× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জলাবদ্ধ চট্টগ্রাম মহানগরী

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:৩৪ পিএম

মুষলধারার কিছু সময়ের বৃষ্টিতেই তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম মহানগর। মঙ্গলবার নগরীর প্রবর্তক মোড় থেকে তোলা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মুষলধারার কিছু সময়ের বৃষ্টিতেই তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম মহানগর। মঙ্গলবার নগরীর প্রবর্তক মোড় থেকে তোলা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

চট্টগ্রাম মহানগরীকে বলা হয় দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হলেও সামান্য বৃষ্টিতেই এই মহানগরীর নাজুক চিত্র বারবার সামনে আসে। কয়েক ঘণ্টার মাঝারি বৃষ্টিপাতেই নগরীর প্রধান সড়ক, অলিগলিসহ গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো পানিতে তলিয়ে যায়। জলাবদ্ধতার এই চক্র যেন প্রতি বর্ষায় এক অনিবার্য দুর্ভোগ, যা নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলছে। ভোগান্তিতে পড়ছে সাধারণ মানুষ, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম। বলে রাখা ভালো, দুর্ভোগের নানাবিধ কারণের অন্যতম হচ্ছে শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া চাক্তাই খাল।

হোয়াং হো নদী একসময় চীনের ভয়াবহ বন্যা ও জনদুর্ভোগের কারণ হিসেবে পরিচিত ছিল, যা আধুনিক বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে এখন আশীর্বাদে পরিণত হয়েছে। আর সংস্কারের অভাবে পলি জমে চাক্তাই খাল এখন চট্টগ্রামের দুঃখ। সহজ করে বললে, চট্টগ্রাম মহানগরীর দীর্ঘদিনের যন্ত্রণার নাম চাক্তাই খাল। খালের দু’পাশে ভোগ্যপণ্যের অন্যতম বৃহত্তম পাইকারি বাজার চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জ। একসময় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা ভোগ্যপণ্য আগে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ থেকে এই খাল দিয়ে নৌযানে করে কর্ণফুলী নদী হয়ে সারা দেশে পরিবহন করা হতো। এমনকি চাক্তাই খাল থেকে কর্ণফুলী নদী ও চানখালী খাল হয়ে সাঙ্গু নদীর মাধ্যমে বান্দরবানের থানচি ও রুমা উপজেলা পর্যন্ত নৌযানে করে পণ্য নেওয়া হতো। অর্থাৎ এই খাল ছিল নগরের প্রধান পানি নিষ্কাশন পথ। কিন্তু দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে খালটি আজ মৃতপ্রায়। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই খালের পানি উপচে পড়ে আশপাশের এলাকা প্লাবিত করে এবং সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা। চাক্তাই খালকেও বাঁচাতে প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ। আমরা মনে করি, চাক্তাইসহ শহরের সকল খাল দখলমুক্ত করা, নিয়মিত খনন ও আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমন্বয় ছাড়া এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে না। 

প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার সকাল থেকেই নগরীর প্রবর্তক মোড়, মুরাদপুর, বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির পানিতে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। অনেক সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘ যানজট। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা পড়েন সীমাহীন দুর্ভোগে। জানা যায়, মাত্র ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই শহর তলিয়ে যায়। খালগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। শত শত কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে গতি নেই। বছরের পর বছর একই সমস্যা থাকলেও এর কোনো স্থায়ী সমাধান মিলছে না। 

উল্লেখ্য, জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। অনেক ক্ষেত্রে সড়ক উন্নয়ন বা খোঁড়াখুঁড়ি কাজের কারণে পানি নিষ্কাশনের পথ আরও সংকুচিত হয়ে পড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে সিডিএ কয়েকটি মেগা প্রকল্প হাতে নিলেও বাস্তবে এসব প্রকল্পের অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাবদ্ধতার পেছনে রয়েছে একাধিক কাঠামোগত ও পরিকল্পনাগত সমস্যা। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল দখল ও ভরাট, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবÑ এসবই নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলেছে। 

প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, জলাবদ্ধতার কারণ বহুস্তরীয়। প্রথমত, অপরিকল্পিত নগরায়ণ। গত কয়েক দশকে দ্রুত নগর বিস্তারের ফলে প্রাকৃতিক খাল, জলাধার ও নালাগুলো দখল ও ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ড্রেনেজ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। অনেক এলাকায় নালা-নর্দমা ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে থাকে, যা পানিপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে। তৃতীয়ত, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ধীরগতি ও সমন্বয়হীনতা। সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি, খাল পুনঃখনন বা ড্রেন উন্নয়নÑ এসব কাজ প্রায়ই দীর্ঘসূত্রতায় ভোগে। ফলে সমস্যাটি আরও প্রকট হয়ে উঠছে। জলাবদ্ধতার প্রভাব কেবল যানজট বা ভোগান্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি নগরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বন্দর-নির্ভর এই শহরে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়ে জাতীয় অর্থনীতিতে। পাশাপাশি, দীর্ঘসময় পানি জমে থাকায় সৃষ্টি হয় স্বাস্থ্যঝুঁকিÑ ডেঙ্গু, পানিবাহিত রোগসহ নানা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ে।

বিষয়টির দিকে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। তিনি জাতীয় সংসদে এর জন্য দুঃখ প্রকাশ করে সমস্যা নিরসনে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। সচেতন মহল মনে করে, জলবহুল এই মহানগরীর খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধারে কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে, চাক্তাই খালের প্রয়োজনীয় সংস্কার করে পানি প্রবাহের পথ নিশ্চিত করতে হবে। আধুনিক ও টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা নগরের জনসংখ্যা ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বিবেচনায় পরিকল্পিত হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা জরুরিÑ সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পাশাপাশি, চলমান প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে হবে। নাগরিক সচেতনতার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা, নালা বন্ধ করে রাখাÑ এসব অভ্যাস পরিবর্তন জরুরি।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নতুন কোনো সমস্যা নয়Ñ এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও পরিকল্পনাহীনতার ফল। এখন সময় এসেছে কথার চেয়ে কাজে গুরুত্ব দেওয়ার। আমরা মনে করি, পরিকল্পিত উদ্যোগ এবং সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই মহানগরীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করা সম্ভব।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা