× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জন্মদিনে গুণী শিক্ষককে স্মরণ

ইমাম গাজ্জালী

প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৬ ১৮:২৪ পিএম

মজিবুর রহমান বিশ্বাস। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মজিবুর রহমান বিশ্বাস। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

যে সমাজে গুণীর কদর নাই, সেই সমাজে গুণী জন্মাতে পারে না। যদিওবা সেই সমাজে কোনো গুণী ব্যক্তিত্বের জন্ম হয় তাকে বরণ করতে হয় প্রমিথিউসের পরিণতি। সেটা অনেকটা দুর্ঘটনার মতো, মুজিবর রহমান বিশ্বাসের জন্ম সেই রকম এক দুর্ঘটনা। গুণীর যথাযথ মূল্যায়নের বিপরীতে তাকেও বরণ করতে হয়েছিল সীমাহীন লাঞ্ছনা আর অপমান আর নিগ্রহ। গ্রামীণ সমাজ তাকে গ্রহণ করতে পারেনি, তাকে মর্যাদা দিতে পারেনি, মূল্যায়ন তো দূরের কথা। মুজিবর রহমান বিশ্বাস নিজের জীবন দিয়ে সেটা প্রমাণ করেছেন।

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে গুণীর কদর নেই। সেখানকার মানুষ অর্থ বিত্ত প্রভাবের কাছে মাথা নোওয়ায়। সেই অর্থ বিত্ত ক্ষমতা ও প্রভাব অন্যায় পথে অর্জিত হলে তাকে প্রশ্ন করতে পারে না। ক্ষমতা গণবিরোধী হলে তার কদর করতে কসুর করে না। এই কারণে মুজিবর রহমান বিশ্বাস সাধারণের কাছে ‘পাগল’ বলে সম্মোধিত ছিলেন।

মুজিবর রহমান বিশ্বাস ছিলেন বিদগ্ধ সাহিত্য সাধক, বাংলা একাডেমীর ফেলো লেখক গণবুদ্ধিজীবী, লেখক ও শিক্ষক। জ্ঞান তাপস এই ব্যক্তি তখনকার দিনে সিরাজগঞ্জ মহুকুমার প্রত্যন্ত কামারখন্দ থানার জামতৈল ধোপাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করতেন।

স্কুলটির সৌভাগ্য যে এমন একজন ব্যক্তিত্ব সেখানে শিক্ষকতা করেছেন। একই সঙ্গে কামারখন্দবাসীল গর্ব যে এমন একজন গুণী ব্যক্তি তাদের এলকায় আলো ছড়াতে চেয়েছেন। কিন্তু এটা তাদের দুর্ভাগ্য যে, সেই গর্ব করতে তারা ভুলে গেছেন।

ভাষা আন্দোলনকালে মুজিবর রহমান বিশ্বাস কারাবন্দি ছিলেন, একই জেলে সে সময় শেখ মুজিবর রহমানও জেলবন্দি ছিলেন। দু’জনের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। শেখ মুজিবর রহমান তাকে ‘জেল মিতা’ বলে ডাকতেন। অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন মুজিবর রহমান বিশ্বাস। আমাদের জানামতে বই লিখেছেন চুয়ান্নটি।

তিনি ছিলেন স্বল্পাহারী, বিয়ে করেছিলেন সংসার টিকেনি। যথেষ্ট পরিস্কার ছিল না তার পোশাক আশাক। পড়তেন পাঞ্জাবি পাজামা। শিক্ষকতার বেতনের টাকায় বই কিনতেন, পড়তেন আর লিখতেন। তৃণমূলের ক্ষুদ্র স্বার্থবোধ, ফালতু অহং ও সংকীর্ণ মনোভাবকে তিনি বরদাস্থ করতে পারতেন না।

‘শিক্ষার সমস্যা’ নামে লিখিত এক বইয়ে তিনি বলেছেন, ‘... বর্তমান সমাজের মাতব্বর কারা? টাউট বাটপার, চোর গুণ্ডা, হীনমনা সংকীর্ণদেরই রাজত্ব। তিনি আরো লিখেছেন, ‘... এই ছন্নছাড়া অভিশপ্ত জীবনের শেষ পর্বে চৌরাস্তার উপর দাঁড়িয়ে আজ কী দেখছি? আমি দেখছি প্রতিনিয়ত মানুষ তার আত্মাকে হারাচ্ছে, কিছুমাত্র উদারতাকে গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে। এ যুগ উঠতি মধ্যবিত্তের ফালতু দেমাগের যুগ, বর্ব্বর, হীন, সংকীর্ণমনা শিক্ষকের যুগ। হায়রে মানুষ্যত্ববিহীন শিক্ষক ও ছাত্র। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উচ্ছৃঙ্খল বদমাইস ছাত্রদের ও অমানুষ লোভী শিক্ষকদের জমিদারীতে পরিণত হয়েছে।’

আরো বলেছেন, ‘ছাত্ররা আজকাল শিক্ষকের সঙ্গে প্রাণের সম্পর্ক রাখতে চায় না। তারা উচ্ছৃঙ্খল বেয়াদব হয়েছে, এসবই মানলাম কিন্তু শিক্ষকদের ইঙ্গিত না থাকলে ছাত্র শিক্ষককে করে পিটায়। .... শিক্ষক যদি লোভী সংকীর্ণ হীনমনা ও ক্ষুদে দাম্ভিক হয় তাহলে তাকে দিয়ে কোনো আশা নাই।’

একই বইয়ের এক জায়গায় তিনি আরো বলেছেন,... শিক্ষকরাই ছাত্রদের প্রাইভেট পড়ানোর ও পরীক্ষায় অসুদুপায় অবলম্বনের মধ্যে রেখেছে। সমাজ পরিবর্তন ও শিক্ষার মানবিক মূল্যবোধের ধার তথা কথিত শিক্ষকরা ধরে না। বহু শিক্ষক গ্রাম্য টাউটগিরিতে লিপ্ত। ...পরীক্ষায় নকল ও প্রাইভেট পড়ানো-এই দুটো অভ্যাসকে তথা কথিত শিক্ষকরাই টিকিয়ে রেখেছেন।’

খুব ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘উলুবনে মুক্তা ছড়ানো যে পাপ, এইটে জীবনমূল্যে বুঝতে পেরেছি। আমাদের নিজেদের দোষ তাহলে কী? আমাদের কোনো সাংসারিক জ্ঞান ছিল না। এবং মানুষকে মর্মান্তিক ও তীব্রতার সঙ্গে ভালোবাসা সকল ক্ষেত্রে যে উচিত নয় বরং অনুচিত এইটে বুঝতে পারিনি।

আমার আর একটি দোষ, কোনো এক জায়গায় গেলে কতদিন থাকতে পারব, সেটা না জেনেই মনে করেছি এখানে জুঝি অনেকদিনের জন্য ঠাঁই হবে।...শিক্ষকতার জীবনে কোনো অবস্থাতেই বালকের মন সংকীর্ণ হয়ে উঠুক এইটে মানতে পারিনি। এবং পারিনি বলেই এত মাথা কুটাকুটি।’

তাহলে কোনো ভালো শিক্ষকই নেই। এর জবাবে তিনি নিজের একজন মহান শিক্ষকের উদাহরণ টেনে বলেছেন, ‘ আমার পরম পূজণীয় শ্রীযুক্ত মণীন্দ্র কুমার ঘোষের কথা বলছি। তিনি ছিলেন মহান গুরু, মহান ঋত্বিক ও মহান পথ প্রদর্শক। তার কাছেই শিক্ষা পেয়েই আমরা পৃথিবীর পথে জীবনের পথে হাঁটতে শিখেছি। তিনিই তো আমাদের অনেকের শিক্ষা ও দীক্ষাদাতা ছিলেন।’ উল্লেখ্য মণীন্দ্র ঘোষের ছেলে বিখ্যাত কবি শঙ্খ ঘোষ। মণীন্দ্র ঘোষ ছিলেন ঈশ্বরদীর পাকশির চন্দ্র প্রভা স্কুলের শিক্ষক।

আজ ৫ মে, এই মহান শিক্ষক মুজিবর রহমান বিশ্বাসের ১০১ তম জন্মদিন। এই দিনে স্যারের প্রতি অকৃত্রিম শ্র্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসা।


ইমাম গাজ্জালী
সাংবাদিক ও লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা