মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল, কলাম লেখক ও শিল্পোদ্যোক্তা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প গত দুই দশকে দেশের অন্যতম সফল শিল্প খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই খাতটি এখন দেশীয় চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির নানা শর্ত দেশের বিকাশমান এই শিল্পের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে, মেধাস্বত্ব (Intellectual Property Rights) সংক্রান্ত কঠোর শর্ত আরোপের বিষয়টি শিল্পটির জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। মার্কিন চুক্তির মেধাস্বত্ব আইন-সংক্রান্ত ২.৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ শ্যাল প্রোভাইড অ্যা রোবাস্ট স্ট্যান্ডার্ড অব প্রটেকশন ফর ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি। বাংলাদেশ শ্যাল প্রোভাইড ইফেকটিভ সিস্টেমস ফর সিভিল, ক্রিমিনাল অ্যান্ড বর্ডার এনফোর্সমেন্ট অব ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস অ্যান্ড শ্যাল এনশিওর দ্যাট সাচ সিস্টেমস কমব্যাট অ্যান্ড ডেটার দ্য ইনফ্রিংমেন্ট অর মিসঅ্যাপ্রোপ্রিয়েশন ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি…’Ñ এই ধারাটির বার্তা হলো বাংলাদেশকে মেধাস্বত্ব বা ‘ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইট’ (আইপি) আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। বিশেষ করে, পেটেন্ট আইনকে শক্তভাবে বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিকÑ এই নীতির প্রয়োগে কার্যত কার লাভ কার ক্ষতি?
দেশে ব্যবহৃত ওষুধের প্রায় ৯০ শতাংশ কাঁচামাল আসে বিদেশ থেকে। এর বড় অংশই এমন উপাদান, যেগুলোর পেটেন্ট নেই। এই বিশাল কাঁচামালের মধ্যে কোনটি পেটেন্টের আওতায়, কোনটি নয় বা কোনটি লঙ্ঘিত হয়েছেÑ এটি নির্ধারণ করবে কে? উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশে ২৫০টিরও বেশি ওষুধ কোম্পানি, যার বেশিরভাগই ছোট ও মাঝারি। কঠোর পেটেন্ট নীতি কার্যকর হলে তাদের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এতে বাজার কিছু বড় কোম্পানি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এটি শেষ পর্যন্ত ওষুধের দাম, প্রাপ্যতা এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এখানে মূল বিতর্ক শুধু আইনি নয়, নীতিগত। একদিকে রয়েছে বৈশ্বিক বাণিজ্য চুক্তি ও মেধাস্বত্ব রক্ষা, অন্যদিকে রয়েছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার সহজ প্রাপ্তি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছে। ব্রাজিল, মিসর বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো পেটেন্ট নীতিকে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালনা করছে।
এ কথা সত্য, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) হিসেবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস (TRIPS) চুক্তির আওতায় কিছু ছাড় সুবিধা ভোগ করে, যার ফলে দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো পেটেন্টমুক্ত জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন করতে পারে। যে কারণে কম খরচে মানসম্মত ওষুধ জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিতে যদি পেটেন্ট সুরক্ষা কঠোর করা হয়, তাহলে এই সুবিধা সংকুচিত হতে পারে। এর ফলে দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন ওষুধ উৎপাদনে পেটেন্ট ফি, লাইসেন্সিং এবং প্রযুক্তিগত নির্ভরতার কারণে খরচ বাড়বে, যা শেষপর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। সাধারণ মানুষের জন্য ওষুধের দাম বেড়ে গেলে তা জনস্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ এখনও স্বল্পোন্নত দেশ হওয়ায় জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে পেটেন্ট ফি দিতে হয় না। এ সুবিধার ফলে দেশের ওষুধ শিল্প দ্রুত বিকশিত হয়েছে। জেনেরিক ওষুধ মূলত সেই ওষুধ, যার পেটেন্ট মেয়াদ শেষ হয়েছে বা যার ওপর পেটেন্ট আর প্রযোজ্য নয়। গঠনগতভাবে এটি ব্র্যান্ডেড ওষুধের সমান কার্যকর। এই সুবিধার ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আজ প্রায় ৯৭ শতাংশ ওষুধ দেশেই উৎপাদন করছে এবং ১০০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি করছে।
এই শিল্প কাঠামো গড়ে উঠেছে মূলত ‘হাই ভলিউম, লো মার্জিন’ মডেলের ওপর। এ ছাড়া বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলোর বাজার দখলের সুযোগও বাড়তে পারে। কঠোর মেধাস্বত্ব আইন কার্যকর হলে দেশীয় কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে এবং বড় বিদেশি কোম্পানিগুলো বাজারে আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে। এতে দেশের ওষুধ শিল্পের স্বনির্ভরতা হুমকির মুখে পড়বে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প অনেকাংশে নিজস্ব সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে চলছে। কিন্তু চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, উন্নত প্রযুক্তি ও কাঁচামালের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা বাড়লে তা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করবে।
তাই বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি এখন আর শুধু একটি বাণিজ্য চুক্তির নয়। এটি শিল্পনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। চুক্তির শর্তগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের ওষুধ শিল্পের কাঠামো, মূল্যনীতি এবং বাজার ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। এখন প্রয়োজন বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং অর্থনৈতিক ও জনস্বার্থের দিক থেকেও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা।
ভয়ংকর তথ্য হলো, চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের কাস্টমসের সব ডিজিটাল তথ্যের অধিকার চাইছে, আইপি আইনের ‘ডিজিটাল এনফোর্সমেন্ট রাইট’ চাইছে। অর্থাৎ তারা আমাদের বন্দর ও কাস্টমসের সব ডেটা হাতে নিয়ে বসে থাকবে এবং উৎপাদকদের আমদানি করা কাঁচামালের লেবেল অনুসরণ করতে পারবে। তার মানে বিদেশি চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের কাস্টমস ডেটাবেজ ও ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার চাওয়া হচ্ছে। এতে আমদানির প্রতিটি কাঁচামালের তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাইরের পক্ষের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে এক ধরনের অস্বস্তিকর চিত্র দাঁড়ায়Ñ প্রযুক্তি অন্যদের হাতে, সিদ্ধান্ত অন্য দেশের হাতে, আর বাস্তব প্রয়োগে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রক নয় বরং বাস্তবায়নকারীর।
তাই এই মাত্রার একটি স্পর্শকাতর এবং তুমুল বিতর্কের বিষয়কে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক লেন্স থেকে দেখা জরুরি। দেশে দেশে পেটেন্ট-সম্পর্কিত আইনি লড়াইয়ের ইতিহাসগুলোও ঘেঁটে দেখা প্রয়োজন। কারণ কাঁচামালের পেটেন্ট নির্ণয় আন্তর্জাতিকভাবেই ঝামেলাপূর্ণ বিষয়। হাজারো মামলা ঝুলে থাকে বছরের পর বছর। সেই হিসাবে এটি একটি জুডিসিয়াল বা বিচারিক ইস্যুও। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, আফ্রিকায় এইডস বা টিবির ওষুধের অভাবে অজস্র রোগীর মৃত্যুর পরে ওষুধ উৎপাদনে পেটেন্ট আইনের কঠোর প্রয়োগের বিরুদ্ধে আফ্রিকাজুড়ে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল।
মনে রাখ দরকার, মেধাস্বত্ব আইন কেবল প্রশাসনিক বা কাস্টমস ইস্যু নয়, এটি গভীরভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। বিশ্বজুড়ে ‘গ্লোবাল নর্থ’ ও ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর মধ্যে পেটেন্ট নীতির বিরোধ বহুদিনের। এটি কোনো দেশের শিল্পনীতি, স্বাস্থ্যনীতি এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ যদি পেটেন্ট ফি প্রদানে বাধ্য হয় বা এলডিসি সুবিধা সীমিত হয়ে যায়, তবে ওষুধ উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ইনসুলিনের দাম প্রায় ১১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। পাশাপাশি ক্যানসার, কিডনি এবং হেপাটাইটিস সি চিকিৎসার ওষুধেও মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের বর্তমান বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ওষুধ শিল্পের উদ্যোক্তারা মনে করেন, এক্ষেত্রে সতর্ক নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। সরকারকে অবশ্যই জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বাণিজ্য চুক্তির শর্তগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য ও ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
এক্ষেত্রে প্রথমত, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ট্রিপস চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ একটি স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ওষুধের পেটেন্ট ছাড় সুবিধা ভোগ করছে। এ সুবিধার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং মার্কিন চুক্তির আলোচনায় কোনোভাবেই এই ছাড় খর্ব হয়Ñ এমন শর্ত মেনে নেওয়া যাবে না। প্রয়োজন হলে ‘TRIPS flexibilities’ বজায় রাখার বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় ওষুধ শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) বিনিয়োগ বৃদ্ধি অপরিহার্য। দেশীয় কোম্পানিগুলোকে উদ্ভাবনী ওষুধ এবং বায়োসিমিলার উৎপাদনে উৎসাহ দিতে সরকারি প্রণোদনা, কর ছাড় এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া উচিত। এতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সহজ হবে।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়াতে মান নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা উন্নয়ন জরুরি। ইউএস FDA বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জনের জন্য অবকাঠামো ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে। এর মাধ্যমে রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়বে এবং বাণিজ্য চুক্তির ইতিবাচক দিকগুলো কাজে লাগানো যাবে।
চতুর্থত, ওষুধের মূল্য ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। যদি কঠোর পেটেন্ট নীতির কারণে ওষুধের দাম বেড়ে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং (compulsory licensing) ব্যবহারের প্রস্তুতি রাখতে হবে।
পঞ্চমত, বাণিজ্য আলোচনায় স্বচ্ছতা ও স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প মালিক, বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের মতামত নিয়ে একটি সমন্বিত অবস্থান তৈরি করলে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা সহজ হবে।
সবশেষে, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জোট গড়ে তুলে সমমনা দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো দরকার। তাতে শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ করা সম্ভব হবে। সমন্বিত ও দূরদর্শী কৌশল গ্রহণের মাধ্যমেই বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পকে সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে টেকসই অবস্থানে নেওয়া সম্ভব। বস্তুত মার্কিন এই বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জই বটে। তবে যথাযথ প্রস্তুতি ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারলে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা কঠিন কিছু নয়। অন্যথায় দেশের এ গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতটি বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে।
মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল
কলাম লেখক ও শিল্পোদ্যোক্তা