সাদেকুর রহমান
প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬ ১৪:৫৭ পিএম
মা-বাবারা সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আবাসিক স্কুলে দিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু তারা বয়সকে বিবেচনায় নিচ্ছেন না। ছবি: প্রথম আলো
শিশু পরিবারে জন্মগ্রহণ করে। মানুষের সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে পরিবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবার থেকেই মানুষ প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে। জাতীয় শিক্ষা নীতি অনুযায়ী বাংলাদেশে একটি শিশু ৫-৭ বছর বয়সে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি রয়েছে। একটি শিশু ৪+ বছর বয়সে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারে। শিক্ষার উপকরণ হিসেবে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে একটি খাতা ও একটি বই দেওয়া হয়। এই শ্রেণিতে শিশুদের মূলত স্কুলে যাওয়ার অভ্যাস তৈরি করা হয়।
বর্তমানের শিশুরা হলো আলফা প্রজন্ম। তারা বেড়ে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সঙ্গে নিয়ে। তাই তাদের চিন্তাধারার উপযোগী পরিবেশ থাকা অত্যন্ত দরকার। বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে একটি নতুন ধারা চালু হয়েছে। আগে অনেক কলেজে আবাসিক থাকার ব্যবস্থা ছিল। এ ছাড়া ক্যাডেট কলেজগুলোতে সপ্তম শ্রেণি থেকে আবাসিক থাকার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু এখন এটি আর শুধু কলেজে সীমাবদ্ধ নেই। অনেক স্কুলে প্রথম শ্রেণি থেকেই আবাসিক থাকার ব্যবস্থা আছে। অনেক অভিভাবক প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করেই সন্তানকে আবাসিক স্কুলে দিয়ে দিতে চান।
সাধারণত ৫-৬ বছর বয়সে একটি শিশু প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। এই সময়ই মূলত মানসিক বিকাশ বেশি হয়ে থাকে। এই বয়সে থেকেই আবাসিক স্কুলে থাকার ফলে শিশুদের শরীর ও মনের ওপর কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ পরিবারের সঙ্গে থাকলে ভালো হয়। আবাসিক স্কুলে সাধারণত নিজের কাজ নিজেকেই করতে হয়। কিন্তু ৫-৭ বছরের বাচ্চাদের পক্ষে নিজের সব কাজ নিজে করা বা বোঝা সম্ভব নয়। এত অল্প বয়সে শিশুরা আবাসিক হোস্টেলে থাকার মতো শারীরিক ও মানসিক পরিপক্বতা অর্জন করে না।
শিশুদের বয়স অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস গড়ে ওঠা দরকার। প্রতিষ্ঠান হয়তো তার ব্যবস্থা করে, কিন্তু শিশুদের এই অভ্যাসগুলো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পরিবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি শিশু সঠিক ও পরিপূর্ণ সেবা পাওয়ার অধিকার রাখে। এটি পরিবারের পক্ষে যতটা দেওয়া সম্ভব, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ততটা দেওয়া সম্ভব নয়। মা-বাবার আদর ও স্নেহ ছাড়া একটি শিশু বড় হতে থাকে।
মা-বাবারা সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আবাসিক স্কুলে দিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু তারা বয়সকে বিবেচনায় নিচ্ছেন না। বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্কুলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে থাকার জন্য মানসিক পরিপক্বতাও প্রয়োজন। সাধারণত ৬/৭/৮/৯ কিংবা ১০ বছর বয়সে শিশুরা এই ধরনের অবস্থায় পৌঁছায় না। এই বয়সে পরিবারের বাইরে থাকার ফলে অনেক সময় বাচ্চার পরিবারের সদস্যদের প্রতি আবেগ ও ভালোবাসার প্রকাশ সঠিকভাবে গড়ে ওঠে না।
অতি অল্প বয়সে আবাসিক স্কুলে দেওয়া বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে খুব একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশের প্রয়োজন রয়েছে। জীবনের শুরুতেই অতিরিক্ত বাস্তবতার সম্মুখীন হওয়া ভবিষ্যতের জীবনকে অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয়। এর ফলে শিশুর ভবিষ্যৎ সত্যিই সুন্দর হচ্ছে কি নাÑ এ নিয়ে ভাবার সুযোগ রয়েছে।
অনেকের মতে, এর ফলে শিশুদের মানবিক গুণাবলি সঠিকভাবে বিকশিত হয় না। কারণ অল্প বয়সেই একটি শৃঙ্খলের মধ্যে তারা বাঁধা পড়ে যায়। এর ফলে অনেক সময় শিশুরা বেকে যায়। যে শিশুটি জন্মেছিল আবেগ, ভালোবাসা ও সামাজিকতার মধ্যে দিয়ে বেড়ে ওঠার জন্য, তাকে বরং বানিয়ে তোলা হচ্ছে একটি যন্ত্রের মতোÑ যে শুধু নিজেকে নিয়েই ভাবতে শিখবে, যার ভেতরে আবেগ, ভালোবাসা কিংবা সম্পর্কের দায়িত্ববোধ গড়ে উঠবে না। এর ফলে ভবিষ্যতে মা-বাবা কিংবা দেশ আসলে কতটুকু উপকৃত হবে, এটি কোটি টাকার প্রশ্ন।
অবহেলা ও অযত্নে বেড়ে ওঠা গাছ থেকে খুব ভালো ফল পাওয়া যায় না। নিজের লাগানো গাছের প্রতি মানুষের আলাদা একটি মায়া জন্মায়। মানুষ নিজের কাজের প্রতি যতটা দায়বদ্ধ থাকে, আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করে; অন্যের কাজের প্রতি ততটা থাকে না। এটি মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। পেশাদারত্বের বিষয়টি আলাদা। তখন শুধু পেশাদারত্বই কাজ করে; আবেগ বা স্নেহ কাজ করে না।
আমাদের দেশে পারিবারিক সম্পর্কগুলো এমনিতেই নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। আর এই ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেই প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করে তুলছে। এজন্য আমাদের দেশের মা-বাবাদের নতুন করে ভাবা দরকার। আমরা এখন উন্মুক্ত অর্থনীতির যুগে বসবাস করি। বাচ্চারা হাতের নাগালেই সব কিছু পেয়ে যায়। ডিভাইস আসক্তি একটি বড় সমস্যা। তাই বলে সব সমস্যার সমাধান অল্প বয়সে আবাসিক স্কুল নয়।
অনেক সময় মা-বাবা সময় দিতে না পারার কারণেও আবাসিক স্কুলকে নিরাপদ মনে করেন। তবে এটি বাচ্চার জন্য কতটা নিরাপদ তা নিয়ে ভাবার সুযোগ রয়েছে। এখন মানুষের হাতে টাকা আছে। আবাসিক স্কুলগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। টাকা দিয়ে এই উপমহাদেশে অনেক কিছু পাওয়া যায় সত্য। কিন্তু আবেগ, ভালোবাসা ও অনুভূতি তৈরি করা যায় না। এই উপমহাদেশে পরিবার একটি শিশুর বেড়ে ওঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে শিশুটিকে যেন প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা ট্রেঞ্চে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। যেখানে সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণিতে পড়া বাচ্চা কিংবা এসএসসি পাস করা ছেলেমেয়েরাও পরিবার ছাড়া থাকতে খুব কষ্ট পায়, সেখানে এই ছোট শিশুদের কষ্ট আরও বেশি হয়।
বাজার অর্থনীতির সবকিছুই এই দেশে গ্রহণ করতে হবে, এমন নয়। প্রতিটি দেশের আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। এগুলোর মধ্য দিয়েই প্রতিটি দেশ সামনে এগিয়ে যায়। শিশুদের জীবন গড়ে উঠুক পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে।
সাদেকুর রহমান
গবেষণা কর্মকর্তা জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড