নয়ন বিশ্বাস রকি
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬ ১৪:১৯ পিএম
বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় প্রতীক হলো মহান মে দিবস। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় প্রতীক হলো মহান মে দিবস। আজ ১ মে, এই দিবস শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মারক নয়, বরং এটি শ্রমিকশ্রেণির ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়ের প্রতীক। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এই দিনটি গভীর শ্রদ্ধা ও গুরুত্বের সঙ্গে উদযাপিত হয়।
মে দিবসের ইতিহাস আমাদের নিয়ে যায় ১৮৮৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে, যেখানে শ্রমিকরা দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিলেন। সে সময় শ্রমিকদের ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করা হতো, যা ছিল মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী। ১ মে শুরু হওয়া আন্দোলন ৪ মে ‘হে মার্কেট’ চত্বরে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়, যেখানে পুলিশের গুলিতে বহু শ্রমিক নিহত হন। এই আত্মত্যাগই পরবর্তীতে শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে ওঠে এবং বিশ্বজুড়ে ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
ইতিহাসের পাঠ থেকে জানা যায়, ১৮৫৬ সালের ২১ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার শ্রমিকরা একযোগে সারা দেশে কর্মবিরতি পালন করে। তাদের দাবি ছিল প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা কাজ। কারণ প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করলে একজন শ্রমিকের বিশ্রাম বিনোদন কোনোটি গ্রহণেরই পর্যাপ্ত সুযোগ থাকে না। পারিবারিক, ব্যক্তিগত সময় বলে কিছু থাকে না! অস্ট্রেলিয়ার সেই আন্দোলনই প্রথম বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছিল যে, শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ হলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।
শিকাগো আন্দোলনের পরের ঘটনাগুলো আরও রোমহর্ষক। আমেরিকায় তখন ছিল তিনটি বড় শ্রমিক সংগঠন। তারা সবাই সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেয় যে, ১৮৮৬ সালের ১ মে তারা সবাই একযোগে ধর্মঘট পালন করবে। তাদের স্লোগান ছিল: ‘৮ ঘণ্টা শ্রম, ৮ ঘণ্টা ঘুম ও ৮ ঘণ্টার বিনোদন। ৩ মে ১৮৮৬ শিকাগোর ম্যাককরমিক কারখানার কাছে ধর্মঘট পালন হয়। সেখানে বক্তব্য রাখেন বিখ্যাত শ্রমিক নেতা অগাস্ট স্পাইস। তিনি বক্তৃতার মাধ্যমে সবাইকে শান্ত রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু অসংখ্য লোকজনের মধ্যে হঠাৎ করেই বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে যায়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুলি ছুড়লে ৬ জন শ্রমিক নিহত ও আহত হয় অসংখ্য। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীতে আন্দোলন আরও জোরালো হয়।
শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে ৪ মে শিকাগোর হে-মার্কেট চত্বরের কাছে রেন্ডলফ সড়কে বিশাল বিক্ষোভ হয়। এতে নেতৃত্ব দেন শ্রমিক নেতা অ্যাডলফ ফিশার ও আগস্ট স্পাইস। ৪ মে সন্ধ্যাবেলা তুমুল বৃষ্টি হচ্ছিল। সেই মুষলধারে বৃষ্টির মাঝেও চলে বক্তৃতা। রাত ১০টার দিকে এক পর্যায়ে হঠাৎ বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। এতে পুলিশ অফিসার ম্যাথিয়াস জে. ডিগান মারা যান। ফলে পুলিশ অন্ধকারে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে পুলিশ ও শ্রমিক উভয় পক্ষেই অনেক মানুষ হতাহত হয়। পুলিশ এই বোমা হামলার কোনো প্রকৃত কারণ খুঁজে না পেলেও নিরপরাধ ৮ শ্রমিক নেতাকে আটক করে এবং বিচার শেষে মৃত্যুদণ্ড দেয়। সেই আটজন শ্রমিক নেতা হলেন : আগস্ট স্পাইস, আলবার্ট পারসনস, অ্যাডলফ ফিশার, জর্জ এঞ্জেল, লুই লিং, স্যামুয়েল ফিল্ডেন, মাইকেল শোয়াব ও অস্কার নিবে ।
১৮৯৩ সালে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের গভর্নর জন পিটার অল্টগেল্ড স্বীকার করেছিলেন যে, দণ্ডপ্রাপ্ত শ্রমিকরা আসলে নির্দোষ ছিলেন। তিনি বেঁচে থাকা বাকি তিনজনকে মুক্তি দেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মে দিবসের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো শ্রমজীবী মানুষ। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি, নির্মাণ খাত, প্রবাসী শ্রমিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম। তাদের নিরলস পরিশ্রম দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশেও শ্রমিক আন্দোলনের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান শাসনামল এবং স্বাধীনতার পরবর্তী সময়েও শ্রমিকরা তাদের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অনেক শ্রমিক এখনও ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষার দিক থেকে পিছিয়ে আছে। পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ড বা ভবনধসের মতো দুর্ঘটনা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি। শ্রম আইন থাকলেও তার সঠিক বাস্তবায়ন অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে মে দিবস শুধু উদযাপনের দিন নয়, বরং শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জন্য নতুন করে অঙ্গীকার করার দিন।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। কম খরচে উৎপাদনের জন্য অনেক সময় শ্রমিকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করা হয়। প্রযুক্তির উন্নয়ন যেমন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান কমিয়েও দিচ্ছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, কর্মপরিবেশ উন্নয়ন এবং শ্রম আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনও অনেক পথ বাকি। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকরাÑ যেমন গৃহকর্মী, দিনমজুর, রিকশাচালকÑ এখনও অনেক ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন।
আমি মনে করি, মহান মে দিবস কেবল একটি দিবস নয়, এটি একটি চেতনা, একটি আন্দোলন, একটি প্রতিজ্ঞা। এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো মানুষের জীবনমান। আর সেই মানুষদের মধ্যে শ্রমিকরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই তাদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় আমাদের সবাইকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। মে দিবসের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশ যদি শ্রমিকবান্ধব নীতি ও কার্যক্রম আরও জোরদার করতে পারে, তবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও টেকসই সমাজ গঠন সম্ভব হবে যেখানে প্রতিটি শ্রমিক তার প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার পাবে।
নয়ন বিশ্বাস রকি
কলাম লেখক ও সমাজসেবক