× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন

ঐতিহাসিক এক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট

ড. দেবজ্যোতি চন্দ

প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৬ ০৯:১৭ এএম

আপডেট : ০৫ মে ২০২৬ ১০:২৯ এএম

ড. দেবজ্যোতি চন্দ। ছবি: সংগৃহীত

ড. দেবজ্যোতি চন্দ। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের সামগ্রিক উন্নয়নের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলার একসময় ছিল অগ্রণী ভূমিকা। ‘আজ বাংলা যা ভাবে, গোটা ভারত তা কাল ভাবে’Ñ এই বহুল প্রচলিত উক্তিটি দীর্ঘদিন ধরে সর্বজনস্বীকৃত ছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার অবদান যেমন ছিল গৌরবময়, তেমনই শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সাহিত্য ও সংস্কৃতি, শিল্প এবং অর্থনীতিতেও বাংলা ছিল পথপ্রদর্শক। তবে টানা ৩৫ বছরের বাম শাসন এবং পরবর্তী ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গ ক্রমশ তার সেই জৌলুস হারাতে শুরু করে। অর্থনীতি ও শিল্প ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে রাজ্যটি দেশের অন্যতম অনুন্নত অঞ্চলে পরিণত হয়। বেকারত্ব ক্রমেই বেড়েছে এবং শিক্ষিত ও শ্রমজীবীÑ উভয় শ্রেণির মানুষই জীবিকার সন্ধানে রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি দিতে বাধ্য হয়েছেন। এই সমস্ত বিষয় পশ্চিমবঙ্গের ১৮তম বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।

বিভিন্ন মহল থেকে আগেই ইঙ্গিত মিলছিল যে, রাজ্যের অধিকাংশ ভোটার তৎকালীন সরকারের কাজকর্মে অসন্তুষ্ট ও হতাশ। একই সঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ধীরে ধীরে রাজ্যে নিজেদের অবস্থান ও সংগঠন শক্তিশালী করছিল। তবে যে বিপুল ব্যবধানে দলটি জয়লাভ করেছে এবং দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন অর্জন করেছে, তা অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল।

ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর ভূমিতে ক্ষমতায় আসার বিজেপির দীর্ঘদিনের স্বপ্ন অবশেষে বাস্তবায়িত হয়েছে। এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ, কঠিন এবং পূর্ণ সংগ্রামÑ যা সম্ভব হয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টির কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতৃত্বের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নেতৃত্বের পাশাপাশি রাজ্যের নেতারা, বিশেষ করে শমীক ভট্টাচার্য এবং শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বÑ এই সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

অন্যদিকে মমতা ব্যানার্জি পরিচালিত সরকারের পতনের পেছনে একাধিক কারণও উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও বহু প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা, শিল্পোন্নয়নে ভাটা এবং রাজ্যের অর্থনৈতিক অবনতি ছিল তার মধ্যে প্রধান। একসময় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গ ক্রমে পিছিয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন সূচকে নিম্নস্থানে নেমে আসে। যুব সমাজের মধ্যে বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থানের খোঁজে রাজ্য ছাড়ার প্রবণতাও বাড়তে থাকে। রাজ্যে ২০১৬ সালে হওয়া স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে গত বছর বাতিল হয়। শিক্ষক-কর্মচারী মিলিয়ে বাতিল হওয়া চাকরির সংখ্যা প্রায় ২৬০০০। দীর্ঘদিন যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা-শিক্ষাকর্মীরা অনশন মঞ্চে অবস্থান করলেও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখতে পাওয়া যায়নি। 

২০২৪ সালের আরেকটি ঘটনার এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক। ২০২৪ সালে ৯ আগস্ট আর জি করে এক তরুণী ডাক্তারের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে ঘিরে সমগ্র স্বাস্থ্যব্যবস্থার অনিয়ম ও দুর্নীতি সবার সামনে এসে পড়ে। দিনের পর দিন অসাধারণ এক নাগরিক অভ্যুত্থানের সাক্ষী থেকেছে এই বাংলা। তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই বিধানসভা ভোটে নিহত তরুণী ডাক্তারের মা পানিহাটি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিজেপি প্রার্থী হিসেবে প্রায় ২২ হাজার ভোটে জয়ী হয়েছেন। দিনের পর দিন সরকারি কর্মচারীদের ডিএ বঞ্চনাও মানুষের ক্ষোভের অন্যতম কারণ। এই নির্বাচনের আগেও সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে ৪% ডিএ দেওয়ার কথা জানালেও প্রাক্তন সরকার কোনো ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেনি। এভাবে ক্রমাগত কখনও নারী সুরক্ষা, নারী নিরাপত্তা, চাকরি দুর্নীতি জনগণকে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছে। 

কিছু জেলায়, বিশেষ করে সন্দেশখালীতে, নারী নির্যাতনের ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে সংঘাতের কারণে বহু কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়নেও বিলম্ব ঘটে।

সরকারের বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পÑ যেমন ‘কন্যাশ্রী’ ও ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ নিয়ে সমালোচনাও ছিল। অনেকের মতে, এই প্রকল্পগুলো স্বল্পমেয়াদি সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তেমন কার্যকর হয়নি। এসব কারণ মিলিয়েই শেষ পর্যন্ত এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেখানে জাতি, ধর্ম বা অর্থনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে একত্রিত হন। এ ছাড়া তৃণমূল এবং মমতা ব্যানার্জি পরিচালিত সরকারের ক্রমাগত সংখ্যালঘু তোষণ সর্বস্তরে, বিশেষত হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে এক তীব্র সরকারবিরোধী মনোভাবের জন্ম দিয়েছে। 

বর্তমানে কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার থাকায় প্রশাসনিক সমন্বয় আরও সুদৃঢ় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নতুন সরকার উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করবেÑ এমন প্রত্যাশাই করছেন রাজ্যের মানুষ।

একাধিক আন্তর্জাতিক সীমান্ত দ্বারা পরিবেষ্টিত রাজ্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের নিরাপত্তা জোরদার করাও অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। গত কয়েক দশকে যা রাজ্যের জনবিন্যাসে পরিবর্তন এনেছে, তা রোধ করাও এখন সময়ের দাবি।


লেখক: অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগ, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা