জাকির হোসেন
প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৬ ১১:৫২ এএম
নতুন নতুন সংবাদপত্র, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বেসরকারি টেলিভিশনÑ সব মিলিয়ে দেশে যেন এক ধরনের ‘মিডিয়া বুম’ তৈরি হয়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশে গণমাধ্যমের বিস্তার আজ চোখে পড়ার মতো। নতুন নতুন সংবাদপত্র, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বেসরকারি টেলিভিশনÑ সব মিলিয়ে যেন এক ধরনের ‘মিডিয়া বুম’ তৈরি হয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া গণমাধ্যমও নতুন রূপে ফিরে আসছে। সংখ্যার দিক থেকে এই বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক একটি ইঙ্গিত বহন করে। কিন্তু মৌলিক প্রশ্নটি থেকেই যায়Ñ গণমাধ্যমের এই বিস্তার কি সত্যিই আমাদের গণতন্ত্রকে সুসংহত করছে? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বাধীন গণমাধ্যমের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। গণমাধ্যম শুধু তথ্য সরবরাহ করে না; এটি রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে, ক্ষমতার কেন্দ্রকে জবাবদিহিতার আওতায় আনে এবং জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করে। এ কারণেই গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়। তবে বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কাগজে-কলমে যতটা দৃশ্যমান, বাস্তবে ততটা কার্যকর নয়। বিভিন্ন সময়ে সরকারগুলোর পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের ওপর চাপ, নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে সংবাদ প্রকাশে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ দেখা যায়। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে গণমাধ্যমের মূল শক্তিকে দুর্বল করে দেয়।
বিগত সরকারের ১৫ বছরে সংবাদ মাধ্যমগুলোকে নানা নিপীড়নের মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছে। দীর্ঘদিন সংবাদ প্রকাশ বা প্রচারে সংকোচন, চর্চার মতো হয়ে গেছে। চেপে চেপে বলা গণমাধ্যমের কাজ না। এ থেকে বেরিয়ে আসতে সময়ও লাগছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর গণমাধ্যমগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজছে।
৯০-এর দশক পর্যন্ত বাংলাদেশে গণমাধ্যম বলতে মূলত মুদ্রণ মাধ্যমকেই বোঝানো হতো। ছাপা পত্রিকার প্রতি মানুষের গভীর আস্থা ছিল। খবর একদিন দেরিতে প্রকাশ পেলেও তা পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারাত না। এক দিনের পুরনো খবর জানতে পাঠক মুখিয়ে থাকত। সকালের পত্রিকা খুলে খবর পড়ে চমকে যেত। কী ঘটছে রাষ্ট্রে, কী ঘটছে বিশ্বেÑ তা জানতে সকালের চায়ের কাপের সঙ্গে একটি গরম পত্রিকা থাকা ছিল নিয়মবদ্ধ। কোন পত্রিকায় কী খবর প্রকাশ পেল তা নিয়ে চলত আলোচনা। বিভিন্ন আড্ডা, অফিসে, বাসে চলার পথে আলোচনার ঝড় উঠত। ওই সময় তাৎক্ষণিক খবর পাওয়ার খুব একটা উপায় ছিল না। রাষ্ট্রচালিত টেলিভিশন ও রেডিওর খবরগুলো কেবলই সরকারের মুখপত্র ছিল। দেশে কোনো সংকটে বিবিস বাংলার রেডিওর খবর ছিল ভরসা। তা শুনতে মানুষ মুখিয়ে থাকত।
ওই সময়ে নতুন কোনো পত্রিকা আসছে তাও জানা যেত অন্য পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপন থেকে। যা এখন জানা যায় পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণের পর থেকেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানান ঢঙে তা প্রচার করতে থাকে। ওই সময় নতুন পত্রিকার প্রতিও মানুষের আগ্রহ ছিল অনেক। দেখতে চাইত নতুনরা কেমন খবর দিচ্ছে। আর সাংবাদিকরা জনমানুষের টেস্ট উপলব্ধি করে খবর পরিবেশন করত। একটি কথা বলাই যায়, ৯০-এর দশক পর্যন্ত সংবাদ মাধ্যমে খবরগুলো পরিবেশনে এডিটরিয়াল পলিসি ছিল বেশ শক্ত। মালিক পক্ষের অনাকাঙ্ক্ষিত বাড়াবাড়ি ছিল না বললেই চলে। কারণ একজন সম্পাদকের সিদ্ধান্ত মালিকের কথায় খুব একটা নড়চড় হতো না। সরকার চাইলেই বড় কিছু চাপিয়ে দিতে পারত না। এ কারণে সংবাদের মান বজায় থাকত। মূলধারার সংবাদপত্রগুলো বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ এবং অনুসন্ধানী সংবাদে ছিল গভীরতা। পাশাপাশি গ্রামবাংলার খবরগুলো তুলে ধরা ছিল সাংবাদিকদের দায়িত্ব। যেহেতু এখনকার মতো সামাজিক মাধ্যম এবং ডিজিটাল গণমাধ্যম তখন ছিল না বলেই পাঠকের চাহিদা সাংবাদিকতায় প্রাধান্য পেয়েছে।
একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই বাংলাদেশে গণমাধ্যমের জোয়ার বইতে শুরু করে। ওই সময়ে বাংলাদেশ ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করে। বিশেষ করে, বেসরকারি টেলিভিশনের যাত্রা বাংলাদেশে গণমাধ্যমে নতুন যুগে প্রবেশ করায়। এতে সংবাদপত্রের আধিক্য কিছুটা কমে যায়। মানুষ খবর দেখতে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। প্রতিযোগিতাও বাড়ে গণমাধ্যম শিল্পে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বড় অঙ্কের বাজেট নিয়ে নতুন নতুন গণমাধ্যম প্রকাশ করতে থাকে। আসতে থাকে নতুন নতুন টেলিভিশন চ্যানেল। গত ২৫ বছরে ৫০টি বেসরকারি টেলিভিশনের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ৩৬টি চ্যানেল সম্প্রচারে আছে। বাকিরা সম্প্রচারের অপেক্ষায়। যে ৩৬টি চ্যানেল সম্প্রচারে আছে এর বেশিরভাগেরই ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার সংকট রয়েছে। গণমাধ্যমের সংখ্যা বাড়লেও এসব গণমাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্যতা এবং পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় কতটুকু উন্নত হয়েছে সেটা বিবেচনার দাবি রাখে।
অনলাইন নিউজ পোর্টালের আবির্ভাব ২০০৫ সালে। শুরুতে এই মাধ্যমটির তাৎক্ষণিক খবর পরিবেশনের প্রতিযোগিতায় নামে। দ্রুত খবর দেওয়া পাঠকের কাছেও জনপ্রিয় হতে থাকে। তবে বাদ সাধে প্রতিষ্ঠানের আয়ে। বিজ্ঞাপনদাতারা অনলাইনকে অজনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবেই বিবেচনা করে। আয়ের পথ সংকুচিত থাকায় অনলাইন পোর্টালগুলোর অবস্থা ছিল বেশ করুণ। ২০২১ সালে একটি নিউজ পোর্টালের দায়িত্ব গ্রহণের পর ডিজিটাল মাধ্যমকে অনলাইনে যুক্ত করেছিলাম। এরপর অন্য অনলাইন পোর্টালগুলো ডিজিটাল মিডিয়াকে প্রাধান্য দিতে থাকে। এখন বাংলাদেশের সব গণমাধ্যমের আয়ের অন্যতম উৎস ডিজিটাল মাধ্যম। অর্থাৎ ফেসবুক ও ইউটিউব থেকে এখন সব গণমাধ্যমই আয় করছে।
কালের নিয়মে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। ছাপা পত্রিকা থেকে আমরা এখন ডিজিটাল যুগে চলছি। তথ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত বা নিবন্ধিত দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা ১ হাজার ২৭৭টি। এর মধ্যে ডিএফপি তালিকাভুক্ত দৈনিক পত্রিকা রয়েছে ৫৮৪টি। দেশের পত্রিকাগুলোর মধ্যে ৪৮টির প্রচার সংখ্যা এক লাখের বেশি। তবে অনিবন্ধিত পত্রিকার সংখ্যা ধরলে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এসব পত্রিকার বেশিরভাগেরই ব্রেকইভেন্টে নেই। এখন কিছু পত্রিকা ডিজিটাল মাধ্যমকে প্রাধান্য দিয়ে আয়ের চেষ্টা করছে। কিন্তু আদিকাল থেকে পত্রিকার ব্যবসা লোকসানের খাতায়ই রয়ে গেছে। ফলে নতুন নতুন পত্রিকা বড় বাজেট নিয়ে এলেও বেশিদূর যেতে পারেনি। মুখ থুবড়ে পড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আবির্ভাব সংবাদ প্রবাহের নতুন মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। ফলে গণমাধ্যমের আধিক্য আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসারে এখন আর কোনো খবরের জন্য এক দিন কেন এক ঘণ্টাও অপেক্ষা করতে হয় না। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে খবর চলে যায় গণমানুষের কাছে। প্রশ্ন হলো, গণমাধ্যমের এই বিস্তার কি আমাদের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করছে? এর উত্তর সরল নয়। যদি গণমাধ্যম স্বাধীন, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল হয়, তাহলে এটি গণতন্ত্রের শক্তি। কিন্তু যদি এটি নিয়ন্ত্রিত, পক্ষপাতদুষ্ট বা শুধুমাত্র বাণিজ্যিক স্বার্থে পরিচালিত হয়, তাহলে এটি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং, গণমাধ্যমের সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; এর গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি। সম্পাদকীয় স্বাধীনতা, পেশাগত নৈতিকতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশÑ এসব নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পাঠকদেরও সচেতন হতে হবে, যাতে তারা সঠিক ও ভুল তথ্যের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে।
২০০০ সালের পর থেকে গণমাধ্যম শিল্পের খই ফুটলেও ভালো নেই এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা। মান ধরে রাখা যায়নি সাংবাদিকতার। পার্থক্য করা যায়নি সাংবাদিকতা ও অপসাংবাদিকতার। প্রশ্ন হচ্ছে কেন? এর উত্তরগুলো যদি খুঁজি তবে প্রথমেই বলব এটা আমাদের সাংবাদিকদেরই ব্যর্থতা। সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজন, অনিয়ম এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়া সংবাদ মাধ্যমগুলোকে একপ্রকার দেউলিয় করে দিয়েছে। এ কারণে যে কেউ চাইলে একটি পত্রিকা, টেলিভিশন, অনলাইন পত্রিকা নিয়ে বাজারে আসছে। সেটা আসতেই পারে। কোনো বাধা নেই। বাধা হলো সেখানে, যখন ওই মালিকরা সাংবাদিকদের ডমিনেন্ট করে। সাংবাদিকদের জিম্মি করে ফেলে। টাকার জোরে কিছু সাংবাদিককে কিনে নিতে চায়। নিজেদের অনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে। যাতে তার মূল ব্যবসার প্রসার ঘটাতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ সংবাদকর্মীরই ভাগ্য উন্নয়ন ঘটে না। দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমেই নিয়ম মেনে বেতন-ভাতা দেওয়া হয় না। তবু সংবাদকর্মীরা নিজেদের পেশার টানে টিকে থাকে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ছত্রছায়া সাংবাদিকদের লাইনচ্যুত করে ফেলে। আমাদের সাংবাদিক সংগঠনগুলো নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়। আমাদের মালিকপক্ষগুলো চায় রাজনীতিকদের হাতে রাখতে। এ কারণে তারা সাংবাদিকদের ব্যবহার করছে। এতে নীতি-নৈতিকতা ও সাংবাদিকদের আদর্শ টিকে থাকে না। জাতীয় প্রেস ক্লাবে এমনসব সদস্য পাওয়া যায়, যারা কখনও মূলধারার সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। অথচ তারা সদস্য। আবার যারা মূলধারার সাংবাদিকতায় আছেন কিন্তু রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই তারা সদস্য হতে পারছেন না।
৫ আগস্টের পর অনেক গণমাধ্যমেই পালাবদল হয়েছে। এই পালাবদলে কিছু কিছু পত্রিকায় সম্পাদক পদে এমনসব ব্যক্তিকে মনোনীত করতে হয়েছে, যারা সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত থাকার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়েই বেশি পরিচিত। এতে সাংবাদিতার মূল যোগ্যতা হিসেবে প্রাধান্য পাচ্ছে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা। যেটা ভবিষ্যৎ সাংবাদিকতার জন্য এবং সুসংহত গণতন্ত্রের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। কারণ রাজনৈতিক ছত্রছায়া থাকলে সরকারের ভুল বা বিচ্যুতির খবর গণমাধ্যমে আসবে না। এতে সরকার ভুল করবে। এর জন্য সরকারকেই খেসারত দিতে হবে। যার খেসারত দিয়েছেন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনে গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করে রাখার প্রবণতা ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত। ওই সময়ে গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা মালিক পক্ষের জন্যই হোক আর নিজেদের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির কারণেই হোক সরকারের তাঁবেদারি করেছে। এতে যা হওয়ার তাই হয়েছে। সরকার পতনের পর পালিয়ে যেতে হয়েছে পেশা ছেড়ে। এটা তাদের অনৈতিক সাংবাদিকতার মাশুল। এই সাংবাদিকরাই বিগত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক মতভেদে পার্থক্য থাকায় অনেক সাংবাদিককে পেশা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। এটা সাংবাদিকদের জন্য বিড়ম্বনার, লজ্জার। বর্তমান সময়েও একই ধারা অব্যাহত থাকায় বর্তমান সরকারকেও সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি মালিকপক্ষ এবং সরকারের চাপে সাংবাদিকতার নৈতিকতাকে বিসর্জন দেওয়া যাবে না। সাংবাদিকের কাজ রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি না। রাজনীতিকদের সঠিক পথ দেখানো সাংবাদিকদের কাজ। সাংবাদিকদের মর্যাদা সাংবাদিকদেরই বয়ে নিতে হবে।
জাকির হোসেন
সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক