হোসেন শহীদ মজনু
প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬ ১১:০২ এএম
হাম আক্রান্ত শিশু রবিউলকে নিয়ে তার নানা মঙ্গলবার ডিএনসিসি হাসপাতালে আসেন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
হাম আক্রান্ত শিশুর ছবিটি হয়তো আমরা দেখেছি কিংবা দেখিনি। সুযোগ থাকলে একবার দেখুন, তারপর চোখ বন্ধ করে এক মিনিট ভাবুন। সে যদি আমার বা আপনার সন্তান হতোÑ তাহলে প্রতিক্রিয়া কেমন হতো। ছবিটি প্রতিদিনের বাংলাদেশে মঙ্গলবার প্রধান খবরের মাঝখানে ছাপা হয়েছেÑ হামজর্জরিত একটি শিশুর মুখ। ছবিটির দিকে তাকিয়ে বলুনÑ কতক্ষণ চোখ রাখতে পেরেছেন এটির দিকে? কয়েক সেকেন্ডের বেশি কি তাকিয়ে দেখা যায়Ñ বিস্ফোরণোন্মুখ যন্ত্রণাকাতর এ মুখ! ফুলের মতো পবিত্র মুখে ভর করেছে পৃথিবীর সমান দুঃখ-কষ্ট। বেদনার নীল প্রকাশিত হয়েছে লালিমায়! তাকে আদর করার কোনো জায়গা নেই মায়ের! মায়ের মধুর চুমুও ছোট্ট প্রাণে নরকযন্ত্রণা যেন! ছোট্ট শিশুর এ প্রাণ সইবে কত আর?
এমন ছবি এখন দেশের আনাচে-কানাচে, মা-বাবার কোলজুড়ে ফুটফুটে কষ্ট আর কষ্ট। মাত্র ৫০ দিনে হাম ও উপসর্গে সারা দেশে প্রাণ গেছে ৩১১ শিশুর। গড়ে প্রতিদিন ‘অদূরদর্শিতার বলি’ ৬টি নতুন প্রাণ। শিশু হারানোর কান্নায় জর্জরিত হাসপাতালের পরিবেশ! মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত মারা গেছে আরও ৬ শিশু। অব্যক্ত বেদনায় নীল ভুক্তভোগী মা-বাবার অন্তর। বুকফাটা হাহাকার বাতাসে ছড়িয়ে পড়লেও কোথাও কোনো কাঁপন নেই যেন! সবকিছুই যেন স্বাভাবিক। এটাই সবচেয়ে বড় অস্বাভাবিক ব্যাপারÑ পুরো দেশ, জাতি, সরকার-রাষ্ট্র সবাই কি নির্বিকার?
না ঠিক তেমনটি নয়, যেমন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী (স্বাস্থ্য) প্রায় প্রতিদিনই কথা বলছেন, সোমবারও বলেছেন। হ্যাঁ কথাই হয়তো বেশি বলছেন তিনি। কাজটা কম হচ্ছে, তা না হলে দিনকে দিন সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যাটা শুধু বাড়ছেই। আগের রেকর্ড ম্লান হচ্ছে, নতুন রেকর্ডের আধিপত্যে ছোট্ট-কোমল একেকটি প্রাণ করুণ নির্মমতায় শুধু সংখ্যায় রূপান্তরিত হচ্ছে। দেশে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ‘আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যে হামের সংক্রমণ কমে আসবে। একই সঙ্গে আমরা আসন্ন ডেঙ্গু ঝুঁকি সামলাতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ কী নির্মম পরিহাস, যেদিন হামে মৃত্যুর আগের রেকর্ড ভাঙল, সেদিন সোমবার রাজধানীর বনানীতে এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বললেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমানে হামের প্রকোপ মোকাবিলায় বিশেষায়িত ওয়ার্ড স্থাপন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় এর সংখ্যা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
কথার ফুলঝুরিতে হামের প্রশমন হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না, সেটা একটা প্রশ্ন। আরেকটি প্রশ্নÑ কাদের জন্য, কী কারণে হামের এই প্রাদুর্ভাবÑ সেটির উত্তর আমরা অনেকে জানি, অনেকে জানি না। নতুন করে তাই আরেকবার একটু জানার চেষ্টা করতে পারি আমরা। মাত্র বছর দেড়-দুই আগেও টিকাদানের ক্ষেত্রে সফল হিসেবে বিবেচিত ছিল বাংলাদেশ। হাম নির্মূল হয়েছিল, সেই হামের এত সংক্রমণ ও এত মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে মঙ্গলবারই আরেকটি জাতীয় দৈনিকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন টিকাদানে সফলতার গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার আগে ইউনিসেফ ও গ্যাভি যৌথভাবে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট থেকে সংগৃহীত টিকা বাংলাদেশে সরবরাহ করত, কিন্তু গত বছর হঠাৎ এই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া বলেছেন, বিশ্বব্যাপী টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ইউনিসেফ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশ সরকার-ইউনিসেফের আনুষ্ঠানিক চুক্তির আওতায় এই সহায়তা দেওয়া হয়ে আসছে, যার ফলে সময়মতো, সাশ্রয়ী এবং সমতাভিত্তিকভাবে টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ৫০ শতাংশ টিকা ওপেন টেন্ডার মেথডে (উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি) কেনার বিষয়টি বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেয়। ইউনিসেফ ও তাদের অংশীদারেরা তখন উদ্বেগ জানায় যে এই প্রক্রিয়ায় সামগ্রিক ক্রয়প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত বিলম্বিত হতে পারে। এসব