মো. ইলিয়াস হোসেন
প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৬ ১৪:৩১ পিএম
আপডেট : ০৫ মে ২০২৬ ১৫:২১ পিএম
বাংলাদেশের অর্থনীতি এগোচ্ছে, অবকাঠামো বাড়ছে, দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে। কিন্তু আমরা কী জানি, দেশের এই দ্রুত নগরায়ণ এবং অগ্রগতি একটি সংকটপূর্ণ পর্যায় অতিক্রম করছে। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন, অর্থনৈতিক কার্যক্রমের অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা; এই সবগুলো মিলে নগর ব্যবস্থাপনাকে একটি জটিল সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই অগ্রগতির মাঝেই আবার একটি মৌলিক খাত ক্রমশ ভেঙে পড়ছে, তা হলো সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থা। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নগরজীবনের মূল চালিকাশক্তি হলো সড়কভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই ব্যবস্থাই আজ বহুমাত্রিক সংকটে জর্জরিত। বিশেষ করে, ঢাকা শহর আজ এমন এক বাস্তবতায় পৌঁছেছে, যেখানে যানজট এখন আর সাময়িক অসুবিধা নয়; এটি প্রতিদিনের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য দুর্ভোগ এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর এক নীরব বোঝা। রাজধানী ঢাকা বিশেষভাবে অতিরিক্ত জনঘনত্ব, তীব্র যানজট, পরিবেশগত অবক্ষয় এবং অপর্যাপ্ত সেবা প্রদানের সমস্যায় অতিমাত্রায় চাপের মধ্যে রয়েছে। ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন যে দৃশ্য দেখা যায়, তা কোনো উন্নয়নশীল দেশের রাজধানীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা, অগণিত সড়ক দুর্ঘটনা, বিশৃঙ্খল বাস চলাচল, ফুটপাত দখল ইত্যাদিসহ ব্যাপক অব্যবস্থাপনা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ একত্রে এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, যেখানে দৈনন্দিন যাতায়াত কেবল সময়সাপেক্ষই নয়, বরং অনিরাপদ ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। ঢাকার প্রধান সড়কের একটি বড় অংশ কার্যত দখল হয়ে থাকছে অবৈধ পার্কিং, হকার এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার দ্বারা। ফলে কাগজে যে সড়কের প্রস্থ ৬০ ফুট, বাস্তবে তা অনেক সময় ৩০ ফুটের কমে নেমে আসছে।
এই পরিস্থিতির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো, চাহিদা ও সক্ষমতার মধ্যে বিপুল ব্যবধান। দেশে যানবাহনের সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, সড়ক অবকাঠামো তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। অপরিকল্পিত নগর উন্নয়ন এই সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। বসবাস, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায় মানুষকে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে করে যাতায়াতের চাপ বেড়ে গিয়ে যানজট তীব্রতর হচ্ছে। এই যানজটের ফলে প্রতিদিন লাখ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, জ্বালানির অপচয় হচ্ছে, উৎপাদনশীলতা হ্রাসসহ জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। এ ছাড়াও একাধিক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব একটি বড় সমস্যা। সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ কাজ করলেও তাদের মধ্যে সমন্বয় ও জবাবদিহিতার ঘাটতি স্পষ্ট। আইন থাকলেও তার প্রয়োগে দুর্বলতা এবং শাস্তির নিশ্চয়তা না থাকায় চালকদের মধ্যে নিয়মভঙ্গের প্রবণতা বেড়েছে। এই সমস্যাগুলোর প্রধান কারণ হলো নীতিগত দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা, আইনের শিথিল প্রয়োগ এবং ব্যবহারকারীদের আচরণগত ত্রুটির একটি সম্মিলিত প্রতিফলন।
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য নীতিগতভাবে একটি বড় পরিবর্তন খুব জরুরি। প্রথমত, ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সীমিত সড়কব্যবস্থায় অধিকসংখ্যক মানুষকে পরিবহনের জন্য এটি সবচেয়ে কার্যকর পন্থা। তবে বাস্তবতা হলো, যতই রাস্তা সম্প্রসারণ করা হোক, যদি ব্যক্তিগত গাড়ির প্রবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তবে যানজট কমবে না। দ্বিতীয়ত, পরিবহন ব্যবস্থাপনায় তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এ ক্ষেত্রে একটি ‘কেন্দ্রীয় পরিবহন কর্তৃপক্ষ’ গঠন করে সমন্বিত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ঢাকার বাস সেক্টর কার্যত অরাজক। একই রুটে অসংখ্য বাস কোম্পানির প্রতিযোগিতা, যাত্রী তোলার জন্য রেসিং, এসবই যানজটের অন্যতম কারণ।গণপরিবহন যদি নির্ভরযোগ্য, সময়নিষ্ঠ এবং আরামদায়ক না হয়, তাহলে মানুষ কখনোই ব্যক্তিগত গাড়ি ছেড়ে বাসে উঠবে না। এমতাবস্থায় বাস খাতকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে রুটভিত্তিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালু করা অতীব জরুরি। এগুলো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ ও স্বচ্ছ করে তুলতে পারে। বর্তমানে ঢাকার অধিকাংশ ট্রাফিক সিগন্যাল কার্যকর নয়, ফলে ম্যানুয়াল নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে সময় অপচয় ও বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে কেবল নতুন নতুন সড়ক নির্মাণ এই সমস্যার সমাধান নয়। বরং একটি আধুনিক ‘স্মার্ট ট্র্যাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ চালু করা গেলে এর স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হবে।
ঢাকার অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম অল্প কয়েকটি এলাকায় সীমাবদ্ধ যেমন মতিঝিল, গুলিস্তান, তেজগাঁও, মহাখালী, বনানী, গুলশান, ধানমন্ডি, মিরপুর, উত্তরা ইত্যাদি। এই অঞ্চলগুলোতে প্রতিদিন লাখো মানুষের আগমন ঘটে, যা স্বাভাবিকভাবেই যানজট সৃষ্টি করে। এর একমাত্র সমাধান হলো ‘বিকেন্দ্রীকরণ’। বিকল্প বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে না পারলে এই চাপ কখনও কমবে না। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে বাণিজ্যিক প্রয়োজনে ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে বড় বড় শপিং মল ও বাণিজ্যিক কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ নিয়মিতভাবেই এগিয়ে চলছে। তবে পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা ছাড়া এসব স্থাপনা যানজটের নতুন উৎসে পরিণত হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতের সকল বড় বড় প্রকল্পে মাল্টি-লেভেল পার্কিং বাধ্যতামূলক করা উচিত, যাতে সড়কের ওপর চাপ কমে এবং নগর ব্যবস্থাপনা উন্নত হয়। আরও একটি গুরত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত রেলপথে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লেভেল ক্রসিং রয়েছে এবং প্রতিদিনে উক্ত রেলপথে ৩৫/৪০টা ট্রেন চলাচল করে। ফলে এসব সিগন্যালের কারণে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে ৩/৪ ঘণ্টা সময় যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে, যা যানজটের ক্ষেত্রে আরও একটি প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অবৈধ পার্কিং ও ফুটপাত দখলের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অন-স্ট্রিট পার্কিং নিষিদ্ধ করে নির্দিষ্ট পার্কিং জোন চালু করতে হবে। সিসিটিভি ও স্বয়ংক্রিয় জরিমানার মাধ্যমে ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ট্রাফিক সিগন্যাল অপ্টিমাইজেশন এবং অফিস সময়ের ভিন্নতা চালু করে পিক আওয়ারের চাপ কমাতে হবে। মধ্যমেয়াদি (৩-৫ বছর) পদক্ষেপ হিসেবে কাঠামোগত সংস্কার যেমন বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি চালু করা, কেন্দ্রীয় পরিবহন কর্তৃপক্ষ গঠন এবং কনজেশন প্রাইসিং চালু করতে হবে। বাণিজ্যিক এলাকায় মাল্টি-লেভেল পার্কিং স্থাপন এবং গণপরিবহন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করতে হবে। পাশাপাশি ডেডিকেটেড বাস লেন ও সাইকেল লেন চালু করে বিকল্প পরিবহনকে উৎসাহিত করতে হবে। আর দীর্ঘমেয়াদি (৫-১৫ বছর) পদক্ষেপ হিসেবে ট্রানজিট-ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (টিওডি) বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে মানুষ কম দূরত্বে কাজ ও বসবাস করতে পারে।
বর্তমানে নির্মিত ঢাকা মেট্রোরেল লাইন-৬ ইতোমধ্যেই রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি এখন আর কেবল একটি প্রকল্প নয়; বরং নাগরিক জীবনের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এটি একটি কার্যকর, নির্ভরযোগ্য ও সময়-সাশ্রয়ী গণপরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, যা রাজধানীর হাজারো যাত্রীর দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করেছে। এর নিয়মিততা ও সুবিধা নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক সন্তুষ্টি তৈরি করেছে এবং এটি ঢাকার যানজটপূর্ণ ও বিশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থায় একটি স্থিতিশীলতা এনেছে। তবে এটি কেবল একটা নির্দিষ্ট এলাকা কভার করছে। পুরো ঢাকা শহরকে এই সুবিধা দিতে আরও মেট্রোলাইন নির্মাণ করা প্রয়োজন। মেট্রোরেলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং এর উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে একটি বাস্তবসম্মত ও জনমুখী সিদ্ধান্তের আলোকে ‘ডিএমটিসেল’ কর্তৃক পরিকল্পিত মেট্রোরেল লাইন-১ ও ৫-এর কাজও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। তবে এর পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাজেট নিয়ে কিছুটা বিতর্কের অবতারণা হয়েছে। ফলে কাজের গতি কিছুটা থেমে আছে। এ প্রেক্ষিতে আমাদের সীমিত সম্পদের কথা বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে অবশ্যই এই ধরনের প্রকল্পের ক্ষেত্রে ব্যয় দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ব্যয়বহুল টানেল বোরিং মেশিনের (TBM) ওপর নির্ভর না করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বা হাইব্রিড নির্মাণ কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন কম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কাট-অ্যান্ড-কভার পদ্ধতি ব্যবহার করে ব্যয় কমানো ও কাজের গতি বাড়ানো সম্ভব, আর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিঘ্ন কমাতে TBM ব্যবহার করা যেতে পারে। মেট্রোরেল এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি ঢাকার টেকসই ও বাসযোগ্য ভবিষ্যতের জন্য একটি কৌশলগত প্রয়োজন। তাই ভবিষ্যতে মেট্রোরেল সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ব্যয় সাশ্রয় ও নগর বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
সর্বোপরি ঢাকার যানজট নিরসনের স্থায়ী এবং টেকসই সমাধানে ৩ আর (রোড-রেল-রিভার) মডেল একটি উদ্ভাবনী ধারণা হতে পারে। এই মডেল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা করিডোর বরাবর নদীবেষ্টিত একটি সার্কুলার পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, যা নগরের ওপর চাপ কমাবে এবং বিকল্প চলাচলের পথ সৃষ্টি করবে। এটি শুধু পরিবহন নয়; বরং আবাসন, কর্মসংস্থান ও সেবার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নগর গঠনে সহায়ক হবে।
বাংলাদেশের পরিবহন সমস্যা কেবল সড়কের সংকট নয়; এটি একটি গভর্ন্যান্স সংকট। এর সমাধান একমাত্র সমন্বিত পদ্ধতিতেই সম্ভবÑ যেখানে নীতি, পরিকল্পনা, প্রযুক্তি এবং আচরণগত পরিবর্তন একসাথে কাজ করবে। একটি আধুনিক, নিরাপদ ও দক্ষ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় যানজট ও দুর্ঘটনার এই চক্র ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও নগরজীবনকে আরও জটিল, বিপর্যস্ত ও ব্যয়বহুল করে তুলবে। বাংলাদেশের উন্নয়নকে টেকসই করতে হলেÑ সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থাকে কার্যকর, নিরাপদ এবং আধুনিক করতেই হবে। এ ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ, শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বাস্তবমুখী পরিকল্পনার মাধ্যমেই একটি টেকসই ও বাসযোগ্য নগর ভবিষ্যতের দিকে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারবে।
মো. ইলিয়াস হোসেন
অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এবং কলাম লেখক