পত্রিকায় খবর বেরিয়ছে সিটি করপোরেশন ফুটপাত ও সড়কে দোকান বসানোর জন্য ‘হকার কার্ড’ প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ঢাকা মহানগরী দীর্ঘকাল ধরেই অব্যবস্থাপনার জীবন্ত উদাহরণ হয়ে আছে। এখানে রাস্তার পাশে ময়লঅ আবর্জনার স্তুপ, বন্ধ হয়ে যাওয়া ড্রেনের পানির স্রোতধারায় প্লাবিত সড়ক জনদুর্ভোগের প্রধান অনুষঙ্গ। আর ফুটপাত তো অঘোষিত বিপনী বিতান। যে ফুটপাত দিয়ে মানুষের পায়ে হেঁটে যাকায়াতের কথা, সে পুটপাতে সারিবদ্ধ দোকানে তারা কেনাকাটা করে। এ অবৈধ ফুটপাত নিয়ে সব সরকতারের আমলেই চলে রমরমা ব্যবসা। যখন যে দলের সরকার ক্ষমতায় থাকে, সে দরে নরওেনতাকর্মীরা অলিখিত অধিশ্বর হয়ে যডায় রাজধানীর ফুটপাতের। মাঝেমধ্যে চলে উচ্ছেদ অভিযান নাটক। নাটক বলছি এজন্য যে, উচ্ছেদের কযেকদিন পরেই আবার হকাররা যথাস্থানে পুনর্বাসিত হয়। প্রচারিত আছে এই উচ্ছেদ এবং পুনর্বাসনের অন্তরালে চলে লেনদেনের খেলা। সংশ্লিণষ্ট মহলকে সন্তুষ্ট করতে পারলেই মিলে যায় ফুটপাতে দোকান বসিয়ে নিশ্চিন্তে ব্যবসায় করার অনুমতি।
এতদিন যে ফুটপাতে দো্কান বসানো অৗবধ হিসেবে বিবেচিত ছিল, এবার তা বৈধতার সীলমোহর পেতে যাচ্ছে। পত্রিকায় খবর বেরিয়ছে সিটি করপোরেশন ফুটপাত ও সড়কে দোকান বসানোর জন্য ‘হকার কার্ড’ প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে যারা সে কার্ড নামের মহার্ঘ বস্তুটির ধারক হতে পারবেন, তারা পেয়ে যাবেন পথচারিদের জন্য নির্মিত ফুটপাতের মালিকানা। তবে সচেত ব্যক্তিরা মনে করেন, সিটি কর্পোরেশনের এ সিদ্ধান্ত শুধু বিদ্যমান অব্যবস্থাপনায় নতুন পালক যুক্ত করবেনা, এটা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। গত কয়েক দশকে আমরা রাজধানীজুড়ে শত শত উচ্ছেদ অভিযান দেখেছি। বুলডোজার দিয়ে হকারদের কাঁচাঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া, পুলিশের লাঠিপেটা আর হকারদের আর্তনাদÑ এই দৃশ্যগুলো ছিল সংবাদমাধ্যমের নিত্যদিনের খবর। কিন্তু এই ‘হকার কার্ড’ প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর নাগরিক সমাজ আজ চিৎকার করে বলতে বাধ্য হচ্ছেÑ এতদিন যা হয়েছে তা ছিল কেবলই একটি জনরোষ প্রশমনের মহাকাব্যিক ‘উচ্ছেদ নাটক’। আর এখন তা স্থায়ী দখলদারিত্বে রূপ নিতে যাচ্ছে। যখন একটি প্রশাসন তার নাগরিকদের যাতায়াতের একমাত্র পথটি অবৈধ দখলদারদের হাতে ইজারা দেওয়ার বন্দোবস্ত করে, তখন বুঝতে হবে সেই শহরের নীতিনির্ধারকদের কাছে সাধারণ মানুষের অধিকার ও স্বাচ্ছন্দ চলালের চেয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেটের স্বার্থ অনেক বেশি মূল্যবান।
গবেষণা সংস্থা ব্র্যাক ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের তথ্যমতে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ফুটপাত থেকে বছরে প্রায় ১,৮০০ থেকে ১,৯০০ কোটি টাকার চাঁদা তোলা হয়। প্রতিদিন ৩ লাখেরও বেশি হকার এই ব্যবস্থার শিকার। তথাকথিত এই ‘হকার কার্ড’ প্রথা আসলে এই বিশাল কালো অর্থনীতিকে একটি ডিজিটাল এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার হাতিয়ার ছাড়া আর কিছুই নয়। এতদিন হকাররা স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী, নেতা-পাতিনেতা বা পুলিশের একাংশকে ‘লাইনম্যান’-এর মাধ্যমে টাকা দিত। এখন সেই ব্যবস্থাটি সরকারি সিলমোহরের আড়ালে আরও সংগঠিত হবে। হকারদের কাছ থেকে আদায়কৃত এই কোটি কোটি টাকার ভাগ শেষ পর্যন্ত কার বা কাদের পকেটে যাবে, তা বুঝতে রকেট সায়েন্টিস্ট হওয়ার প্রয়োজন নেই। এটি সরাসরি নাগরিকদের যাতায়াতের অধিকার বিক্রি করে দিয়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর পকেট ভারী করার আয়োজন।