উদ্বেগ সত্ত্বেও উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে এগোনোর সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়। দুঃখজনক হচ্ছে, এ সিদ্ধান্তের ফলে টিকা সংগ্রহে বিলম্ব ঘটে। ২০২৫ সালে ইউনিসেফ আগাম অর্থায়নের ব্যবস্থা করে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ নিশ্চিত করে, যাতে তীব্র সংকট মোকাবিলা করা যায়। এর ফলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কিছু টিকার মজুদ বজায় রাখা সম্ভব হয়। তবে কিছু টিকার ক্ষেত্রে এর আগেই মজুদ শেষ হয়ে যায় এবং কিছু টিকার ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঘাটতি দেখা দেয়। অর্থছাড়ে বিলম্ব এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে টিকা সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়। কারণ উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ সম্পন্ন করা যায়নি এবং অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফকে বরাদ্দ দেওয়া অর্থও ছাড় করতে পারেনি।
আমাদের জানামতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদের প্রথম অধিবেশনে অন্তত দুবার হামে শিশুদের প্রাণহানির বিষয়ে কথা বলেছেন। ২২ এপ্রিল সংসদ অধিবেশন চলাকালীন প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিশুদের হামের টিকা বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সবাই মিলে স্বৈরাচারকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিশুদের হামের টিকা বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়নি।
৩০ এপ্রিল সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণেও প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিহাস নিয়ে অনেক বিতর্ক করা যাবে। কিন্তু এ বিতর্ক হামের শিকার বাচ্চার মায়ের মন শান্ত করতে পারবে না, বেকারের কর্মসংস্থান করে দিতে পারবে না। তিনি বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুর জন্য ওষুধের ব্যবস্থা করতে হবে। বেকার যুবকের কর্মসংস্থান করতে হবে।
ইউনিসেফ কর্মকর্তা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেনÑ এরপরও অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও তার স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেই। ওই সরকারের অন্য কোনো উপদেষ্টা কিংবা প্রেস উইংয়েরও ‘রা’ নেই। কিন্তু বক্তব্য নেই কেন? তাদের অদূরদর্শিতার কারণে প্রতিদিন গড়ে ছয়জন মায়ের কোল খালি হচ্ছে। এর দায় কে নেবে? আমরা চাইব দ্রুতই বাংলাদেশ থেকে হাম নির্মূল হোক। অন্তর্বর্তী সরকারসহ যারা এই হাম উপদ্রবের প্রাদুর্ভাবের পেছনে রয়েছে, তাদের সবাইকে সামনে আনা হোক।
বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র আড়াই মাস। হামে যেসব শিশু মারা যাচ্ছে তাদের অধিকাংশের বয়সের চেয়ে বর্তমান সরকারের বয়স কম। সে অর্থে সরকারও শিশু। ছোটবেলার একটা বিষয় আমাদের সবারই মনে আছে নিশ্চয়Ñ বিশেষত আমরা যারা গ্রামে বড় হয়েছি; পিঠাপিঠি ভাইবোন কিংবা ভাইভাই হলে বড়টি ছোটটাকে কোলেপিঠে করে দিনভর ঘুরে বেড়াত। মাঝেমধ্যে ছোটটিরও সাধ হতো বড়টিকে কোলে নেবার। সেই চেষ্টায় বড়টিকে বুকে চেপে টেনেটুনে উঁচু করে হাঁটতে গিয়ে অনেক সময়ই দুজন চিৎপটাং! কখনও নিজের চেয়ে বেশি ওজনের শিশুকে আরেক শিশু কোলে নিতে পারলেও শেষরক্ষা হয় না, এটাই বাস্তবতা। তারপরও প্রাণপণ চেষ্টায় কোনো শিশু কিছুক্ষণের জন্য সফল হলে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তে বড়রা কেউ তাদের ধরে রক্ষা করত।
আড়াই মাস বয়সী এ সরকারের ঘাড়ে এখন শুধু হাম নয়, বাড়তি চাপ হয়ে এসেছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকট, বিদ্যুতের লোডশেডিং, আগাম ঝড়-বৃষ্টির প্রকোপ, হাওরের ব্যাপক ফসলহানি। কোন দিকে যাবে সরকার? কোনটা রেখে কোনটা সামলাবে? তবে সরকারের চেষ্টা ও সদিচ্ছা আছে বলেই সমুদ্রে ডুবে যাওয়া মানুষ যেমন খড়কুটোকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়, তেমনি তারাও কোনোমতে; কোনোভাবে সবদিক সামলানোর প্রাণান্ত চেষ্টায় অনড়। কিন্তু দৃশ্যমান অগ্রগতি উল্লেখ করবার মতো সময় এখনও আসেনি। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, দায়িত্বশীলদের মনে রাখা উচিতÑ এখন আর মানুষ কথার জাদুতে ভুলতে চায় না, কাজের ফল ভোগ করতে চায়। তাই কথা কমিয়ে দায়িত্বে বেশি মনোযোগ দেওয়া জরুরি তাদের। কীভাবে, কত দ্রুত হাম নিয়ন্ত্রণ করা যাবেÑ সেই পথে হাঁটা সময়ের দাবি।
লেখক: উপসম্পাদক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