× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হাওরে ফসলহানি: সংকটের স্বরূপ

রাসেল আহমদ

প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬ ১৪:৩৪ পিএম

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরজুড়ে হাজার হাজার হেক্টর জমির কাঁচা ধান পানিতে তলিয়ে পচে নষ্ট হয়েছে।  ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরজুড়ে হাজার হাজার হেক্টর জমির কাঁচা ধান পানিতে তলিয়ে পচে নষ্ট হয়েছে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরজুড়ে গেল মার্চে কয়েক দিনের টানা অতিবৃষ্টিতে তৈরি হয়েছিল দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। তখন হাজার হাজার হেক্টর জমির কাঁচা ধান পানিতে তলিয়ে পচে নষ্ট হয়েছে। অবশিষ্ট ফসল বাঁচাতে কৃষকদের দিন-রাত নিজ খরচে সেচ পাম্প চালিয়ে পানি নামাতে হয়েছে। আমি হাওরের মানুষÑ এই দৃশ্য আমার কাছে কোনো পরিসংখ্যান নয়; এটি চোখের সামনে কৃষকের সারাবছরের সাধ-সাধ্য, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ ডুবে যাওয়া অনিশ্চিত জীবনের বাস্তব গল্প। 

মার্চের জলাবদ্ধতায় ফসলহানির ক্ষত শুকানোর আগেই গত ২৬ এপ্রিল থেকে আবারও ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে নদনদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকে। আর হাওরের ভেতরে পানি জমে নতুন করে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এতে ঘটে ব্যাপক ফসলহানি। সরকারি ভাষ্যে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, হবিগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ হাওরের সাত জেলায় প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কৃষকের দাবি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, হাওরের সাত জেলায় চলতি মৌসুমে বোরো আবাদ হয়েছিল ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৯ লাখ ২৫ হাজার টনের বেশি। এর মধ্যে প্রায় তিন লাখ হেক্টরের ধান কাটা গেলেও বাকিটা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে। তবে সরকারি পরিসংখ্যান মানতে রাজি নন কৃষক। তাদের মতে, অনেক বেশি জমি পানিতে তলিয়েছে, ধানকাটা হয়েছে আরও কম। সেই সাথে কাটা ধান শুকাতে না পেরে ক্ষতির পরিমাণও বেড়েছে। এত ক্ষতির পরও আবহাওয়ার পূর্বাভাসে স্বস্তি মেলেনি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, হাওরের চার জেলাÑ সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার বন্যার উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে।

একদিকে বন্যার শঙ্কা, অন্যদিকে স্থির পানিতে ডুবে যাওয়া ফসলÑ এই দ্বিমুখী চাপের মধ্যে হাওরের কৃষক আজ অসহায়। এই সংকটকে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতার বড় অংশ আড়াল হয়ে যায়। হাওরের বর্তমান পরিস্থিতি জলবায়ু পরিবর্তন, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, নীতিগত সীমাবদ্ধতা এবং ক্রমবর্ধমান বাজার-নির্ভরতার সম্মিলিত ফল। কিন্তু এর ভেতরে কিছু নির্দিষ্ট কারণ আছে, যেগুলো এড়ানো যেত এবং যেগুলোর দায় এড়ানো যায় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সময় নিয়ে। গত কয়েক বছর ধরে হাওরে চৈত্রের শেষ থেকে বৈশাখের শুরুতেই বোরো ধান কাটা প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু এবার বৈশাখের তৃতীয় সপ্তাহেও অধিকাংশ জমির ধান পরিপক্ব হয়নি। 

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এখানে স্পষ্ট। হাওরে বন্যার সময় এগিয়ে আসছে; মার্চের শেষ দিকেই অনেক স্থানে পানি ঢুকে পড়ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের পরিমাণও বেড়েছে। ফলে কৃষি ক্যালেন্ডার আর পূর্বের মতো কার্যকর থাকছে না। কৃষক পুরনো অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে নতুন উপকরণ ও পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না। এই বাস্তবতায় অভিযোজনযোগ্য কৃষি কৌশল ছাড়া সামনে এগোনোর কোনো পথ নেই।

