নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬ ১৪:৩২ পিএম
আপডেট : ০১ মে ২০২৬ ১৪:৫৭ পিএম
শ্রমিকদের শোষণের প্রতিবাদে, বিশেষ করে দিনে আট ঘণ্টা কাজের দাবিসহ অন্যান্য কিছু সুযোগ-সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে। ছবি: আলী হোসেন মিন্টু/ প্রতিদিনের বাংলাদেশ
প্রতিবছর মে মাসের প্রথম দিন বেশ ঘটা করে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালন করা হয় এবং এই দিবসে শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে যেমন জোরালো আলোচনা হয়, তেমনি শ্রমিকের কল্যাণে দেওয়া হয় অনেক প্রতিশ্রুতি। কিন্তু ‘মে দিবস’ পার হয়ে গেলে সবকিছু হারিয়ে যায় এবং শ্রমিকের অবস্থা যেখানে ছিল সেখানেই থেকে যায়, বরং অনেক ক্ষেত্রে অধিকতর খারাপ হতে দেখা যায়। এই ‘মে দিবস’ পালনের বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হলেও, বিশ্বের সব দেশেই যে দিবসটি একযোগে গুরুত্ব দিয়ে পালন করা হয়, তেমন নয়। যেমন- মে মাসের প্রথম তারিখ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যেরকম আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করা হয়, উন্নত বিশ্বে কিন্তু সেভাবে পালিত হয় না। আমেরিকা-কানাডাতে মে দিবস পালন তো অনেক পরের কথা, শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে এরকম যে একটি দিবস আছে, সেটা বোঝার উপায় নেই। অবশ্য এই দুই দেশে বছরের অন্য কোনো একটি দিনকে শ্রম দিবস বা লেবার ডে হিসেবে পালন করা হয়। সেই লেবার ডে পালন বলতে মূলত এক দিন ছুটি ভোগ করা। এজন্য বিশেষ কোনো আলোচনা, সভা-সমাবেশ বা কোনোরকম আনুষ্ঠানিকতা থাকে না। আমি অন্তত দেখিনি।
শ্রমিকদের শোষণের প্রতিবাদে, বিশেষ করে দিনে আট ঘণ্টা কাজের দাবিসহ অন্যান্য কিছু সুযোগ-সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে। এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে যেমন আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, তেমনি উৎপাদন ব্যবস্থায়ও এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। আবার শ্রমিকদের ভাগ্যের উন্নতি কতটুকু হয়েছে সে কথা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানের যে উন্নতি হয়েছে তা তো কিছুটা হলেও দৃশ্যমান। তবে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানের যে উন্নতি আমরা আপাতদৃষ্টিতে লক্ষ করি, তা যত না শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থে, তার চেয়ে অনেক বেশি কারখানা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের অধিকতর মুনাফা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। অন্তত উন্নত বিশ্বে তো বটেই। কেননা উন্নত বিশ্বে শ্রমিকদের উন্নত জীবনযাপনের ব্যবস্থা নিশিচত করার পিছনে যে শুভংকরের ফাঁকি আছে, বা ব্যবসা-বাণিজ্যের মালিক পক্ষের অতি মুনাফার স্বার্থ জড়িত আছে বা পরোক্ষভাবে শোষণের ফাঁদ আছে, তা খালি চোখে দেখা যায় না।
অনেক বিদগ্ধ পাঠক আমার এমন মন্তব্যকে অতিরঞ্জিত মনে করতে পারেন, কিন্তু বাস্তব অবস্থা আসলে এরকমই। যেমন, আমেরিকা-কানাডায় আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে একটা চাকরি পেতে কোনোরকম সহযোগিতা পাওয়া যায় না। এমনকি অতি যত্নে লিখে জীবনবৃত্তান্ত জমা দিলেও, সেটি না দেখে ফেলে দিয়ে চাকরিপ্রার্থীকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে আপনার থেকে বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থী পাওয়ায় আপনার আবেদেন বিবেচনা করা হয়নি। সেই ব্যক্তির পরিবর্তে যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তার কাছে সেবা নিতে গিয়ে দেখা যাবে যে তার যোগ্যতা আবেদন প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তির ধারেকাছেও নেই। আমার এই বক্তব্যও অনেকের কাছে অবাস্তব মনে হতে পারে। কিন্তু এখন তো আমেরিকা-কানাডায় অসংখ্যা বাংলাদেশি বসবাস করে এবং তাদের অনেকেরই এখানে চাকরি জোগাড় করতে গিয়ে ইতোমধ্যে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে। তাই তাদের সাথে একটু আলোচনা করলেই আমার কথার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে। যা হোক আমার আজকের লেখার বিষয় আমেরিকা-কানাডাতে চাকরি পাওয়ার সমস্যা নিয়ে নয়। তাই এ বিষয়ে আলোচনা দীর্ঘ করে লেখার প্রসঙ্গ অন্যদিকে ধাবিত করতে চাই না। ভবিষ্যতে অন্য কোনো পরিসরে বিষয়টি নিয়ে লেখার চেষ্টা করব।
ফিরে আসি যে প্রসঙ্গে ছিলাম, সেখানে। এসব দেশে চাকরি দেওয়ার ব্যাপারে স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা না হলেও কাউকে একটা গাড়ির মালিক বা অনেক ক্ষেত্রে বাড়ির মালিক বানিয়ে দেওয়া হয় মুহূর্তের মধ্যে। কারও যদি আমেরিকা-কানাডার বৈধ স্ট্যাটাস থাকে, তাহলে সে একটি গাড়ির দোকানে যেয়ে গাড়ি ক্রয়ের আগ্রহ দেখালে, তারা সেই ব্যক্তির কাছে একটি গাড়ি খুব সহজেই বিক্রি করে দেবে এবং এজন্য যে অর্থের প্রয়োজন, সেটা ঋণের মাধ্যমে জোগাড় করে দেবে। শুধু গাড়ি কেন, যদি বাড়ি কিনতে চায়, তাহলেও সেটি করতে পারবে। এমনকি কেউ যদি দ্বীপ দেশে ভ্যাকেশনে যেতে চান বা ছেলেমেয়ের সুইট থার্টিন, সুইট সিক্সটিন বা নিজেদের পঁচিশ বছর পূর্তিতে পুনর্বিবাহ করতে চায়, তার সবই করতে পারবে। এসব সুবিধা ভোগ করার জন্য বার্ষিক আয়-উপার্জন কত হবে, সেটি মুখ্য নয়, মুখ্য হচ্ছে যেকোনো একটি চাকরি থাকলেই চলবে, তা সে একটি কফির দোকানই হোক বা একটি ফ্যাক্টরিতে হোক। আর এ কারণেই আমেরিকা-কানাডার মতো দেশে অধিকাংশ নাগরিকের গাড়ি, বাড়ি আছে এবং তারা এসব বিলাসবহুল সুবিধা ভোগ করে। এদের বড় একটি অংশ আবার শ্রমিকশ্রেণির।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে শ্রমিক হয়েও তারা এসব আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে এবং বলা চলে উন্নত জীবনযাপন করতে পারছে, তা কি শুধু শ্রমিকদের কল্যাণের বিষয়টি মাথায় রেখে। খালি চোখে দেখলে সেরকমই মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে মোটেই তা নয়। বরং এটি পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পুঁজির মালিকের মুনাফা বা পুঁজির পরিমাণ বৃদ্ধি করার একটি সূক্ষ্ম কৌশল। যেমন, গাড়ির কোম্পানি যখন একটি গাড়ি শ্রমিকের কাছে বিক্রি করে, তখন সেই গাড়ি থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ মুনাফা পায় এবং সেই সাথে আগামী কয়েক বছর এখান থেকে সার্ভিস চার্জ বাবদ মুনাফা উপার্জনের একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়। শুধু তাই নয়, সেই শ্রমিক গাড়িতে এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে যায় যে, সে তখন গাড়ির কোম্পানির আজীবন গ্রাহক হতে বাধ্য হয়, তাতে তার আয়-উপার্জন যেমনই হোক না কেন। মোটকথা চাকরি থাকুক আর না থাকুক, প্রতি মাসে গাড়ির খরচ বাবদ নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সেই গাড়ির কোম্পানিকে দিতে হবে, যার মালিক হচ্ছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পুঁজির মালিক। একই অবস্থা বাড়ির মালিক হওয়া এবং উন্নত জীবনযাপনের সব উপকরণের ক্ষেত্রে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই শ্রমিকশ্রেণি বা অতি সাধারণ মানুষ যে এরকম গাড়ি, বাড়ির মালিক হতে পারে এবং সেই সাথে উন্নত জীবনযাপন করতে পারছে, সেগুলোর জন্য অর্থের জোগান আসে কোথা থেকে। তাদের উপার্জন তো মোটেই এ সবকিছু সমর্থন করে না। তাহলে কীভাব এটি সম্ভব। এক কথায় উত্তর হচ্ছে ‘ব্যাংকঋণ’। ব্যাংক থেকে যে মর্টগেজ ঋণ, গাড়ির ঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ বা লাইন অব ক্রেডিট এবং ক্রেডিট কার্ড ঋণ পায়, তা দিয়েই এসব সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করে থাকে। আমেরিকা-কানাডার মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের এসব ঋণের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত। এখানে একবার গাড়ি কিনলে, সেই গাড়ির ঋণ কোনোদিন শোধ হয় না। একবার বাড়ি কিনলে, সেই বাড়ির ঋণ জীবদ্দশায় শোধ হয় না, উল্টো বাড়ির বা মর্টগেজ ঋণের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর ক্রেডিট কার্ডের ঋণ পরিশোধের সুযোগই নেই। একবার ক্রেডিট কার্ড চালু করলে ঋণ চলতেই থাকে এবং একমাত্র মৃত্যুর পর বন্ধ হয়। অনেকেই ভাবতে পারেন যে তাহলে এত বিশাল ঋণ পরিশোধ হয় কীভাবে। এটি একটি বড় প্রশ্ন, যার সন্তোষজনক উত্তর আমার কাছে নেই। তবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, যার সুযোগ আবার এখানে নেই।
উন্নত বিশ্বে, বিশেষ করে আমেরিকা-কানাডায় শ্রমিকদের যে উন্নত জীবনযাপনের ব্যবস্থা, তার পিছনে আছে বিশাল এক ঋণের বাণিজ্য। শ্রমিকদের এসব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হচ্ছে ব্যাংকঋণের মাধ্যমে। আর এসব দেশের ব্যাংকগুলো শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষের এসব চাহিদা মেটানোর মাধ্যম হিসেবে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ হিসেবে বিনিয়োগ করে রেখেছে, যেখান থেকে সুদ হিসেবে মুনাফা অর্জন করে শত শত বিলিয়ন ডলার। আর এই সুদ পরিশোধ করে শ্রমিক এবং সাধারণশ্রেণির মানুষ। একজন সাধারণ শ্রমিকের যদি মর্টগেজ ঋণের মাসিক কিস্তি হয় চার হাজার ডলার, তার আড়াই হাজার ডলার বা বেশি হবে সুদ। একজন শ্রমিকের গাড়ির ঋণের কিস্তি যদি হয় মাসে সাতশ ডলার, তাহলে সে সুদ প্রদান করবে চারশ ডলার বা তার বেশি। একজন শ্রমিকের যদি পঞ্চাশ হাজার ডলার ক্রেডিট কার্ড ঋণ থাকে, তাহলে তাকে বছরে সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হবে দশ হাজার ডলার। বর্তমানে পরিবর্তিত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় শ্রমিকশ্রেণি ঋণের দুষ্টচক্রে আটকে যাচ্ছে, যেখান থেকে আর সহজে বের হওয়ার সুযোগ নেই। সেই সাথে শ্রমিকরা এসব ঋণের ওপর পর্যাপ্ত পরিমাণ সুদ প্রদানের মাধ্যমে সুকৌশলে শোষিত হচ্ছে, যা তাদের অনেকেই বুঝতেও পারে না।
এত গেল, আমেরিকা-কানাডার মতো উন্নত বিশ্বের অবস্থা। কিন্তু আমাদের দেশের অবস্থা কি এর থেকে ভিন্ন? মোটেই তা নয়। অবস্থা এক রকমই, শুধু প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এখানকার মতো ব্যাংকঋণের অবাধ সুযোগ আমাদের দেশের শ্রমিকদের নেই। এর কারণ যে, আমাদের শ্রমিকদের সক্ষমতার বিষয়, তা নয়। আমাদের দেশের ব্যাংকগুলো এরকম ঋণ প্রদানের জন্য নিজেরা প্রস্তুত হতে পারেনি। কিন্তু এই যে তৈরি পোশাক শিল্প বা অন্যান্য খাতের শ্রমিকদের বড় একটি অংশ সেলফোন ব্যবহার করছে, ইন্টারনেট ব্যবহার করছে, টেলিভিশন, ফ্রিজ কিনছেÑ এতে সেই শ্রমিকের হয়তো জীবনমান উন্নত হচ্ছে, কিন্তু আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে এসব সেবা ও পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। এসব কোম্পানি তো শত শত বিলিয়ন ডলার মুনাফা অর্জন করছে। কিন্তু তারা তো কখনও শ্রমিকদের জন্য হ্রাসকৃত মূল্যে এসব সেবা বা পণ্য সরবরাহের উদ্যোগ নেয় না। আসলে শ্রমিকশ্রেণি উৎপাদনের অপরিহার্য অংশ হলেও, তারা আগেও যেমন শোষিত ছিল, এখনও তেমনি শোষিতই আছে। আর এ কারণেই দেড়শ বছর পরে এসেও ‘মে দিবস’-এর গুরুত্ব কমেনি বিন্দুমাত্র, বরং বৃদ্ধি পেয়েছে।
নিরঞ্জন রায়
সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা