সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬ ১২:০৬ পিএম
ফাইল ফটো
আজ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৬তম জন্মদিন। জন্মজয়ন্তীতে আমরা তাকে স্মরণ করি অবনত চিত্তে। বাংলা সাহিত্যের দিগ্বিজয়ী এই মনীষী নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছেন আমাদের জাতীয় জীবনে। বাংলাদেশে জন্ম না নিয়েও তিনি হয়ে উঠেছেন এদেশের ভূমিপুত্র। তার গান, কবিতা, গল্প-উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, নাটক আমাদের এক অমূল্য সম্পদ। শিল্প-সাহিত্য বা সাংস্কৃতিক সৃষ্টি যেকোনো ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ থাকে না, রবীন্দ্রনাথের জীবনে তা প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। ১৮৬১ সালে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার জোড়াসাঁকোর এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া রবীন্দ্রনাথ কালক্রমে তার সাহিত্যসাধনার দ্বারা উপমহাদেশ শুধু নয়, বিশ্বের সাহিত্যাঙ্গনেও ঠাঁই করে নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। পারিবারিক উত্তরাধিকারসূত্রে ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও তার কবিতা-গানে আধ্যাত্মবাদের যে ভাবধারা ফুটে উঠেছে, তা ছিল সর্বজনীন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে তার গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনিই নোবেল বিজয়ী প্রথম এশীয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বলা হয়, বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক-কবি। তার সারাজীবনের সাহিত্যসাধনার ফসল বাংলা সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। বাংলা সাহিত্যের পথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জটিল ধারা থেকে বাংলা সাহিত্যকে মুক্ত করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বলাটা অত্যুক্তি নয় যে, রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই বাংলা সাহিত্যের নবধারার সূচনা, যা পরবর্তী দুই শতাব্দী ধরে অব্যাহত আছে। তিনি ‘কবিগুরু’, ‘গুরুদেব’, ‘বিশ্বকবি’ ইত্যাদি অভিধায় অভিষিক্ত। তবে এসব অভিধার বাইরে তার পরিচিতি একজন মানবতাবাদী কবি হিসেবে। যে কারণে, ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যার প্রতিবাদে তিনি ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘স্যার’ (নাইট হুড) উপাধি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৪টি উপন্যাস, ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্য সংকলন রয়েছে। এসব গ্রন্থের কিছু তার জীবদ্দশায়, বাকি তার মৃত্যুর পরে প্রকাশিত। তার লেখা ৯৫টি ছোটগল্প গল্পগুচ্ছ সংকলনে প্রায় ২ হাজার গণ গীতবিতানে সংকলিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত রচনা সমন্বয়ে ৩২ খণ্ডের রবীন্দ্র রচনাবলীও প্রকাশিত হয়েছে। তার বহু গ্রন্থ বিদেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইংল্যান্ড, রাশিয়া, জাপানসহ অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন তিনি। তিনি ছিলেন একজন সুনিপুণ আঁকিয়ে। তার আঁকা চিত্রসমূহ সুধীমহলে প্রশংসিত হয়েছে। ফলে কবি ও গীতিকারের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন চিত্রশিল্পী হিসেবেও সমাদৃত। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেঁচেছিলেন ৮০ বছর। ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট (২২ শ্রাবণ ১২৬৮ বঙ্গাব্দ) এই মনীষী পরলোকগমন করেন।
বাংলাদেশি জাতি হিসেবে আমাদের আত্মশ্লাঘার বিষয় হলো, তার লেখা গান আমাদের জাতীয় সংগীত। মুক্তিযুদ্ধ চলকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিত্য প্রচারিত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি রণাঙ্গনে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের এবং পাকবাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ বাংলাদেশে মুক্তি প্রতীক্ষিত মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছে। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ সরকার এই গানটির প্রথম দুটি স্তবককে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্ধারণ করে। যদিও পরবর্তী সময়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কোনো কোনো মহল প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেছে, ভিনদেশি একজন কবির রচিত গান কেন আমাদের জাতীয় সংগীত হবে? এমনকি আমাদের জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবি তোলার ধৃষ্টতাও দেখিয়েছে তারা! কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে নিবিড়ভাব সম্পর্কিত এ জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের অগ্রহণযোগ্য দাবি হালে পানি পায়নি।
রবীন্দ্র সাহিত্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে আছে আমাদের আজকের বাংলাদেশ। এ অঞ্চলে তাদের জমিদারি থাকার কারণে রবীন্দ্রনাথ বারবার এ অঞ্চলে এসেছেন, থেকেছেন। এখানকার শ্রমজীবী মানুষের স্পর্শে তার সাহিত্যে মানবতা বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে। শিলাইদহে এবং পদ্মার বোটে বসে তিনি অনেক কালজয়ী রচনা সৃষ্টি করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল একজন কবি-সাহিত্যিকই ছিলেন না, তিনি শিক্ষানুরাগী ও সমাজ সংস্কারক ছিলেন। তাই ১৯০১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের উপকণ্ঠে গড়ে তোলেন শান্তিনিকেতন নামে একটি প্রতিষ্ঠান। কবির পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে সেখানে একটি আশ্রম ও ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে একটি ব্রাহ্মমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেখানে একটি গ্রন্থাগার নিয়ে চালু করেন ব্রহ্ম বিদ্যালয়। সে প্রতিষ্ঠানই আজকের রবীন্দ্র-ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা বিস্তার ও সাহিত্যসাধনায় নিমগ্ন রবীন্দ্রনাথকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে ১৯০৬ সালে ‘বঙ্গভঙ্গবিরোধী’ আন্দোলনে সম্পৃক্তি। ধারণা করা হয়ে থাকে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু জমিদার-মহাজনদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন। এই বিরোধিতার দ্বারা তিনি বাংলা-আসামের, বিশেষ করে পূর্ব বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ) সংখ্যাগারিষ্ঠ মুসলমানের স্বার্থবিরোধী তৎপরতায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন বলে অনেকে মনে করেন। তা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এদেশের মানুষের কাছে একজন মহান মনীষী হিসেবে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন শান্তিবাদী মানুষ। তিনি মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। দুজনের বয়সের ব্যবধান ছিল আট বছরের। মাহাত্মা গান্ধী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের চেয়ে আট বছরের ছোট। তাদের মৃত্যুর ব্যবধানও মোটামিুটি আট বছর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৪১ সালে মৃত্যুবরণ করেন, গান্ধীজি নিহত হন ১৯৪৮ সালে। সমসাময়িক এ দুই মনীষীর মধ্যে ছিল গভীর সম্পর্ক। তারা একে অপরকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করতেন। তাদের মধ্যে নিয়মিত পত্রালাপ হতো। সেসব পত্রে ভারতবর্ষের মানুষের মুক্তির কথাই প্রাধান্য পেত।
মানুষ অমর হয় তার কাজের মধ্য দিয়ে। জাতি, ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলেন বলেই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আজও উপমহাদেশের মানুষের কাছে প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। জন্মদিনে তার প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।