সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬ ১৪:৩৮ পিএম
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও মে দিবস যথাযথ মর্যাদায় ফি-বছর উদযাপিত হয়ে আসছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আজ মহান মে দিবস। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের স্মারক হিসেবে দিবসটি বিশ্বব্যাপী সুমহান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় ফি-বছর উদযাপিত হয়ে আসছে। আজ সরকারি ছুটির দিন। মে দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তারা বাংলাদেশ ও বিশ্বের সব শ্রমজীবী মানুষকে সংগ্রামী অভিনন্দন জানিয়ে তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
আজ থেকে ১৪০ বছর আগে এদিনে আমেরিকার শিকাগো শহরে আট ঘণ্টা শ্রম ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে সমাবেশের মধ্য দিয়ে যে শ্রমিক আন্দোলনের সূত্রপাত, তা আজও জারি রয়েছে পৃথিবীজুড়ে। সেদিন মালিকপক্ষের পেটোয়াবাহিনী যে বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছিল ক্ষুধার্ত এবং ন্যায্য অধিকারের দাবিতে উচ্চকিত শ্রমিকদের ওপর, তার রেশ আজও শেষ হয়ে যায়নি। এখনও দেশে দেশে শ্রমজীবী মানুষের বঞ্চনার খবর গণমাধ্যমে উঠে আসে। আজও অধিকার বঞ্চিত শ্রমিকদের চিৎকার ইথারে ভেসে বেড়ায়। বলাটা বোধ করি অত্যুক্তি নয় যে, শিকাগোতে যে আন্দোলন সেদিন গড়ে উঠেছিল, আজও তার প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়নি।
প্রতিবছর সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ঘটা করে মে দিবস পালন করা হলেও এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। বিশেষ করে, আমাদের দেশে শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যের কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছেÑ এ কথা বলা যাবে না। বরং যতই দিন যাচ্ছে, শ্রমজীবী মানুষের বঞ্চনার চিত্র ততই প্রকট হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সদস্য দেশ হওয়া সত্ত্বেও সংস্থাটির কনভেনশনের শর্তসমূহ সঠিকভাবে পালিত হচ্ছে না। এখনও অধিকাংশ শিল্পকারখানায় সরকার নির্ধারিত মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন হয়নি। মালিকদের ইচ্ছামাফিক মজুরি নির্ধারণ করে শ্রমিকদের নিরন্তর ঠকানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নানামুখী চাপ এবং সরকারের নজরদারিতে রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-মজুরি বৈষম্য কিছুটা লাঘব হলেও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এখনও যখন বেতন-বোনাসের দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের রাস্তা অবরোধ করতে দেখা যায়, তখন সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগেÑ শ্রমজীবী মানুষের বঞ্চনার অবসান কবে হবে? তা ছাড়া যখন তখন শ্রমিক ছাঁটাই, প্রতিবাদ করলে ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে হামলা-নির্যাতন, কখনও আবার পুলিশি হয়রানি, এসব অন্যায়-অবিচার ঘটে চলেছে। এসব অবিচারের প্রতিকার শ্রমিকরা পায় না। যদিও দেশে শ্রম আদালত রয়েছে, তবে সেখানে নালিশ করে ন্যায়বিচার পাওয়া দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে দেশের শ্রমজীবী মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত থাকছে।
বাংলাদেশের আইনে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ থাকলেও দেশের কলকারখানা, দোকানপাট, হোটেল-রেস্তোরাঁয় অগুনতি শিশু কাজ করছে। শুধু তাই নয়, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের নিয়োগের বিষয়ে কঠোর বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও লাখ লাখ শিশুকে ওইসব খাতে কর্মরত দেখতে পাওয়া যায়। যখন বাসে-টেম্পোর হেলপার কিংবা মিল-ফ্যাক্টরির বড় বড় মেশিনের পাশে জীর্ণদেহী শিশুদের দেখা মেলে, তখন বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক শ্রম আইন কতটুকু পালিত হচ্ছে অনুমান করতে কষ্ট হয় না। এখানে রাজনৈতিক কিংবা অন্য বিভিন্ন প্লাটফর্মের মঞ্চ থেকে যেসব বাণী উচ্চারিত হয়, তার অতি ক্ষুদ্রাংশই বাস্তবায়নের মুখ দর্শন করতে পারে। বাকি সবই হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়। না হলে স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত এদেশের শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ রক্ষা ও কল্যাণে যেসব প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে, তাতে শ্রমজীবী মানুষের রাজপথে নামার কথা নয়।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও এখন এখানে বহু শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। জাতীয় অর্থনীতির চাকা সামনের দিকে নিতে হলে এই দুই সেক্টরের শ্রমিকদের ন্যায্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা জরুরি। শিল্পশ্রমিকদের মতো কৃষিশ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন নেই, তাই তারা সম্মিলিত প্রতিবাদ করতে না পারায় যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। শ্রমিকশ্রেণিকে ধরা হয় জাতীয় অর্থনীতির চাকার পরিচালক। তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, রক্ত পানি করে কারখানার চাকা সচল রাখে, কৃষিজমিকে ভরিয়ে তোলে ফসলে। তাই তাদের ন্যায্য মজুরিপ্রাপ্তি সুনিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই শ্রমিকের মজুরি পরিশোধের নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। কিন্তু আমরা কি তা পালন করি? আজও বিভিন্ন কলকারখানায় মাসের পর মাস শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন বকেয়া থাকছে। চাইতে গেলে ভুক্তভোগী শ্রমিকরা হচ্ছে লাঞ্ছনার শিকার।
আমরা জানি, আাজও নানা প্লাটফর্ম থেকে শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের কথা বলা হবে। আলাদীনের চেরাগের দৈত্যের হাতের ছোঁয়ায় তাদের ভাগ্য বদলের প্রতিশ্রুতিও শোনা যাবে। তবে নির্মম বাস্তবতা হলো, মাত্র একটি রাত পার হওয়ার পর সেসব প্রতিশ্রুতি হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। আমরা মনে করি, শুধু কথার কথা নয়, জাতীয় অর্থনীতির অব্যাহত অগ্রগতির স্বার্থে দেশের শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা জরুরি। এবারের মে দিবসে এটা হোক আমাদের অঙ্গীকার।