× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ক্ষমতার চেয়ার বনাম সমতার চেয়ার

মহিউদ্দিন খান মোহন

প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬ ১৫:৪২ পিএম

মহিউদ্দিন খান মোহন, সহকারী সম্পাদক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মহিউদ্দিন খান মোহন, সহকারী সম্পাদক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপ্তি ঘটেছে গত ৩০ এপ্রিল। প্রাণবন্ত অধিবেশন বলতে যা বোঝায়, তা হয়তো ছিল না। তবে অতীতের মতো বিরোধিতা বা সমালোচনার নামে খিস্তিখেউড়ের উপস্থিতি ছিল না। তারপরেও কয়েকজন নতুন সংসদ সদস্যের কথাবার্তা ও আচরণে সংসদীয় রীতির ব্যত্যয় ঘটেছে। হয়তো জীবনে প্রথমবার জাতীয় সংসদ সদস্য হওয়ার কারণে অভিজ্ঞতার ঘাটতি বা এ সম্পর্কিত পড়াশোনার অভাবে এমনটি ঘটে থাকবে। তবে একটি বিষয় অনেককে বিস্মিত করেছে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে জাতীয় সংসদ অধিবেশনগুলোতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোরঞ্জনের জন্য নানাজনের কসরত ছিল দৃষ্টিকটু। কাউকে দেখা গেছে তাকে ‘হযরত’ বলে ‘সম্মান’ জানানোর আহ্বান জানিয়ে নেত্রীর কৃপাদৃষ্টি লাভের চেষ্টা করতে। আবার কেউ সংসদীয় রীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে শেখ হাসিনাকে নিয়ে গান গেয়ে গর্বিত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। বলা নিষ্প্রয়োজন, ওইসব তৈলমর্দন গণতন্ত্র বা সংসদীয় রাজনীতির উৎকর্ষের জন্য মোটেই সহায়ক হয়নি। বরং সাধারণ মানুষের কাছে জাতীয় সংসদ পরিণত হয়েছিল নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজ্যসভায়; যেখানে গোপাল ভাঁড় তার হাস্যরস দিয়ে আসর গুলজার করত। 

শেখ হাসিনার আমলের মতো অতটা না হলেও এবারও তার কিঞ্চিৎ দেখা মিলেছে। অধিবেশনে জাতীয় সংসদের চিফ হুইফ প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কবিতা আবৃত্তি করেছেন। চিফ হুইপ একজন স্বনামধন্য রাজনীতিক এবং অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানও বটে। তার কাব্য প্রতিভা সম্বন্ধে এর আগে আমার ধারণা ছিল না। তিনি যে একজন কবিও তা জেনে জাতি নিশ্চয়ই পুলকিত। আমাদের রাজনীতিকরা সাধারণত বেরসিক ও রাশভারী গোছের হন, এ ধারণা সাধারণ মানুষের। তবে তারাও যে আবেগময় মুহূর্তে কবি হয়ে উঠতে পারেন, এটাও স্বীকার করতে হবে। আমাদের একজন রাষ্ট্রপতি ছিলেন, যিনি কবিতা লিখতেন। অন্তত আমজনতা সেটাই জানত। তবে অন্তরালে সেসব কবিতা কার দ্বারা লিখিত হতো তা অবশ্য আমাদের জানার কথা নয়, উপায়ও ছিল না। তবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি নিজেই হয়তো কবিতাটি লিখে সংসদ অধিবেশনে আবৃত্তি করেছেন। প্রচুর হাততালিও পেয়েছেন। এর ফলে তিনি কাব্যচর্চায় উৎসাহ পাবেন নির্ঘাত। তবে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিশেষ কাউকে উপজীব্য করে কবিতা লেখা ও পাঠ, সংসদ কার্যপ্রণালী বিধি অনুমোদন করে কি না সেটা একটা প্রশ্ন। যেহেতু স্পিকার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি বা কবিতাটি এক্সপাঞ্জ করেননি, তাই ধরে নেওয়া যায়, সংসদীয় কার্যক্রমে এটা অবৈধ নয়। তবে এজন চিফ হুইফের এভাবে সংসদ নেতাকে তৈলাক্ত করার চেষ্টা কারও কাছে দৃষ্টিকটু লাগলে কিছু করার নেই। 

প্রথা অনুযায়ী শেষ কার্যদিবসে সমাপনী ভাষণ দিয়েছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অনেক কথার মধ্যে তিনি অত্যন্ত মূল্যবান এবং প্রণিধানযোগ্য কয়েকটি কথা বলেছেন। সংসদ নেতার চেয়ারের প্রতি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেছেন, “মাননীয় স্পিকার, এ চেয়ারটিতে বসলে প্রতি মুহূর্তে মনে হয়, আগুনের হিট আসছে। এতে হাসার কিছু নেই। আমি যা ফিল করি আপনাদের তা-ই বলছি। এ চেয়ার থেকে আমি হয়তো আপনাদের সামনে আরও পপুলার কথা বলতে পারতাম। যেটাতে হয়তো আরও বেশি হাততালি হতো। কিন্তু এ চেয়ার বলে যে, আমি সবসময় পপুলার কথা বলতে পারি না। তিনি আরও বলেছেন, এ চেয়ার তাকে মনে করিয়ে দেয়, জনপ্রিয় সিদ্ধান্তের চেয়ে সঠিক সিদ্ধান্তই গ্রহণ করতে হবে।” 

সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে অত্যুক্তি আছে বলে মনে হয় না। কেননা, ক্ষমতার চেয়ার শুধু আরাম-আয়েশের নয়, কঠিন দায়িত্বেরও। মনে পড়ে ১৯৮০ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাংবাদিককে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “অনেক সময় মনে হয়, আমি আগ্নেয়গিরির ওপর বসে আছি।” প্রেসিডেন্ট জিয়ার সে বক্তব্য নিয়ে তার বিরুদ্ধবাদী পত্রিকাগুলো তুমুল সমালোচনায় মেতেছিল। তারা বলতে চেয়েছিল, যে দেশের সরকারপ্রধান স্বয়ং তার চেয়ারকে আগ্নেয়গিরির সঙ্গে তুলনা করেন, সেদেশের জনসাধারণ কীসের মধ্যে আছে? বলা নিষ্প্রয়োজন, পত্রিকাগুলো জিয়াউর রহমানের বক্তব্যের মর্মার্থ অনুধাবন না করেই তার সমালোচনায় লিপ্ত হয়েছিল। অথবা প্রেসিডেন্ট কী বলতে চেয়েছেন, তা বুঝেও তাকে বিতর্কিত বা বিব্রত করার অভিপ্রায় এক্ষেত্রে কাজ করেছে। 

মূলত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তার বক্তব্যে এটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন, ক্ষমতার মসনদ আরাম-আয়েশে দিনযাপনের জন্য নয়। এ আসন দায়িত্ব পালনের। আর সে দায়িত্ব যদি কেউ সঠিকভাবে পালন না করে, তাহলে তাকে পড়তে হয় চরম দুর্বিপাকে। ব্যর্থতার কারণে ফুঁসে ওঠা গণঅসন্তোষ ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির মতো লাভা উদগিরণ করে সবকিছু ভস্ম করে দিতে পারে। ছেচল্লিশ বছর পরে পিতার মতো পুত্রও ক্ষমতার চেয়ারকে ‘হিট চেয়ার’ বলে আখ্যায়িত করলেন। তারেক রহমানকে ব্যক্তিগতভাবে যতটুকু জানি, আমার মনে হয়, সরকারপ্রধানের চেয়ারে উপবেশন করার পরে তিনি এ দায়িত্বের গুরুত্ব উপলব্ধি করে থাকবেন। ‘ক্ষমতা’ শুধু ভোগ করার বিষয় নয়, ক্ষমতা মানুষকে দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। যিনি বা যারা সে মর্মবাণী উপলব্ধি করতে পারেন, তিনি বা তারা সে উত্তাপের হাত থেকে নিস্তার পান। 

আমরা যেটাকে ক্ষমতা, মানে রাষ্ট্রক্ষমতা বলি, সেটা আসলে দায়িত্ব, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। এ দায়িত্ব একজন মানুষকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দেয়। তিনি কি তার প্রাপ্ত ক্ষমতাকে জনগণের কল্যাণে কাজে লাগাবেন, নাকি নিজের ভোগবিলাস বা অর্থবিত্ত আহরণের কাজে ব্যবহার করবেন তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মানসিকতা ও চিন্তাভাবনার ওপর। কেউ ক্ষমতাকে ব্যয় করেন মানবকল্যাণ সাধনে, কেউ অপব্যবহার করেন তার ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির কাজে। ক্ষমতার অপব্যবহার কাকে বলে এবং তা কত প্রকার ও কী কী, তা বোধকরি এ দেশের কাউকে ব্যাখ্যা করে বলার দরকার পড়ে না। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে তাকালে তা উদাহরণসহ চোখের সামনে ভেসে উঠবে। কূটকৌশলে ক্ষমতা করায়ত্ত করার পর তাকে চিরস্থায়ী করার জন্য হেন স্বৈরতান্ত্রিক পন্থা নেই, যা তিনি অবলম্বন করেননি। নিজের চেয়ারকে নিষ্কণ্টক করার জন্য তিনি হত্যা-গুমসহ মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে কুণ্ঠিত হননি। পাশাপাশি দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন এবং তা বিদেশে পাচার করে স্থাপন করেছেন ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত।

যে চেয়ারটিতে শেখ হাসিনা সব মিলিয়ে প্রায় কুড়ি বছর অধিষ্ঠিত ছিলেন, তা যে কতটা তপ্ত, তাপানুকূল কক্ষে বসে তিনি তা হয়তো অনুধাবন করতে পারেননি। তার কাছে রাষ্ট্রক্ষমতা কোনো দায়িত্বের বিষয় ছিল না। ছিল দলীয় ও গোষ্ঠীস্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার। ছিল প্রতিদ্বন্দ্বীকে নির্মমভাবে নিষ্পেশনের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এক অপরিণামদর্শী মনোবৃত্তি চরিতার্থ করার শক্তি। কিন্তু তিনি ছিলেন ভ্রান্ত। তার বোধে ছিল না, প্রশস্ত সড়কের পাশেই থাকে গভীর খাদ। অতিরিক্ত গতিতে দিগ্বিবিক জ্ঞানশূন্য হয়ে চলতে থাকলে সে খাদে পতিত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। যে চেয়ারকে নিরাপদ ভেবে তিনি অন্যদের জীবন অনিরাপদ করে তুলেছিলেন, সে চেয়ার শেষ পর্যন্ত আর নিরাপদ থাকেনি। শেষ অবধি তিনি টের পেয়েছিলেন, আরামের সে চেয়ার কতটা উত্তপ্ত হতে পারে। তবে তার সে উপলব্ধি কোনো কাজে আসেনি। কেননা ততক্ষণে আরামের চেয়ার তার জন্য হারাম হয়ে গেছে। তিনি শুধু প্রধানমন্ত্রিত্বের চেয়ার নয়, মাতৃভূমি ত্যাগ করে তাকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। একজন সরকারপ্রধান তথা রাজনীতিকের জন্য এ ধরনের অপগমন যে কতটা গ্লানিময় তা বলে বোঝানোর দরকার পড়ে না। আর সেজন্যই সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, শেখ হাসিনার পরিণতি রাজনীতিক ও সরকারপ্রধানদের জন্য একটি শিক্ষা। জনআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে দাঁড়ালে একজন উদ্ধত, অপরিণামদর্শী সরকারপ্রধানের কী পরিণতি হতে পারে, শেখ হাসিনা তার জীবন্ত উদাহরণ। 

প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমান যখন তার উপরোক্ত উক্তিটি করেছিলেন, তখন আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছিলেন নিতান্তই বালক। পিতার সে উক্তি তার মনে থাকার কথা নয়। তবে রাষ্ট্রক্ষমতার চেয়ার সম্বন্ধে তার সাম্প্রতিক উক্তি হয়তো সমসাময়িক ইতিহাসের আলোকে লব্ধ অভিজ্ঞতা-সঞ্জাত। কেননা, তিনি দেখেছেন, ক্ষমতার চেয়ারকে আঁকড়ে ধরে রাখেতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের কতিপয় সরকারপ্রধানের কী করুণ পরিণতি হয়েছে। তাছাড়া এটাও হয়তো তার উপলব্ধিতে এসেছে যে, রাষ্ট্রক্ষমতার কুর্সি নিশ্চিন্তে দিন কাটানোর জন্য নয়। এ আসনে যারা উপবেশন করেন, তাদের নিজের ব্যক্তিসত্তাকে ভুলে যেতে হয়। আত্মীয়-পরিজনের কথা বিস্মৃত হতে হয়। গোটা দেশ হয় তার সংসার, জনগণই হয় তার স্বজন-পরিজন। বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ছিল প্রবল। স্বজনপ্রীতির এ অভিযোগ হাওয়াই ছিল না। বঙ্গবন্ধুর আত্মীয় পরিচয়ে একদল লোক তখন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে রামরাজত্ব কায়েম করেছিল। বলা বাহুল্য, তার পরিণতি ভালো হয়নি। শেখ হাসিনাও সে ধারাই অনুসরণ করেছিলেন। তিনিও স্বজন তোষণের নীতিকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত করে ফেলেছিলেন।

কিন্তু শহীদ জিয়াউর রহমান ছিলেন ব্যতিক্রম শুধু নয়, একেবারে বিপরীত। তার স্বল্পায়ুর রাজনৈতিক জীবনে সুউচ্চ সফলতার কারণগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আত্মীয়স্বজনকে প্রশ্রয় বা প্রাধান্য না দেওয়ার নীতি অন্যতম। আগেও বলেছি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ইতিহাসে জায়গা করে নিতে হলে পিতা জিয়াউর রহমান ও মা খালেদা জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে। আর তা করতে হলে প্রধানমন্ত্রিত্বের চেয়ারকে ‘ক্ষমতার নয়, সমতার চেয়ার’ বলেই গণ্য করতে হবে।                                                                                          

লেখক

সহকারী সম্পাদক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা