সহিদুল আলম স্বপন
প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬ ১৫:৫০ পিএম
বাংলাদেশ-ইইউ নতুন অংশীদারত্ব চুক্তি একটি সুযোগ, তবে এটি একই সাথে একটি পরীক্ষাও বটে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তিটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। দুই দশকেরও বেশি সময় পর ২০০১ সালের সহযোগিতা চুক্তির স্থলে এই নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু এই উত্তেজনা ও উচ্ছ্বাসের আড়ালে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে যায়, যেগুলো নিয়ে শান্ত মাথায় ভাবা দরকার। চুক্তির সুফল কতটুকু, আর ঝুঁকিই-বা কোথায় সেই বিশ্লেষণ এখন সময়ের দাবি।
২০০১ সালের ইইউ-বাংলাদেশ সহযোগিতা চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষত ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) সুবিধার আওতায় বাংলাদেশ ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়েছিল, যা দেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৫০ শতাংশেরও বেশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে যায়, যা এই সম্পর্কের গভীরতা ও গুরুত্বকে স্পষ্ট করে তোলে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, কেবল বাণিজ্য ও উন্নয়নকেন্দ্রিক একটি চুক্তি আধুনিক বিশ্বের জটিল চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন সংকট, জ্বালানি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো পুরনো চুক্তির আওতার বাইরে ছিল, যা নতুন চুক্তির প্রয়োজনীয়তাকে অনস্বীকার্য করে তুলেছিল।
নতুন অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি শুধু বাণিজ্য ও উন্নয়নের গণ্ডি পেরিয়ে অনেক বিস্তৃত পরিসরে প্রসারিত হয়েছে। এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে নিয়মিত রাজনৈতিক সংলাপ, নিরাপত্তা সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি খাতে সহযোগিতা, পরিবহন ও সামুদ্রিক বিষয় এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের বিভিন্ন দিক। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের প্রেক্ষাপটে ইইউ এই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাইছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তারের বিপরীতে পশ্চিমা শক্তিগুলো বাংলাদেশকে তাদের কৌশলগত বলয়ে আনতে আগ্রহীÑ এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
বর্তমান বিশ্বে মহাশক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জোটের পুনর্গঠন- সবকিছু মিলিয়ে বিশ্ব রাজনীতি এখন এক অস্থির মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে ‘যে আমার সাথে নেই, সে আমার শত্রু’ এই পুরনো কিন্তু বিপজ্জনক নীতি আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই মেরুকরণের যুগে যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত ও চীন উভয়ের সাথেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগকারী ও বাণিজ্যিক অংশীদার। ভারতের সাথে রয়েছে গভীর সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বন্ধন। এই দুই শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর ওপর যদি ইইউর সাথে কৌশলগত ও নিরাপত্তা সম্পর্কের নতুন মাত্রা যোগ হয়, তাহলে এই ভারসাম্য রক্ষা করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা থেকে এই উদ্বেগের যৌক্তিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির মূল্যায়নে সবার আগে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নটি সামনে আসা উচিত। বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা এবং রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই সমাধান। এই লক্ষ্যগুলো অর্জনে ইইউর সাথে অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক সহযোগিতা অবশ্যই কাজে আসবে। কিন্তু এর বাইরে গিয়ে ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে পড়া বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। বিশেষত স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হওয়ার পর বাংলাদেশ ইবিএ সুবিধা হারাবে। সেই পরিস্থিতিতে ইইউর সাথে একটি শক্তিশালী বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কাঠামো বজায় রাখা অপরিহার্য। কিন্তু এই অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তাকে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির সাথে গুলিয়ে ফেলা সংগত হবে না।
এই জটিল পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারকে অত্যন্ত সুচিন্তিত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু উচ্ছ্বাসে ভেসে না গিয়ে বাস্তববাদী কূটনীতির পথে এগিয়ে যাওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। চুক্তির প্রতিটি ধারা ও উপধারা সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করে নিশ্চিত করতে হবে যে, কোনো বিষয়েই বাংলাদেশ এমন কোনো প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হচ্ছে না, যা ভবিষ্যতে দেশের সার্বভৌমত্ব বা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কূটনৈতিক ভাষার আড়ালে অনেক সময় বাধ্যবাধকতা লুকিয়ে থাকে, যা পরবর্তীতে একধরনের শৃঙ্খল তৈরি করে। চুক্তি স্বাক্ষরের সময় সতর্ক না হলে পরবর্তী সময়ে তা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্যবাহী মূলনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’Ñ এই নীতিকে আরও সুদৃঢ়ভাবে অনুসরণ করতে হবে। ইইউর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি চীন, ভারত, রাশিয়া ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও সমান গুরুত্বে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। কোনো একটি শক্তির দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়া বিপজ্জনক। একই সঙ্গে ইইউর সাথে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংলাপের বিষয়গুলোতে অংশগ্রহণ করলেও তা যেন কোনো নির্দিষ্ট সামরিক জোট বা কৌশলগত বলয়ে আটকে না ফেলে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরি। সংলাপে অংশগ্রহণ এবং জোটে আবদ্ধ হওয়াÑ এই দুটির মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য অনুধাবন করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী সময়ে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের শুল্কসুবিধা নিশ্চিত করতে একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বা জিএসপি+ সুবিধার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। অর্থনৈতিক সুবিধাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি সহযোগিতার মতো বিষয়গুলোতে ইইউর সাথে সক্রিয় অংশীদারত্ব গড়ে তোলার পাশাপাশি জলবায়ু তহবিল ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি আদায় করতে হবে। কেননা, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ইইউর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগে ইইউর ভূমিকা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সংকটের সমাধান না হলে বাংলাদেশের ওপর মানবিক ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি সংসদ ও নাগরিক সমাজের সাথে পরামর্শ করে চুক্তির বিষয়বস্তু সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক চুক্তির বিষয়গুলো কেবল সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই করা উচিত, কারণ এই চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনে।
বাংলাদেশ-ইইউ নতুন অংশীদারত্ব চুক্তি একটি সুযোগ, তবে এটি একই সাথে একটি পরীক্ষাও বটে। সুযোগটি হলো অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জলবায়ু সহায়তা ও উন্নয়নমূলক অংশীদারত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচন। আর পরীক্ষাটি হলো ভূ-রাজনৈতিক চাপের মুখে নিজের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ধরে রাখার সক্ষমতা প্রদর্শন। বাংলাদেশ কোনো বৃহৎ শক্তির দাবার ঘুঁটি নয়। এই দেশের রয়েছে নিজস্ব স্বপ্ন, নিজস্ব লক্ষ্য এবং নিজস্ব পরিচয়। সেই পরিচয়কে অক্ষুণ্ন রেখে বিশ্বের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলাই হবে প্রকৃত কূটনৈতিক সাফল্য। কৌশলগত চুক্তির মোহে পড়ে জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশ যেন নিজের ভারসাম্য না হারায়Ñ এটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সহিদুল আলম স্বপন
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও কবি