সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬ ১৬:০১ পিএম
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সারা দেশে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে সরকার। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সারা দেশে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে সরকার; যার মধ্যে ৮০ শতাংশই থাকবেন নারী। গত শনিবার সিলেট সিটি করপোরেশন আয়োজিত সুধী সমাবেশে এই নিয়োগের সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নতুন করে নিয়োগ দেওয়া স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়িত্ব হবে গ্রামের ঘরে ঘরে গিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানো। এ কথা সত্য, দেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরেই জনবল সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং গ্রামাঞ্চলে সেবার অপ্রতুলতার মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই প্রেক্ষাপটে ৮০ শতাংশ নারীসহ এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সময়ের দাবি পূরণে একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। এ উদ্যোগের সফলতা গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য অপরিহার্য।
দেশের একটি বড় অংশ এখনও গ্রামে বসবাস করে, যেখানে চিকিৎসাসেবার প্রাপ্যতা সীমিত। ফলে সামান্য অসুস্থতাও অনেক সময় গুরুতর রূপ নেয়। এই বাস্তবতায় স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসা, মাতৃসেবা, শিশুস্বাস্থ্য ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা গেলে জনস্বাস্থ্যের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব হবে। বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়ায় নারী ও শিশুস্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সহজ যোগাযোগ স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে আস্থা বাড়াবে। একই সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসার ওপর চাপ কমাবে।
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা এমন মোক্ষম সময়ে এলো, যখন দেশের স্বাস্থ্য কাঠামো অনেকটা নড়বড়ে। অতীতের দুর্নীতি ও দুঃশাসনে যা নিম্নমুখী। যেখানে শহরাঞ্চলেই চিকিৎসাসেবা বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন। আর গ্রামীণ জনপদের প্রকৃত চিত্র কী, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে সেবার বিষয়টি খাতা-কলমে বিস্তৃত হলেও বাস্তবতা হচ্ছে সেখানে রয়েছে চিকিৎসক স্বল্পতা, সরঞ্জামের অভাব এবং মানসম্মত সেবার বৈষম্য। অথচ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কমিউনিটি ক্লিনিক একটি কার্যকর উদ্যোগ হতে পারত। সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা থাকলে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারত। কিন্তু বাস্তবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার এ প্রতিষ্ঠান নানা অনিয়ম-অবহেলার কারণে সাধারণ মানুষ সেখানে সেবা নেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, জনবল সংকটসহ নানা কারণে বিগত সময়ে দেশে টিকা কার্যক্রমসহ নানা সেবা ব্যাহত হয়েছে। বহু স্থানে ইপিআই টিকাদান কেন্দ্রে সেবা বন্ধ ছিল। এতে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
আমরা মনে করি, সরকারের এই উদ্যোগ গ্রামীণ সেই স্থবির স্বাস্থ্যসেবা সচল করতে অনন্য ভূমিকা রাখবে। এই বিশাল নিয়োগ পরিকল্পনা দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে। বর্তমানে ইউনিয়ন ও কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও সেগুলোতে পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। নতুন স্বাস্থ্যকর্মীরা মাঠপর্যায়ে গিয়ে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুসেবা, টিকাদান কর্মসূচি এবং সাধারণ রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারলে হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে এবং মানুষ দ্রুত সেবা পাবে। আর নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় অনেক নারী রোগী পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে যেতে সংকোচ বোধ করেন। ফলে নারী স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি মাতৃস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা এবং প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এটি নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
তবে উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গুণগত মানের ওপর। কেবল নিয়োগ দিলেই হবে না; স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত সরঞ্জাম এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। মাঠপর্যায়ে কাজ করার জন্য তাদের নিরাপত্তা, প্রণোদনা এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায় এই বিশাল কর্মসূচি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে এই উদ্যোগের সমন্বয় জরুরি। যেমনÑ ওষুধ সরবরাহ, রেফারেল ব্যবস্থা, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা। অর্থাৎ একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যেই এই কর্মসূচি কার্যকর ফল দিতে পারে। একই সঙ্গে দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
আমরা মনে করি, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ হবে একটি সামাজিক বিনিয়োগ। যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে এটি গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নতি সাধনে সহায়ক হবে। পাশাপাশি আমরা চাই, কর্মরত কর্মীদের সঠিক মূল্যায়ন এবং তাদের জন্য ন্যায্য সুবিধা প্রদান নিশ্চিত করে সরকার স্বাস্থ্যসেবা খাত আরও শক্তিশালী এবং কার্যকর করে তোলা হোক; যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ একটি সুস্থ, সচেতন ও কর্মক্ষম জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।