প্রাইমা হোসাইন
প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৬ ১৪:২৮ পিএম
বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রুত বিকাশমান একটি উপ খাত হলো ডেইরি শিল্প। যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার পাশাপাশি নাগরিকের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে বড় ভূমিকা রাখছে। এই শিল্পকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা তৈরি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলোÑ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে দুধ ও ডেইরি জাত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা বাড়ছে, যা দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতা চ্যালেঞ্জের মুখে। তবে আশার কথা, সারা দেশে হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ডেইরি খামার গড়ে উঠেছে, যা দেশে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। বহু তরুণ উদ্যোক্তা আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনায় খামার গড়ে তুলে পুষ্টি ও অর্থনৈতিক মুক্তির নতুন আশা দেখাচ্ছেন। এই প্রেক্ষাপটে ডেইরি শিল্প বাংলাদেশের জন্য এক সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তা পেলে দেশের অর্থনীতিতে এই খাতটি হতে পারে সম্ভাবনার দিগন্ত।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে এখন দুধের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১ কোটি ৬২ লাখ মেট্রিক টন। আর উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ মেট্রিক টন। ফলে দুধের ঘাটতি রয়েই যাচ্ছে। মাথাপিছু দৈনিক দুধ গ্রহণের পরিমাণ প্রায় ২২০-২২২ মিলিলিটার, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত ২৫০ মিলিলিটারের চেয়ে কিছুটা কম। তথ্য বলছে, দেশে মাংসের বাৎসরিক চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার মেট্রিক টন এবং উৎপাদন প্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজার মেট্রিক টন। শুধু কাঁচা দুধ নয়Ñ দই, মিষ্টি, ঘি, পনির, বাটার ও পাস্তুরিত দুধের মতো প্রক্রিয়াজাত পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ঘাটতি পূরণের জন্য বাংলাদেশকে দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি করতে হয়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
আমাদের দেশে প্রধানত স্থানীয় জাতের পাশাপাশি পাবনা, সিন্ধি এবং রেড চিটাগং ক্যাটল জাতের গরু পালন করা হয়। তবে দুধের উৎপাদন বাড়াতে সংকর জাতের গরুর প্রতি খামারিদের আগ্রহ বাড়ছে। দুধের গুণগত মান ও জাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। জেনেটিক্স ও বায়োটেকনোলজি ব্যবহার করে উন্নত দেশগুলো গবাদিপশুর উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে, যা বাংলাদেশেও প্রয়োগ করা জরুরি। জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে গবাদিপশুর ডিএনএ বিশ্লেষণ করে উন্নত প্রজনন কৌশল নির্ধারণ করা সম্ভব। বায়োলজিক্যাল মার্কার ব্যবহার করে দুধ উৎপাদন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য দায়ী জিনগুলো শনাক্ত করা যায়। ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন ও ভ্রূণ স্থানান্তর প্রযুক্তির মাধ্যমে উচ্চ উৎপাদনশীল গাভী তৈরি করে দুধের উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব।
ডেইরি শিল্পের উন্নয়ন মানেই গ্রামের সমৃদ্ধি। গবাদিপশু পালন ও দুধ বিক্রির মাধ্যমে গ্রামীণ নারীরা স্বাবলম্বী হচ্ছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে। ডেইরি খামার উত্তরাঞ্চলে বেশি। বর্তমানে খুলনা, যশোর, ময়মনসিংহ ও সাতক্ষীরায় অনেকে কাজ করছেন। এসব খামারের মাধ্যমে অনেকেরই ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে উত্তরাঞ্চলের মতো কাজ করতে পারে, সেজন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার এগিয়ে আসতে পারে। বিশেষ অঞ্চলভিত্তিক ডেইরি হাব গড়ে তুলতে স্বল্প সুদে তহবিল দেওয়া যেতে পারে। দুগ্ধ খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল করতে পারে। বাংলাদেশে ডেইরি শিল্প মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের ওপর নির্ভরশীল। গ্রামাঞ্চলে হাজার হাজার পরিবার গরু পালন করে জীবিকা নির্বাহ করছে। এসব খামার ছোট পরিসরের হলেও সম্মিলিতভাবে তারা দেশের দুধ উৎপাদনের বড় একটি অংশ জোগান দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বেড়েছে, আধুনিক খামার গড়ে উঠছে এবং দুধ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থাও উন্নত হচ্ছে। ফলে এই খাতটি ধীরে ধীরে সংগঠিত রূপ পাচ্ছে।
উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উন্নত জাতের গবাদিপশু, মানসম্মত পশুখাদ্য এবং আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক খামার এখনও প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়, যেখানে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত। ফলে গরুর দুধ উৎপাদন ক্ষমতা কম থাকে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যদি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং গবেষণার মাধ্যমে খামারিদের সহায়তা করে, তাহলে উৎপাদন অনেকগুণ বাড়ানো সম্ভব। ডেইরি শিল্পের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো পশুখাদ্যের উচ্চমূল্য। খামারিদের জন্য খাদ্য ব্যয়ই সবচেয়ে বড় খরচের খাত। বাজারে মানসম্মত খাদ্যের দাম বেশি হওয়ায় অনেক খামারি সঠিকভাবে গরুকে খাওয়াতে পারেন না, যার ফলে উৎপাদন কমে যায়। এ ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে সাশ্রয়ী ও পুষ্টিকর পশুখাদ্য উৎপাদনের ওপর জোর দিতে হবে।
ডেইরি পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় খামারিরা ন্যায্যমূল্য পান না, কারণ তারা সরাসরি বাজারে পৌঁছতে পারেন না। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে দাম কমে যায়। যদি সমবায়ভিত্তিক সংগ্রহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা যায় এবং আধুনিক কোল্ড চেইন গড়ে তোলা হয়, তাহলে খামারিরা লাভবান হবেন এবং ভোক্তারাও নিরাপদ পণ্য পাবেন। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ইতোমধ্যে দেশে বেশ কিছু বড় প্রতিষ্ঠান দুধ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে কাজ করছে, যা খামারিদের জন্য একটি স্থিতিশীল বাজার তৈরি করেছে। তবে এই খাতে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন, যাতে প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং মান উন্নত হয়।
সরকারি নীতিমালার ক্ষেত্রেও কিছু সংস্কার জরুরি। ডেইরি খাতকে একটি অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সহজ শর্তে ঋণ, ভর্তুকি, কর ছাড় এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করলে উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হবেন। একই সঙ্গে মান নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর তদারকি প্রয়োজন।
বিশ্ববাজারের দিকেও নজর দেওয়ার কথাও বলছি। বাংলাদেশ যদি দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে পারে, তাহলে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমানে এই খাতে রপ্তানি সীমিত হলেও ভবিষ্যতে এটি একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। বলা যায়, ডেইরি শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি ‘গেম চেঞ্জার’ খাত। সময়ের দাবি হলো, ডেইরি শিল্পকে কেবল একটি কৃষি উপ খাত হিসেবে নয়, বরং একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক খাত হিসেবে বিবেচনা করা।
আমি মনে করি, আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ এবং সঠিক নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে এ শিল্পের ভিত্তি শক্তিশালী করা সম্ভব। যাতে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে অনুসরণ করে বাংলাদেশও নিজস্ব উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে পারে। ডেইরি শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার বা ডেটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে গবাদিপশুর বংশ, উৎপাদন, রোগ এবং প্রজনন সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। পাশাপাশি, খামারিদের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারি ভর্তুকি, ঋণের সুবিধা এবং ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করা জরুরি।
ডেইরি শিল্প সমৃদ্ধি লাভ করলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান হবে, কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হবে। পাশাপাশি বিতরণ ব্যবস্থা ও গো-খাদ্যের জন্য অনেক লোকের কর্মসংস্থান হবে। ফলে অনেক মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। এর মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত আরও মজবুত করা সম্ভব হবে।
প্রাইমা হোসাইন
কলাম লেখক, সমাজসেবিকা ও সংগঠক