যদিও এই অবস্থায় ফসলরক্ষা বাঁধ হওয়ার কথা ছিল প্রধান প্রতিরক্ষা। কিন্তু বাস্তবে সেটিই এ বছর বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক বছরে আগাম বন্যা থাকলেও বর্তমানের মতো দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এত প্রকট ছিল না। এখন দেখা যাচ্ছে, অপরিকল্পিত ও দুর্বল বাঁধ নির্মাণের ফলে বাঁধের মাটি বর্ষায় পানির চাপে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথÑ খাল ও নালাগুলোকে ধীরে ধীরে ভরাট করে দিয়েছে। নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হওয়ায় অতিরিক্ত পানি বের হতে পারছে না। একই সাথে উজানের ঢলে আসা কোটি কোটি টন পলি হাওরের তলদেশেও জমা হচ্ছে। ফলে হাওরগুলোর পানির ধারণক্ষমতা কমছে আর নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হওয়ায় অতিরিক্ত পানি বের হতে পারছে না।

যখন নদনদীর পানি বাড়ে, তখন দুর্বল বাঁধগুলো অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতে না পেরে ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। অর্থাৎ, একদিকে বাঁধ পানি আটকে ফসল ডুবিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে ভেঙে গিয়ে আরও বড় ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি করছে, একটি নির্মম দ্বিমুখী সংকট।

মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে যে অভিযোগগুলো শোনা যাচ্ছেÑ পিআইসি গঠনে বিলম্ব, কাজের মান নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি, নির্ধারিত উচ্চতা বজায় না রাখা, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, সময়মতো কাজ সম্পন্ন না হওয়াÑ এসব আর বিচ্ছিন্ন অভিযোগ নয়; এগুলো একটি কাঠামোগত সমস্যার লক্ষণ। প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও যদি বাঁধ টেকসই না হয়, তবে প্রশ্ন তো উঠবেইÑ এই বিনিয়োগের জবাবদিহিতা কোথায়?

এই খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন অনিবার্য। বাঁধ নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও কারিগরি স্তরের সকল পক্ষের কার্যক্রম একটি নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। যেখানে অনিয়ম, দুর্নীতি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মিলবে, সেখানে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারণ দুর্বল অবকাঠামোর দায় শেষ পর্যন্ত কৃষককে বহন করতে হয়, যা কোনোভাবেই ন্যায্য নয়।

এদিকে মাঠপর্যায়ে শ্রম ও যন্ত্র সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জলাবদ্ধতার কারণে অনেক জায়গায় হারভেস্টর ব্যবহার করা যাচ্ছে না। স্থানীয়ভাবে শ্রমিক স্বল্পতা ও উচ্চ মজুরি কৃষকের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। যন্ত্রের ভাড়া বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত যন্ত্রের অভাব এবং জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা উৎপাদন প্রক্রিয়াকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। হাওরের বাস্তবতায় এক দিনের বিলম্বও পুরো মৌসুমের ক্ষতির কারণ হতে পারেÑ এটি কেবল একটি বাক্য নয়, এটি প্রতিদিনের বাস্তবতা।

এই বাস্তবতায়, রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ শক্তি ও আন্তরিকতা নিয়ে হাওরবাসীর পাশে দাঁড়াতে হবে। স্বচ্ছতার সাথে দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব নিরূপণ করে পুনর্বাসন ও প্রণোদনা সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। হাওরের বর্তমান সংকট আমাদের সামনে একটি কঠিন সত্য তুলে ধরেছে, জলবায়ু পরিবর্তন যেমন বাস্তব, তেমনি নীতিগত দুর্বলতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতিও বাস্তব। এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবই আজকের এই বিপর্যয়কে গভীর করেছে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়, কৃষি কি কৃষকের হাতেই ফিরবে, নাকি নিয়ন্ত্রণহীন এক ব্যবস্থার ভেতরেই ডুবে থাকবে?


রাসেল আহমদ

সাংবাদিক ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা