উপায়, একরাত্রি, রীতিমত নভেল, কাবুলিওয়ালা, মহামায়া, সম্পাদক, অসম্ভবকথা, সমস্যাপূরণ, অনধিকার প্রবেশ, প্রায়শ্চিত্য, দিদি, সম্পত্তি সমর্পণ, ত্যাগ, একটা আষাঢ়ে গল্প, স্বর্ণমৃগ, জয়-পরাজয়, সুভা, দান-প্রতিদান, মধ্যবর্তিনী, খাতা, বিচারক, আপদ, মানভঞ্জন, প্রতিহিংসা, অতিথি গল্পগুলোর প্রকাশের তারিখের সাথে শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের অবস্থানের সামঞ্জস্যের হেতু মনে করা হয় এই গল্পগুলোও শিলাইদহে বসেই রচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ।
যে গীতাঞ্জলী রবীন্দ্রনাথকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করে সেই সাথে শিলাইদহসহ সমগ্র বাংলাদেশ এবং বাংলাসাহিত্যকে বিশ্বদরবারে সুপরিচিত এবং উৎকৃষ্ট সাহিত্য হিসেবে পরিচিত করে তোলে সেই গীতাঞ্জলীর ১০৩টি গান ও কবিতার মাঝে ৮৩টি সংকলনই রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে বসে অনুবাদ করেন। চোখের বালি, চিরকুমার সভাসহ তৎকালীন ভারতী’র জন্য বহু প্রবন্ধ রবীন্দ্রনাথ এই শিলাইদহে বসে রচনা করেছেন।
শিলাইদহে রবীন্দ্র রচনা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, আমার ধারণা, বাবার গদ্য ও পদ্য দু’রকম লেখারই উৎস যেমন খুলে গিয়েছিল শিলাইদহে এমন আর কোথাও হয়নি। এই সময় তিনি অনর্গল কবিতা, প্রবন্ধ ও গল্প লিখে গেছেন একদিনের জন্যও কলম বন্ধ হয়নি। শিলাইদহের যে রূপ বৈচিত্র্য ... এই রমণীয় সৌন্দর্যের বর্ণনা তার বহু রচনায় আমরা পাই।
দুই.
দুখু মিয়া, ব্যাঙ্গাচি, নজর আলী, তারাখ্যাপা এসব নামের ভেতর ডিগবাজি খেতে খেতে বড় হলেন কাজী নজরুল ইসলাম। অতঃপর যখন কাজী নজরুল ইসলাম নামে খ্যাতি অর্জন করলেন, ভূষিত হলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে তখন তার এই নামগুলোর প্রতিটির আলাদা আলাদা মর্মার্থ আমরা খুঁজে পাই। যার ভেতর আজকের কাজী নজরুল ইসলামের ভবিষ্যৎ নির্দেশনা লুকিয়ে ছিল।
বাংলাদেশের জাতিসত্তার সাথে নজরুলের সম্পর্ক এতটাই গভীর যে, বলা যায়, বাংলাদেশের জন্মটাই হয়েছে নজরুলের স্বাধীনতাকামী বিদ্রোহী চেতনার ফলে। যে চেতনা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান করে দিয়েছিল তরুণ-যুবকসহ সর্বস্তরের বাঙালিকে। ১৯৭১ সালের ২৫ মে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথম যে গানটি বাজানো হয় মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল তৈরির উদ্দেশ্যে সেটি হলো, ‘দুর্গম গিরি, কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার/ লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার!’ এই গানটির রচয়িতা কাজী নজরুল ইসলাম। অতঃপর পুরো ৯ মাসজুড়ে বাজানো হতো নজরুলের ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে...; ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি, আমার দেশের মাটি; কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট; একি অপরূপ রূপে মা তোমায়, হেরিনু পল্লী জননী’ ইত্যাদি।
১৯৪০ সালে নজরুল সুস্থাবস্থায় শেষ ঢাকায় আসেন। এরপর ১৯৭২ সালের ২৪ মে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান নজরুলকে সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসেন।পরে তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। নজরুলের শেষযাত্রায় তার কফিন বয়ে নিয়েছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েম, তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। নজরুলের বিখ্যাত গান ‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই’ এইটিকে তার একান্ত ইচ্ছা ধরে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে চিরশায়িত করা হয় তাকে।
আমাদের রবীন্দ্রনাথ আমাদের নজরুল কেন এর সহজবোধগম্যতা ইতোমধ্যেই উন্মোচিত হয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে আধুনিক সাহিত্যের যে পদযাত্রা তাকে আধুনিকতার চরম উৎকর্ষ সাধনে রবীন্দ্র মনন রেখেছে চরম অবদান, যা তৈরি করেছে একটি রবীন্দ্র যুগের। যে যুগকে আমরা এখনও পথিকৃত হিসেবে বিবেচনা করি। অপরদিকে নজরুল মানস আমাদের মুক্তির চেতনা জাগ্রত করেছে। তার যে চেতনা তা সর্বকালের সর্বজনের। এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য নিয়ে তিনি বাংলার মাঠেঘাটে পথেপ্রান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। কখনও শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে, কখনও সাংবাদিক হয়ে, কখনও প্রেমিক হয়ে, কখনও রাজনীতিবিদ হয়ে, কখনও কোনো অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হয়ে, কখনও কবি হয়ে।
পরিশেষে বলব, বাংলাসাহিত্যে এই রবীন্দ্র যুগ এবং নজরুল যুগ এখন পর্যন্তও অনতিক্রম্য।
লেখক: ড. রিটা আশরাফ
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