বিশ্বের সফল মেগাসিটিগুলোর দিকে তাকালে আমাদের এই সিদ্ধান্তটিকে কেবল হাস্যকর নয়, বরং সভ্যতা বিবর্জিত বলে মনে হবে। সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের মতো জনবহুল শহরগুলো একসময় আমাদের চেয়েও ভয়াবহ হকার সমস্যায় জর্জরিত ছিল। কিন্তু তারা কি ফুটপাত লিজ দিয়ে সমস্যার সমাধান করেছিল? কখখনো না। ১৯৭০-এর দশকে সিঙ্গাপুর সরকার অত্যন্ত কঠোর হাতে হকারদের রাস্তা থেকে সরিয়ে সুশৃঙ্খল ‘হকার সেন্টারে’ পুনর্বাসিত করে। সেখানে হকারদের জন্য আধুনিক স্টল, পয়োনিষ্কাশন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করা হয়। আজ সিঙ্গাপুরের সেই হকার সংস্কৃতি ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে, কিন্তু তারা তাদের ফুটপাতকে কলুষিত হতে দেয়নি। এমনকি ভিয়েতনামের হ্যানয় বা হো চি মিন সিটিতেও ‘প্যাভমেন্ট ম্যানেজমেন্ট’ পলিসি রয়েছে, যেখানে ফুটপাতের নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে হকারদের বসা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। প্রতিবেশী দেশ ভারতের অনেক বড় শহরে ‘হকিং জোন’ ও ‘নন-হকিং জোন’ সুনির্দিষ্ট করা আছে। সেখানে উচ্চ আদালতের নির্দেশ রয়েছে যে, ফুটপাতের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। অথচ আমাদের ঢাকা শহরে কি কোনো সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা আছে? এখানে পরিকল্পনা মানেই হলো লুটপাটের নতুন কোনো ফাঁদ পাতা।
ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে জননিরাপত্তার ওপর। যখন একজন পথচারী ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে মূল সড়কে নামতে বাধ্য হন, তখন দ্রুতগামী যানবাহনের ধাক্কায় তার প্রাণ হারানোর ঝুঁকি বেড়ে যায় কয়েকগুণ। সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকার অধিকাংশ পথচারী দুর্ঘটনার শিকার হন ফুটপাত ব্যবহার করতে না পারার কারণে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য এই পরিস্থিতি এক নারকীয় যন্ত্রণার সমান। একটি শিশু যখন স্কুল থেকে ফেরার পথে ফুটপাত পায় না, তখন তাকে চলতে হয় বাস-ট্রাকের গা ঘেঁষে। এই অনিশ্চয়তার দায়ভার কি কার্ড বিতরণকারী কর্মকর্তারা নেবেন? নাকি প্রতিটি মৃত্যুর পর তারা আবার নতুন কোনো ‘তদন্ত কমিটি’ গঠনের নাটক সাজাবেন? জীবিকার দোহাই দিয়ে কয়েক কোটি নগরবাসীকে রাজপথে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই ‘মানবিকতা’ হতে পারে না।
এ ছাড়া পরিবেশগত পরিবর্তনের বিষয়টিও এখানে উপেক্ষিত। ফুটপাতে যখন প্লাস্টিক, পলিথিন আর ত্রিপল টাঙিয়ে দোকান বসানো হয়, তখন তা শহরের ‘হিট আইল্যান্ড’ প্রভাবকে বাড়িয়ে দেয়। বাতাস চলাচলের পথ রুদ্ধ হয় এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বর্ষাকালে এই হকারদের পলিথিন ও বর্জ্য ড্রেনগুলোতে গিয়ে পড়ে, যা জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ। সিটি করপোরেশন একদিকে ড্রেন পরিষ্কারের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করছে, আবার অন্যদিকে সেই ড্রেনকে বন্ধ করারও আয়োজন করছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, পুরানো অব্যবস্থাপনাকে তারা বৈধ:তার মোড়ক দিয়ে উদ্যোগী হয়েছেন। এ যেন নগরবাসীর সঙ্গে নিষ্ঠুর তামাশা। অভিজ্ঞজনেরা বলছেন, এটি কেবল একটি প্রশাসনিক ভুল নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনার পদক্ষেপ।। একটি রাজধানী শহরের মূল ধমনী যদি এভাবেই দখলদারদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে, তবে সেই শহর যে আর বসবাস অযোগ্য হয়ে পড়ে, সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
যেকোনো সভ্য দেশে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় ফুটপাত তৈরি করা হয় নাগরিকদের স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলের জন্য। সেই ফুটপাত লিজ দেওয়া হলে তা হবে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা। আইনি দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, ফুটপাত ইজারা দেওয়া বা হকার কার্ড দেওয়া সরাসরি উচ্চ আদালতের বিভিন্ন নির্দেশনার লঙ্ঘন। সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ে বলা হয়েছে, জনগণের চলাচলের পথ কোনোভাবেই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। সিটি করপোরেশন এই ‘কার্ড’ প্রথা শুরু করলে তা হবে কার্যত আইনের শাসনের অবমাননা। নাগরিকদের পক্ষ থেকে রিট পিটিশন করা হলে এই প্রকল্প আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে নিশ্চিত। কিন্তু সেই ঝুঁকি জেনেও কেন এই পথে হাঁটা হচ্ছে? কারণ, সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা এবং আর্থিক লেনদেন এখানে মুখ্য।
হকারদের পুনর্বাসন অবশ্যই প্রয়োজন, কারণ তাদের জীবিকার অধিকার রয়েছে। কিন্তু একজনের জীবিকা কি অন্য দশজনের নাগরিক অধিকারের চেয়ে দামি? হকারদের জন্য মাল্টি-স্টোরি মার্কেট বা সরকারি পরিত্যক্ত জায়গাগুলোতে সুনির্দিষ্ট জোন তৈরি করা যায়। গত কয়েক বছরে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং সিটি করপোরেশনের অনেক মার্কেট তৈরি হলেও হকাররা সেখানে স্থান পায়নি, বরং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা সেগুলো দখল করে নিয়েছে। এই ব্যর্থতার দায় হকারদের নয়, বরং প্রশাসনের। কিন্তু সেই টেকসই সমাধানের পথে না গিয়ে তারা বেছে নিয়েছে ফুটপাত ইজারা দেওয়ার সহজ ও লাভজনক পথ। এটি আসলে এক প্রকার প্রশাসনিক দেউলিয়াত্ব। জনগণের টাকায় বেতনভুক্ত কর্মকর্তাদের কাজ জনগণের পথ পরিষ্কার রাখা, হকারদের পাহারাদার হওয়া নয়।
এই শহরটি এখন আর তার প্রকৃত নাগরিকদের নেই। এটি এখন সিন্ডিকেট আর অযোগ্য নীতিনির্ধারকদের লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছে। ফুটপাত দখলকে বৈধতা দেওয়া মানে হলো অরাজকতাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া। যদি সত্যিই হকারদের জীবনমান উন্নয়ন লক্ষ্য হতো, তবে তাদের জন্য স্বাস্থ্যকর ও আধুনিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হতো। ফুটপাত ইজারা দেওয়া কোনো সমাধান নয়, বরং এটি একটি অকার্যকর নগর প্রশাসনের চূড়ান্ত ব্যর্থতার দলিল। সিটি করপোরেশন যদি তাদের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসে, তবে অচিরেই ঢাকা শহর বসবাসের অযোগ্য এক বিশাল ঘিঞ্জি বস্তিতে রূপান্তরিত হবে। ফুটপাত পথচারীদের ফিরিয়ে দিন, হকারদের নির্দিষ্ট স্থায়ী মার্কেটে পুনর্বাসিত করুন। অন্যথায় ইতিহাসের পাতায় এই ‘হকার কার্ড’ প্রকল্পটি একটি মেগাসিটির মৃত্যু পরোয়ানা হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। নগরবাসীকে আজ সোচ্চার হতে হবে, কারণ আমাদের নীরবতাই আজ এই অরাজকতাকে বৈধ করার সাহস জোগাচ্ছে। ফুটপাত আপনার, আমার এবং এই শহরের ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরÑ এটি বিক্রি করার অধিকার কারও নেই। দখলদারদের বৈধতা দেওয়া নয়, বরং জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠাই হোক আধুনিক ঢাকা গড়ার প্রথম পদক্ষেপ।
জাহিদ ইকবাল
সাংবাদিক ও সমাজকর্মী